একই পরিবারের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তিন বোন নিজেদের চোখে আলো না থাকলেও সমাজে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন । অপরূপ পৃথিবী নিজের চোখে দেখতে না পারার কষ্ট ভুলে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন শিক্ষকতা।
দৃষ্টিহীন অপর বোনও প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিক্ষক হওয়ার। একই পরিবারের চার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কন্যা সন্তানের বিশ্বজয়ের মতো ঘটনা আজ মানুষের মুখে মুখে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়া চার বোন পরিবারের বোঝা না হয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে পথ চলছেন। পিতা-মাতার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। নারীর ক্ষমতায়নের অনন্য দৃৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তারা।
এদের মধ্যে তিন বোন ২০১৩ সাল থেকে চট্টগ্রামের পটিয়ার তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিশু-কিশোরদের লেখাপড়া করাচ্ছেন। অপর বোনটিও শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নারীর ক্ষমতায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার চার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বোন এখন শুধু নিজেরাই স্বপ্ন দেখছেন না, স্বপ্নের ফেরিও করছেন। নারীর ক্ষমতায়নের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী এই চার তরুণী সমাজটাকে সবার বাসযোগ্য এবং ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
পটিয়া উপজেলার আজিমপুর গ্রামের মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরী খালাতো বোন শামীমা আকতার চৌধুরীকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর অভাব থাকলেও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ সংসারে দুজনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। কিন্তু বিয়ের বছর দুয়েকের মাথায় সংসার আলো করে আসা কন্যা সন্তানটি জন্মান্ধ হওয়ায় তারা চোখে অন্ধকার দেখেন। ফুটফুটে সুন্দর একটি শিশু, অথচ চোখে দেখে না। উম্মে হাবিবা চৌধুরী নামের শিশুটি বড় হতে থাকে। বছর দুয়েকের মধ্যে একটি সুস্থ পুত্র সন্তানের জন্মের পর এই দম্পতির একে একে আরো তিনটি জন্মান্ধ কন্যা সন্তান হয়। একই পরিবারের চারটি কন্যা সন্তানই অন্ধ। এ নিয়ে পাড়া-পড়শিরা নানা কথা বলতেন। কিন্তু নাসির-শামীমা দম্পতির ভাবনা ছিল অন্যরকম। সন্তানদের শিক্ষিত করতে হবে, মানুষ করতে হবে। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দিতে হবে। পারিবারিক নানা সীমাবদ্ধতা এবং অভাব থাকলেও সন্তানদের লেখাপড়াসহ ভবিষ্যতের চিন্তা করে গ্রাম ছেড়েছিলেন। পটিয়া থেকে নগরীতে এসে চশমা হিল এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন।
বড় মেয়ে উম্মে হাবিবা চৌধুরীকে ভর্তি করানো হয় মুরাদপুরের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে। এরপর মেজো বোন উম্মে সালিমা চৌধুরী, সেজো বোন উম্মে তাসলিমা চৌধুরী ও ছোট বোন উম্মে তানজিলা চৌধুরীকেও ভর্তি করা হয় একই স্কুলে। প্রাথমিকের পাঠ শেষে তিন বোন মুরাদপুর বন গবেষণাগার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। ছোট বোন উম্মে তানজিলা এসএসসি পাস করেন রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। চার বোনই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছেন। তাদের একমাত্র ভাই নাঈম উদ্দীন চৌধুরী এমবিএ করেছেন।
নিজেদের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চৌধুরী দম্পতি বলেন, একের পর এক অন্ধ কন্যা সন্তান ঘরে আসায় তারা চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছিলেন। প্রথম কন্যা সন্তানের পর সুস্থ একটি পুত্র সন্তান তাদের বুকে আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে একে একে আরো তিনটি অন্ধ কন্যা সন্তান তাদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল।
কিন্তু তারা চার অন্ধ কন্যাকে নিয়ে থেমে যাননি। বরং পরম মমতা ও ভালোবাসায় প্রতিটি সন্তানকে আগলে রেখেছেন। নিজেদের সবকিছু উজাড় করে সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। কন্যা সন্তান বা অন্ধ সন্তান বলে একটুও অবহেলা করেননি। তাদের স্কুল-কলেজে পড়িয়েছেন। পাঠিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে।
চার বোনের তিনজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর। তিন বোনের মধ্যে বড় উম্মে হাবিবা চৌধুরী পটিয়া পৌর সদরের শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, সেজ উম্মে তাসলিমা চৌধুরী পাশের দক্ষিণ গৌবিন্দারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং সবার ছোট উম্মে তানজিলা চৌধুরী সদরের মোহছেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। মেজ উম্মে ছালিমা চৌধুরী প্রথম দফায় নিয়োগ পেতে ব্যর্থ হলেও দমে যাননি। সামনের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় পুনরায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশাপাশি বাসায় বসে টিউশনি করছেন।
অন্ধ হয়েও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রাখায় উম্মে তানজিলা চৌধুরীকে ২০১৬ সালে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের পুরস্কার প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নেন সনদ ও ক্রেস্ট। কম্পিউটারে তৈরি করতে পারেন তারা মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট। লেখাপড়ার জন্য এখনো আছে অদম্য আগ্রহ। তাই তো বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন নারী হিসেবে দেশে প্রথম পিটিআইয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন তিন বোন।
নিজেরা পৃথিবীর আলো না দেখলেও একমাত্র ভাইটির চোখের আলো থাকায় আনন্দিত চার বোন। ভাই নাইম একটি বায়িং হাউজে চাকরি করছেন। তার কাছ থেকেই ২০০৫ সালে কম্পিউটার জ্ঞান রপ্ত করেন চার বোন। পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেন একটি এনজিও থেকে।
সেজ বোন উম্মে তাসলিমা চৌধুরী বলেন, প্রবল ইচ্ছাশক্তি দিয়েই আমরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদটি আমাদের অন্ধ হিসেবে দেওয়া হয়নি। নিজেদের যোগ্যতায় অর্জন করেছি। তাঁর মতে, সরকারি নিয়োগ বিধিমালা আরো সহজ করা প্রয়োজন। তাহলে প্রতিবন্ধীরা আরো বেশি সুযোগ পাবে।
তিনি বলেন, প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়। একটু সহযোগিতা পেলে তারাও অন্য যেকোনো সুস্থ সবল মানুষের মতো নিজেদের মেলে ধরতে সক্ষম হবে। বর্তমানে পিটিআই প্রশিক্ষণে ব্রেইল পদ্ধতির সুবিধা না থাকায় বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পটিয়ার শিক্ষা কর্মকর্তা মোতাহার বিল্লাহ বলেন, দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও মানসিক শক্তি দিয়েই তিন বোন জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল হাসান বলেন, পটিয়ার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তিন বোন জীবনযুদ্ধে হেরে যাননি। আবার অন্ধ বলে অবহেলাও করেননি তাদের পিতা-মাতা। দেশের প্রতিটি প্রতিবন্ধীর পিতা-মাতা একটু সচেতন হলেই হাবিবা, তাসলিমা, তানজিলার মতো সবাই নিজেকে মেলে ধরতে পারবে।
এদিকে, সুইজারল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশি চিকিৎসক ডা. জহিরুল আলম ভুঁইয়া অন্ধ চার বোন, মা-বাবা এবং তাদের ভাইয়ের রক্তের নমুনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগটি শনাক্ত করেছেন। তিনি জানান, ‘লিভার কনজেনিটাল এমারোসিস’ নামের রোগটি একই বংশের বা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিয়ে হলে দেখা দেয়। বিরল এ রোগটি প্রতি ৮০ হাজারে ১ জনের হয়। মা-বাবা দুজনের শরীরে জিনগত সমস্যা থাকলে সন্তানদের মধ্যে তা বিস্তার লাভ করে।

Share Now
February 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
232425262728