বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাবে অবিরাম বর্ষণে নগরীর নি¤œাঞ্চল পানিতে ডুবে রয়েছে। কোথায় হাঁটু, কোথাও কোমার পানিতে তলিয়ে গেছে নগরীর বিস্তির্ণ এলাকা। এসব অঞ্চলে বাসা-বাড়ি, দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, মসজিদে পানি ঢুকে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। রাস্তাঘাটেও যানবাহন চলাচল কমে গেছে। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ ও দ্বিগুণ ভাড়া গুণতে হয়েছে। এদিকে সাগরের লঘুচাপের কারণে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে।
বরবারের মতো সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাণিজ্যপাড়া চাক্তাই খাতুনগঞ্জে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
আবহাওয়া অফিস জানায়, গতকাল সোমবার রাত নয়টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানায়, দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৭৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সকাল আটটা ৩০ মিনিটে জোয়ার শুরু হয়। রাত নয়টা ৪ মিনিটে আবার জোয়ার হয় বলে জানায় আবহাওয়া অফিস।
আবহাওয়া অফিসের কর্মরত কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম জানান, মৌসুমি নিম্নচাপের কারণে দেশের সমুদদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। তিনি জানান, দুপুর নাগাদ চট্টগ্রামে একটানা ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এরপর থেমে থেমে ভারী বৃষ্টি হবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বৃহত্তর বাকলিয়া, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ, আছাদগঞ্জ, নতুন চাক্তাই, বাস্তুহারা, মোহরা, চান্দগাঁও, চকবাজার, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ, সিডিএ আবাসিক, শান্তিবাগ, হালিশহর, ছোটপুল, দুই নম্বর গেটসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। দুর্ভোগে পড়েছেন শত শত মানুষ।
বাকলিয়া ১৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হারুণ উর রশিদ জানান, বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে শত শত ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। অনেক বাড়িতে রান্নাবান্না পর্যন্ত করা হয়নি। অনেক রোজাদার ঠিকমতো ইফতার করতে পারেনি বলে জানান তিনি।
একই কথা বলছেন মোহরা এলাকার মো. নাছির উদ্দিন। তিনি জানান, কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী মোহরা এলাকার প্রতিটি ঘরে পানি ঢুকেছে। প্রতিটি ঘরে দুপুরে ও সন্ধ্যায় রান্নাও হয়নি। রাতের জোয়ারে সেহেরি রান্না করা যাবে কিনা শঙ্কায় রয়েছেন এলাকাবাসী। বক্সিরহাট ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়েজুল্লাহ বাহাদুর জানান, দুপুরে গড়ানোর পর পুরো এলাকা পানিতে তলিতে যায়। শত শত মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, চাক্তাই, নতুন চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, বাস্তুহারা সী-বিচ কলোনির কয়েকশত মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এসব ঘরে পানি ঢুকে রান্নাবান্না পর্যন্ত হয়নি। ছেলেমেয়ে নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন তারা। তিনি আরও জানান, মেয়র ও স্থানীয় কাউন্সিল খাতুনগঞ্জ এলাকার রাস্তা উঁচু করায় এবার পানি কিছুটা রোধ করা গেছে।
কর্ণফুলী তীরবর্তী বৃহত্তর বাকলিয়া, চাক্তাই খাতুনগঞ্জ এলাকায় পানিতে ডুবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও আগ্রাবাদ, হালিশহর এলাকায় রাস্তাঘাট ও বাসাবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। আগ্রাবাদ এক্সেস রোড কোমর পানিতে তলিয়ে যায়। সিডিএ আবাসিক, গোসাইলডাঙ্গা, বেপারিপাড়া, শান্তিবাগ, হালিশহর, ছোটপুলসহ বিশাল এলাকা পানিতে ডুবে গেছে।
আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দারা জানান, ভোররাতে সেহেরির সময় নিম্নাঞ্চলের অনেক বাসাবাড়িতে হাঁটু পরিমাণ পানি ঢুকে গেছে। সকালে পুরো এলাকা কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। এসময় সকল ধরনের যানবাহন চলাচল অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে। রিকশা ও ভ্যানে করে চাকরিজীবীদের কর্মস্থলে পৌঁছতে হয়েছে। এজন্য ভাড়াও কয়েকগুণ বেশি গুনতে হয়েছে। এদিকে, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের নিচতলায়ও হাঁটুপানি জমে গেছে। এতে রোগী, স্বজন ও ডাক্তার-নার্সদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
জাম্বুরি মাঠ সরকারি কলোনির বাসিন্দা জানান, কলোনিতে কোমর সমান পানি জমে রয়েছে। আশপাশ এলাকায় পানিতে থৈ থৈ করছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শত শত দুর্ভোগের মধ্যে অফিসে যেতে হয়েছে। এক কর্মকর্তা জানান, দুই কিলোমিটার দূরে অফিসে যেতে একশত টাকা রিকশা ভাড়া গুণতে হয়েছে।
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের মূল পয়েন্টে সাগরে ঢেউয়ের প্রচ- আঘাতে ঝুপড়িগুলোর চাল উড়ে যায়। সাগরের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে পাথরের বাঁধে। এতে সৈকতের পাঁচ শতাধিক দোকান বন্ধ হয়ে যায়।
সাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে রাতভর বৃষ্টিতে নগরীর নিচু এলাকায় পানি জমে দুর্ভোগে পড়েছে নগরবাসী। এর আগে মে মাসের শেষের দিকে মোরার প্রভাবে বৃষ্টিপাতসহ চলতি বর্ষায় বেশ কয়েকবার জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়া অফিস জানান, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর সর্তকতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এর প্রভাবে ভারীবর্ষণ ও ভূমিধসের সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, উত্তর অন্ধ্র প্রদেশ-দক্ষিণ উড়িষ্যা উপকূলের অদূরে পশ্চিম মধ্য-বঙ্গোপসাগরে ও তৎসংলগ্ন এলাকায় লঘুচাপটি অবস্থান করছে। এটি আরও ঘনীভূত হয়ে মৌসুমী নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্র বন্দরসমূহের উপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বা তারও অধিক বেগে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর সর্তকতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের পূর্বাবাস কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম বলেন, সুস্পষ্ট লঘুচাপটির প্রভাবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ১ থেকে ২ ফুট অধিক উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
| M | T | W | T | F | S | S |
|---|---|---|---|---|---|---|
| 1 | 2 | 3 | 4 | |||
| 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10 | 11 |
| 12 | 13 | 14 | 15 | 16 | 17 | 18 |
| 19 | 20 | 21 | 22 | 23 | 24 | 25 |
| 26 | 27 | 28 | 29 | 30 | 31 | |
