প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা আর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাহেব আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনলের প্রসিকিউশনকে কয়েক হাত দেখে নিচ্ছেন গতকাল থেকে দেখা যাচ্ছে। বারবার বলছেন সাইদীর ফাঁসির রায় না আসা নাকি রাষ্ট্রপক্ষের ব্যর্থতা। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছেন এই প্রসিকিউশান টিম কিন্তু ঠিকই ট্রাইব্যুনাল থেকে সাইদীর ফাঁসির রায়ই নিয়ে এসেছিলো।

মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেল মহোদয় বারবার গাফিলতির কথা বলছেন, বলছেন সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবের কথা- ওনার তো মাথায় রাখা উচিত যে প্রসিকিউশনকে হেয় প্রতিপন্ন করে প্রকারন্তে ট্রাইব্যুনালের রায়কেই হাস্যম্পদে পরিণত করা হচ্ছে। প্রমাণ যদি নাই থাকে তাহলে ট্রাইব্যুনাল কী দেখে রায় দিয়েছিল? আর উচ্চ আদালত যে অধঃস্তন আদালতকে এভাবে হয়ে করছেন- তাদের তো জানা থাকার কথা আর সবগুলো রায়ও অধঃস্তন আদালত হয়েই এসেছিলো। কাদের মোল্লা ছাড়া আর সব মামলাতেই তো ট্রাইব্যুনালের রায়ই আপিলে বহাল থেকেছে। তাহলে যেই ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের বিবেচনায় নিজামী, মুজাহিদ, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, কামারুজ্জামানদের মত হেভিওয়েট রাজাকারদের ফাঁসি হয়েছিলো সেই একই ট্রাইব্যনালের বিচারেই তো সাইদীর ফাঁসি হয়েছিলো। প্রসিকিউশানকে বারবার অদক্ষ বললে কিন্তু প্রকারন্তে ট্রাইব্যুনালকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।

এখন ধরেন আপনি বলতেই পারেন, ট্রাইব্যুনাল থেকে আপিল বিভাগ যেহেতু উচ্চতর কোর্ট সুতরাং এখানে পরিবর্তন আসতেই পারে, তথ্য প্রমাণের কিছুটা ভিন্নতর বিশ্লেষণ হতেই পারে। ওকে ফাইন। আপনাদের একটু পুরনো কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। আপিল বেঞ্চে ছিলেন পাঁচজন বিচারপতি। তাদের কাছ থেকে আসে তিন ধরনের রায়। সাইদীকে আমৃত্যু কারদণ্ডের পক্ষে রায় দেন তিনজন। আর তিন বিচারকের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে সাইদি মৃত্যুদণ্ডের অপরাধ করেছেন বলে মত দেন বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

অর্থাৎ যে প্রমাণাদি পেশ করা হয়েছিল তাতে আপিল বেঞ্চের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী কনভিন্সড ছিলেন। যেই তথ্য প্রমাণকে প্রধান বিচারপতি মৃত্যুদণ্ড দেবার পক্ষে  যথেষ্ট মনে করছেন না সেই একই তথ্য প্রমাণেই বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ফাঁসির পক্ষে রায় দিয়েছেন। তাহলে একটা বিষয় পরিষ্কার যে প্রসিকিউশনের দেয়া তথ্য প্রমাণাদি ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারপতি, যথাক্রমে বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন, বিচারপতি আনোয়ারুল হক-কে ফাঁসির রায় দেয়ার জন্য বাধ্য করেছিল, শুধু তাই নয় আপিল বিভাগের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীকেও বাধ্য করেছিল সাইদীকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিতে।

তাহলে আপনাদের বিচারকদের মধ্যে একজনকে যেই তথ্য-প্রমাণ মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পক্ষে কনভিন্সড করতে পারলো, যেই তথ্য-প্রমাণ ট্রাইব্যনালকে কনভিন্সড করতে পারলো সেই একই তথ্য প্রমাণ আপনাকে কনভিন্সড করতে পারলো না। তাহলে দেখা যাচ্ছে সমস্যাটা প্রসিকিউশনের অদক্ষতা নয়, সমস্যাটা অন্য কোথাও।

পত্রিকা মারফত আমরা জানতে পারছি, আমাদের আপিল বিভাগ মামলাগুলোকে অনেকটা ফৌজদারী মামলার মত পরিচালনা করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মহোদয়। যেখানে যুদ্ধাপরাধ কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে অনেক সময়েই ফৌজদারি বিধিবিধান প্রযোজ্য হয় না। এই জিনিসগুলোও আলোচনায় আসা উচিত। মোদ্দা কথা হচ্ছে ট্রাইব্যুনাল থেকে শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রসিকিউশনের আর আপিল বিভাগ থেকে আসামির শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব অ্যাটর্নি জেনারেলের। ট্রাইব্যুনাল থেকে ফাঁসির রায় এসেছে সুতরাং প্রসিকিউশন সফল, আপিল বিভাগ থেকে দ্বিধাবিভক্ত রায় এসেছে এবং সামগ্রিক বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ড না এলেও সর্বোচ্চ শাস্তি এসেছে। ফলে বলতে পারি অ্যাটর্নি জেনারেল সাহেবও আংশিক সফল। তাই অযথা প্রসিকিউশনকে দোষারোপ করার কোন অর্থ থাকতে পারে না।

রায় নিয়ে এত কথা বললাম দেখে অনেকে ভেবে বসতে পারেন, আদালত অবমাননা হচ্ছে। আমি যতদূর জানি রায় হয়ে যাওয়ার পর রায় নিয়ে কথা বলাতে কোন সমস্যা থাকে না। তারপরেও আইন সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তারাই ভালো বলতে পারবেন। আমার মনে হয় অযথা কাদা ছোড়াছুড়ি দিনশেষে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকেই দুর্বল করে তুলছে।

লেখক: অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031