মিয়ানমার বহু বছর বিশ্ব থেকে রীতিমত বিচ্ছিন্ন ছিল । দেশটির বিরুদ্ধে বহাল ছিল বৈশ্বিক অবরোধ। এ সময় সামরিক সরকারের শাসনাধীন ছিল দেশটি। ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত কয়েক দশক দেশটিতে পুরোদমে সামরিক সরকার কায়েম ছিল। এরপর আরো চার বছর পর্দার অন্তরালে থেকে দেশ শাসন করেছে তারা। তখন কাগজে কলমে বেসামরিক একটি সরকার দেশ শাসন করলেও, নিরাপত্তা সংক্রান্ত সব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারাই নিতো।

তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। খুলেছে গণতন্ত্রের দ্বার। রাজনৈতিক বন্দী ও নোবেল জয়ী অং সান সুচি দেশটির বেসামরিক সরকারের প্রধান নির্বাাচিত হয়েছেন। এতে করে দেশটির উপর থেকে উঠে গেছে বৈশ্বিক অনেক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিষেধাজ্ঞা। ফলে বিদেশী বিনিয়োগের ঢল নেমেছে দেশটিতে। তবে সবচেয়ে লক্ষ্যনীয় পরিবর্তন দেখা গেছে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে। সামরিক বাহিনীর প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই পালটে গেছে।
বার্তাসংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক সময় জনসাধারণের ঘৃণার পাত্র ছিল সামরিক বাহিনী। কিন্তু, সাম্প্রতিককালে দেশটিতে জাতীয়তাবাদের উত্থানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সামরিক বাহিনীর প্রতি সমর্থন। আর তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে রাখাইন রাজ্যের মুসলিম রোহিঙ্গারা। সম্প্রতি তাদের ওপর সামরিক বাহিনী এক নৃশংস অভিযান চালিয়েছে। যে অভিযানে নিহত হয়েছে হাজারো মানুষ, আর গৃহহীন হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে ৬ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশী মানুষ। সৃষ্টি হয়েছে এশিয়ার সাম্প্রতিককালীন সর্ববৃহৎ শরণার্থী সংকট। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের ভাষায়, এই অভিযান জাতিগত নিধনের সমতুল্য।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, পুরো বিশ্ব মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নৃশংসতায় আঁতকে উঠলেও, মিয়ানমারে এই অমানবিকতার প্রতি সমর্থনের অভাব নেই। তাদের কাছে রোহিঙ্গারা হচ্ছে অবৈধ বাঙালি অভিবাসী। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এমনই এক বৌদ্ধ সমর্থক হচ্ছেন নিয়ো তুন। জান্তা শাসনামলে মিয়ানমারে গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করার অপরাধে ১০ বছর রাজনৈতিক বন্দীত্ব বরণ করতে হয়েছিল তাকে। ইনসেইন কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় শিকার হয়েছেন নানা নির্যাতনের। তুন বলেন, সামরিক সরকার বহুদিন ধরে নির্যাতন চালিয়েছে। ফলে একসময় একে ঘৃণাও করেছেন। কিন্তু বর্তমান সামরিক বাহিনী নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণই আলাদা।
তিনি বলেন, সামরিক স্বৈরতন্ত্র হলো অতীতের কথা। বর্তমানের সামরিক বাহিনী অনেক ভিন্ন। সামরিক বাহিনী রাখাইনে কোন অপরাধ করছে না। তারা দেশকে রক্ষা করছে। আর এভাবেই তারা জনগণের সমর্থন পাচ্ছে। কারণ, এটি সকলের জাতীয় চেতনার প্রশ্ন।
স্থানীয় পর্যায়ে তাতমাদাও নামে পরিচিত এই বাহিনীর সমর্থনে দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে মিছিল করেছে হাজার মানুষ। এই বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল মিন অং হøাইং-এর ফেসবুক পেজে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তার প্রশংসা করে থাকে। সামরিক বাহিনী নভেম্বরের ওই অভিযানে নৃশংসতা সংঘটনের অভিযোগ সম্পর্কে বলেছিল, একটি অভ্যন্তরীন তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে এমন কিছুই ঘটেনি। কিন্তু, গতমাসে যুক্তরাষ্ট্র রাখাইনে গণহত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম জ্বালানোর বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণকে উদ্ধৃত করে রাখাইনে সেনাবাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল মং মং সয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
তবে এসব সত্ত্বেও সম্প্রতি এক ফেসবুক কমেন্টে এক ব্যবহারকারী বাহিনীর প্রধানকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, কমান্ডার-ইন-চিফ দীর্ঘজীবি হোন। অপর একজন কমেন্টে লিখেছেন, সেনাবাহিনী দেশের উপকার করেছে। আরো এক কমেন্টে লেখা হয়েছে, বাঙালি সন্ত্রাসীদের সরানোর জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।
এমন প্রশংসা পাওয়ার কথা সামরিক বাহিনী একসময় কল্পনাও করতে পারতো না। কয়েক দশক আগেও তাদের কারণে দেশ বহির্বিশ্ব থেকে পুরো আলাদা হয়ে গিয়েছিল। মানুষজন আন্তর্জাতিক খবর দেখতে পারতেন না। ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হতো না। এমনকি রাজনীতি নিয়ে কথা বলা পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল।
নিজেদের পরিচয় প্রতিষ্ঠা ও অধিকার নিশ্চিত করতে বহু বছর ধরেই সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছে বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর বিদ্রোহীরা। এছাড়া গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের জন্ম নিলে কঠোর হস্তে তা দমন করতো সামরিক বাহিনী। ১৯৮৮ ও ২০০৭ সালে তা-ই হয়েছে। নিহত হয়েছে শ’ শ’ মানুষ। গ্রেপ্তার হয়েছে অসংখ্য।
মিয়ানমার ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাথিসন বলেন, একসময় যেখানে সামরিক বাহিনী প্রতিনিয়ত গালির শিকার হতো, এখন তারা প্রশংসার জোয়ারে ভাসছে। অন্তত, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সামরিক বাহিনীকে মাথায় তুলে নাচছে। ২০১৫ সালের নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে মিয়ানমারবাসী জান্তাদেরকে ¯পষ্ট বার্তা দিয়েছিল যে, তারা আর সামরিক শাসনের অধীনস্থ থাকতে চায় না। ম্যাথিসন বলেন, সামরিক বাহিনী জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য মানুষের জাতীয়তাবোধকে উসকে দেওয়ার কৌশল অবলম্বন করেছে। তারা রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর হামলা চালিয়ে সংখ্যাগুরু বৌদ্ধদের সমর্থন পেতে চায়। সুচির বেসামরিক সরকারের গণতান্ত্রিকতার মুখোশ পড়ে এ কাজ করছে সেনাবাহিনী। সাধারণ জনগণের মন থেকে অতীতের অত্যাচারের স্মৃতি যতই অ¯পষ্ট হচ্ছে, ততই সুবিধামত কাজ সেরে যাচ্ছে সেনারা।
অনেক পর্যবেক্ষক বলেন, সবচেয়ে ভীতিকর ব্যাপার হচ্ছে, একসময় যেসব রাজনৈতিক কর্মী সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে, তারাও এখন সামরিক বাহিনীর পক্ষে দাঁড়িয়েছে। তারা এখন জনসাধারণকে জাতীয়তাবাদ ও স্বার্বভৌমত্বের শিক্ষা দিয়ে বেড়ায়। সাবেক রাজনৈতিক বন্দী কো কো গি বলেন, রোহিঙ্গা অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও চাপের ফলে মিয়ানমারে জাতীয়তাবাদী মনোভাব আরও জোরদার হয়েছে। জাতীয়তাবাদী চেতনা অনেক মজবুত হয়েছে।
মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রোহিঙ্গাদের ওপর ধর্ষণ ও হত্যাযজ্ঞের খবরকে ভুয়া বলে মনে করে। নিয়ো তুন যেমনটা যুক্তি দেখাচ্ছিলেন যে, ‘বাঙালিদের চেহারা, ভাষা, ধর্ম ও মুখের দিকে তাকান। তাদেরকে কীভাবে কেউ ধর্ষণ করতে পারে? বিশ্ব সম্প্রদায় চাপ দিচ্ছে আরও ১০ লাখ বাঙালিকে গ্রহণ করতে। আমরা কীভাবে এদের গ্রহণ করবো? আমরা তা পারবো না।’
তবে সাবেক রাজনৈতিক বন্দীদের সবাই সেনাবাহিনীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ নন। অনেকেই মনে করেন, তাদের একসময়কার সহকর্মীরা পথ খুইয়েছেন। চার বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন ছাত্রকর্মী সিথু মং। তিনি বলেন, অনেকে সেনাবাহিনীর হাতে ব্যবহৃত হচ্ছেন। সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর স্বীকৃতি দেওয়াটা আমাদের জন্য কঠিন। এই সমস্যার সমাধান রাতারাতি হবে না। কিন্তু তাই বলে, কোনো মানবাধিকার কর্মীই এমন গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘণ দেখে চুপ থাকা উচিত নয়।

Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031