হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জেফ ম্যাসন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করে শনিবার স্থানীয় সময় রাতে বক্তব্য রাখছিলেন । তার সমালোচনার ধার এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে, উপস্থিত সাংবাদিক ও আমন্ত্রিতরা বারবার দাঁড়িয়ে, হাততালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন। বিশেষ করে তিনি যখন বলেন, আমেরিকার জনগণের শত্রু নয় প্রেস, তখন অন্যরকম এক দৃশ্য রচনা হয় অনুষ্ঠানস্থলে। উপস্থিত সবাই ক্যামেরা রেখে, হাতের নোটপ্যাড রেখে, চায়ের কাপ রেখে দাঁড়িয়ে যান। তাকে অভিনন্দিত করেন। জেস ম্যাসন আরো কড়া করতে থাকেন তার সমালোচনা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেন, ‘আমরা এখানে সমবেত হয়েছি প্রেসকে সেলিব্রেট করতে, কোনো প্রেসিডেন্সিকে নয়। আমরা ভুয়া বা মিথ্যা সংবাদ লিখি না বা প্রচার করি না’। অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে কৌতুক করেন কমেডিয়ান হাসান মিনহাজ।
যথারীতি প্রতি বছরের মতো শনিবার রাতেও হোয়াইট হাউসে কর্মরত বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকদের সংগঠন হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন নৈশভোজের আয়োজন করে। এতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। কিন্তু তিনি এতে যোগ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এতে যোগ না দিয়ে তিনি যোগ দেন পেনসিলভেনিয়ার হারিসবার্গে তার ক্ষমতা গ্রহণের ১০০তম দিন উদযাপনের র‌্যালিতে। সেখানে তিনি বক্তব্য রাখেন। মিডিয়াকে সমালোচনায় ক্ষত-বিক্ষত করে তোলেন। বলেন, তার বিরুদ্ধে যে সমালোচনা করা হচ্ছে সেগুলো ভুয়া বা মিথ্যা খবর। বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তার সমালোচনায় আহত হন হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি জেফ ম্যাসন। তার কণ্ঠে এর জবাব এলো আগুনের গোলার মতো। তিনি বুঝিয়ে দিলেন প্রেস বা মিডিয়ার স্বাধীনতা কাকে বলে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে তাই তিনি আক্রমণ শানিয়েছেন একের পর এক। জেফ ম্যাসন বলেন, সাংবাদিকরা কারা, তারা কি করেন- এসব বিষয়ে একজন প্রেসিডেন্টের বাগাড়ম্বরতা কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না মিডিয়া। ম্যাসন বলেন, আমাদের স্বাধীনতা গড়ে তোলার ভিত্তি হলো অবাধ বা স্বাধীন মিডিয়া। সেই সাংবাদিকদের অবৈধ বা তাদের মানহানি করার যে চেষ্টা হচ্ছে তা একটি সুস্থ প্রজাতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ। উল্লেখ্য, ক্ষমতা গ্রহণের আগে থেকেই মিডিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা সৃষ্টি করে ফেলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি মিডিয়ার বিরুদ্ধে যে আচরণ করছেন তার প্রতিবাদে বেশ কিছু সংবাদ সংস্থা হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস নৈশভোজে অংশ নেয়নি। এর মধ্যে রয়েছে ভ্যানিটি ফেয়ার, ব্লুমবার্গ। এর আগে শুক্রবার অনুষ্ঠিত নৈশভোজ পূর্ববর্তী অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকে দ্য নিউ ইয়র্কার। তবে নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন প্রথম সারির অনেক সেলিব্রেটি। তবে এ অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হলো সাংবাদিকদের বৃত্তি দেয়ার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা। এবারের অনুষ্ঠানে ট্রাম্প যোগ দেননি। যোগ দেয়নি অনেক সেলিব্রেটিও। সিএনএনসহ বিভিন্ন মিডিয়া কোম্পানি সিদ্ধান্ত নেয়, এ বছর অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে সেলিব্রেটিদের আমন্ত্রণ জানানোর পরিবর্তে সাংবাদিকতার ছাত্রদের আমন্ত্রণ জানানোর। এদিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি খ্যাত সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড ও কার্ল বার্নস্টেইন। উল্লেখ্য, হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ১৯২১ সালে।
এদিকে ডিনারে উপস্থিত ছিলেন কৌতুক অনুষ্ঠান ডেইলি শো’র ‘জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক’ ও কমেডিয়ান হাসান মিনহাজ। অনুষ্ঠানে তার সেরা ১০টি কৌতুক জড়ো করেছে সিএনএন।
আমেরিকায় সংখ্যালঘু হওয়া নিয়ে এ মুসলিম কৌতুকাভিনেতা বলেন, ‘আপনাকে দ্বিগুণ ভালো হতে হবে। আপনি কোনো ভুল করতে পারবেন না। কারণ, যখনই আপনাদের কেউ একজন ঝামেলা পাকায়, তখন ‘সে’ (ট্রাম্প) আপনাদের পুরো গ্রুপকে দায়ী করে। আর তখনই আপনি জেনে যাবেন সংখ্যালঘু হওয়ার যন্ত্রণা কী।’
সংবাদমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তাদায়ী আমেরিকান সংবিধানের প্রথম সংশোধনী নিয়েও কৌতুক করেন মিনহাজ। তিনি বলেন, ‘এই অনুষ্ঠান আয়োজনই করা হয় প্রথম সংশোধনী ও বাকস্বাধীনতা উদযাপন করতে। বাকস্বাধীনতা যেকোনো মুক্ত ও উদার গণতন্ত্রের ভিত্তি। কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে হোয়াইট হাউস – সর্বত্রই এই কথা প্রযোজ্য। শুধু আমেরিকাতেই ভারতীয় আমেরিকান মুসলিম একটি ছেলে মঞ্চে এসে দেশের প্রেসিডেন্টকে নিয়ে ব্যঙ্গ করতে পারে।’
টিভি চ্যানেল সিএনএনকে নিয়ে মজা করতেও থামেননি। চ্যানেলটির জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক ডন লেমনকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘ডন, যতবার আমি তোমার অনুষ্ঠান দেখেছি, ততবারই আমার মনে হয় আমি একটা রিয়েলিটি টিভি শো দেখছি। ‘সিএনএন টুনাইট’-এর নাম হওয়া উচিৎ ‘ওয়েইট অ্যা সেকেন্ড’, ‘হোল্ড অন’, ‘’স্টপ ইয়েলিং অ্যাট ইচ’ উইথ ডন লেমন।’
বাদ পড়েননি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও। মিনহাজের ভাষায়, ‘রুমে না থাকা হাতিকে নিয়েও আমাদের কথা বলতে হবে। আমাদের দেশের নেতা এখানে নেই, কারণ তিনি থাকেন মস্কোতে।’ ট্রাম্পের ঘনঘন গলফ খেলা নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিবার যখন ট্রাম্প গলফ খেলতে যান, তখন শিরোনাম হওয়া উচিৎ এমন: ট্রাম্প গলফ খেলছেন, কেয়ামত বিলম্বিত।’
ট্রাম্পের আলোচিত উপদেষ্টা কেলিয়ান কনওয়ে ও তার ‘বিকল্প সত্য’ (অলটারনেটিভ ফ্যাক্টস) নিয়ে মিনহাজ বলেন, ‘আপনারা আর্তনাদ করলেও, আমি ইতিমধ্যে কেলিয়ান কনওয়েকে নিয়োগ দিয়ে ফেলেছি। তবে টিভি মানডেটে গিয়ে তিনি সবাইকে বলে বসতে পারেন, আমি তাকে ‘মেরেছি’। কিন্তু তাতে কার কী আসে যায়!’
ট্রাম্প প্রশাসন নিয়ে তিনি বলেন, ‘হোয়াইট হাউস থেকে সংবাদ যা আসছে, তা খুবই কষ্টদায়ক। আর আমি হাউস অব কার্ডস দেখছি একটু স্বস্তি পেতে।’ ফ্রেডেরিক ডগলাস নামে আমেরিকার প্রখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ সমাজ সংস্কারক নিয়ে তিনি বলেন, ‘ফ্রেডেরিক ডগলাস এখানে নেই। কারণ, তিনি মারা গেছেন। দয়া করে খবরটা কেউ প্রেসিডেন্টকে দাও।’ আফগানিস্তান নিয়ে তার বক্তব্য, ‘ঐতিহাসিকভাবে প্রেসিডেন্ট এ ডিনারে থাকেন। কিন্তু সবাই বোধ হয় এ নিয়ে একমত হবেন যে, এ মাসে খুব বেশি বোমা মেরে ফেলেছেন তিনি।’

Share Now
February 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
232425262728