ডনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছেছেন। সম্প্রতি যে উত্তর কোরিয়াকে সম্পূর্ণরূপে গুঁড়িয়ে দেবার হুমকি দিয়েছেন, তিনি অবস্থান করছেন সেই উত্তর কোরিয়া থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধের এক দামামা বাজছে দীর্ঘদিন ধরে। এখন সেই ‘যুদ্ধক্ষেত্রের’ একেবারে সীমানার মধ্যে পৌঁছে গেছেন ট্রাম্প। কোনো উস্কানি এলেই ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ এক বিপর্যয়। এমনকি ট্রাম্পকে টার্গেট করে ছোড়া হতে পারে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র।

 ফলে চারদিকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন ডেইলি মিরর। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের অসান বিমানঘাঁটিতে মঙ্গলবার অবতরণ করেছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। গত ২৫ বছরের মধ্যে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট দক্ষিণ কোরিয়া সফরে এলেন। সেখানে অবতরণ করে স্ত্রী মেলানিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বিমান থেকে নামেন ট্রাম্প। এ সময় ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানানো হয়। তিনি উপস্থিত সেনা সদস্যদের সঙ্গে করমর্দন করেন। অন্যদিকে, কয়েক হাজার দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক এ সময় বিমানঘাঁটির বাইরে জড় হয়ে ট্রাম্পের সফরের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন। ২৪ ঘণ্টার এই সফরে ট্রাম্প প্রত্যক্ষভাবে সামরিক বাহিনীর মহড়া পর্যবেক্ষণ করবেন। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু হুমকির মোকাবিলা করতেই এই প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিমানবাহী রণতরী এই মহড়ায় অংশ নেবে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ৩০ হাজারেরও বেশি সেনা সদস্য অবস্থান করছেন। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প সামরিক সংঘাতের দিকেই যাচ্ছেন। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পরমাণবিক এবং ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা অব্যাহত রেখেছে উত্তর কোরিয়া। এ নিয়ে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে ট্রাম্পের বাকবিতন্ডা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোরীয় উপদ্বীপ অঞ্চলে একটি ভয়াবহ সংঘাত বেধে যেতে পারে যে কোনো সময়। কিম জং উন ও ডনাল্ড ট্রাম্প বহুদিন ধরেই একে অপরকে হুমকি দিয়ে আসছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, উত্তর কোরিয়াকে মোকাবিলা করা ট্রাম্পের একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ১২ দিনের ৫ দেশব্যাপী এশিয়া সফরে মঙ্গলবার ট্রাম্প জাপান সফর শেষে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সেনাঘাটিতে পৌঁছান। তিনি পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। জাপান সফরেও ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। সেখানে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র জানায়, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপের দিন শেষ। চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে যে কোনো সময়। সোমবার জাপানের প্রেসিডেন্ট শিনজো আবে এবং ডনাল্ড ট্রাম্প সাক্ষাৎ করেন। বাণিজ্য সংক্রান্ত চুক্তির পাশাপাশি তারা কোরীয় উপদ্বীপ অঞ্চলে বিরাজমান সাম্প্রতিক উত্তেজনা নিয়ে নিবিড়ভাবে কথা বলেছেন।  সেখানে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রশস্ত্র কিনে- জাপান চাইলেই উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রকে আকাশের বাইরে তাড়িয়ে দিতে পারবে। তিনি উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে জাপানের রক্ষণাত্মক অবস্থান পাল্টানোর পরামর্শ দেন। ট্রাম্পের দক্ষিণ কোরিয়া সফরের মূল প্রতিপাদ্য মূলত সে দেশের প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন’কে তার রক্ষণাত্মক অবস্থান থেকে সরিয়ে আনা। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বিরাজমান সংঘাত নিরসনে প্রেসিডেন্ট মুন বরাবরই সংঘাত বিরোধী মনোভাব দেখিয়ে আসছেন। তিনি সংলাপের মধ্য দিয়ে সমাধানে পৌছুতে আগ্রহী। ট্রাম্প তাকে এ অবস্থান পাল্টানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চাপ দেবেন। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক ব্যয় বাড়ানোর পরামর্শও দেবেন। উত্তর কোরিয়াকে দমনের জন্যে ট্রাম্প কিছুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেবার সংকল্প প্রকাশ করে আসছেন। তিনি উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের বাড়াবাড়িকে ছোট ক্ষেপণাস্ত্র মানবের আত্মবিধ্বংসী উদ্যোগ বলে আখ্যায়িত করেন। জবাবে কিম জং উনও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সমঝোতায় তারও আগ্রহ নেই। তিনি ট্রাম্পকে মানসিক বিকারগ্রস্ত, ভীমরতিসম্পন্ন, বুড়ো  বলে উল্লেখ করেন।
যুদ্ধের দামামা কি বাজে?
সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি একটা গুমোট রূপ ধারণ করেছে। সম্ভাব্য সংঘাতের আগুনে ঘি ঢালছে ট্রাম্পের এশিয়া সফরের দুইদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত একটি চিঠি। বার্তা সংস্থা আল জাজিরা বলেছে, ওই চিঠিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের রিয়ার এডমিরাল মাইকেল ডুমন্ট উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে নানান ¯পর্শকাতর পর্যালোচনা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি উচ্ছেদ এবং নিরাপদভাবে পরমাণু অস্ত্রসমূহ বাজেয়াপ্ত করতে হলে- সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে স্থলযুদ্ধ। স্থল আক্রমণের মাদ্ধ্যমেই একমাত্র পুরোপুরিভাবে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মকা- সমূলে বিনাশ করা সম্ভব হবে। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধলে- সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিরুপন করতে রিয়ার এডমিরাল মাইকেল ডুমন্টকে অনুরোধ জানান যুক্তরাষ্ট্রের দুইজন কংগ্রেস সদস্য। সেই অনুরোধের জবাবে তথ্য উপাত্ত এবং সম্ভাব্য করণীয় সম্বন্ধে বিস্তারিত পরামর্শ দেন ডুমন্ট। কংগ্রেস সদস্যদ্বয়ের একজন টেড লিউ পরে তার ওয়েবসাইটে এ চিঠিটি প্রকাশ করেন।
একদিকে উত্তর কোরিয়ার ক্রমাগত বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পরমাণু কর্মসূচি অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে এশিয়াতে ট্রাম্পের প্রথম সফর। এশিয়ান মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে ট্রাম্প এগিয়ে চলেছেন একটি কঠিন অবস্থানের দিকে। ২৫ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের এই প্রথম দক্ষিণ কোরিয়া সফর, জাপানকে সঙ্গে নিয়ে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে সমন্বিত পদক্ষেপ নেবার হুমকি- সব কিছু মিলিয়ে কি কোরীয় দ্বীপপুঞ্জে একটি আসন্ন যুদ্ধের দামামা বাজছে? বিশ্ববাসী এখন অধীর আগ্রহে কান পেতে আছে সেই দিকে।
Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031