রাস্তা থেকে উধাও হয়ে যায় গণপরিবহন রাস্তায় শৃঙ্খলা আনতে নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ যখনই অভিযানে নামে তখনই । এরকম আগেও হয়েছে। নগর পরিবহন মালিক সমিতির একাধিক নেতা ও ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে যেটুকু ধারণা পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যায় চলমান অভিযানের দ্বিতীয় দিনে নগরীতে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ গণপরিবহন চলাচল করেনি। এসব গাড়ির মালিকেরা অভিযান এড়াতে রাস্তায় গাড়ি বেরুতে দেননি। এর অর্থ সহজেই অনুমেয়, উধাও হয়ে যাওয়া গাড়িগুলোর রাস্তায় চলাচলের বৈধতা নেই। যেগুলো চলাচল করেছে, বৈধতা আছে বলেই সেসব গাড়ি রাস্তায় নেমেছে। যদি একেবারে কোনো গাড়িই চলাচল না করতো তাহলে অন্তত অভিযোগ করার অবকাশ থাকতো। বলা যেত, পুলিশি অভিযানের প্রতিবাদে রাস্তায় গাড়ি বের করেননি মালিক– চালকরা।
কৌতুহলী নাগরিকদের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠতে পারে, উধাও হওয়া এতো বিপুল সংখ্যক গাড়ি কি তাহলে এতদিন নগরীর রাস্তায় অবৈধভাবে চলাচল করতো ?
ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্র্তাগণ জানান, পাঁচদিনের চলমান অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্য হচ্ছে মূলতঃ গাড়ির ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন, রুট পারমিট, ইন্সুরেন্সসহ পরিবহনে শৃঙ্খলা বাড়ানো। পরিবহনে শৃঙ্খলা বলতে বোঝানো হচ্ছে, রাস্তায় যত্রত্রত্র ও মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে গাড়িতে যাত্রী ওঠানামা, অবৈধ পার্কিং ইত্যাদি।
যানবাহন খাতের এসব অনিয়ম নগরীতে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, তা থেকে উত্তরণ চান নগরবাসী। সেজন্যে কিছুটা দুর্ভোগ পোহালেও পুলিশের চলমান অভিযানে তারা খুশী। ট্রাফিক বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষও জোর দিয়ে বলেছেন, শৃঙ্খলা ফেরাতে তারা এর শেষ দেখবেন।
পরিবহন সেক্টরের বিশৃঙ্খলার জন্য প্রশাসন যেসব কারণকে দায়ী করে থাকেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা তার সঙ্গে আরও কিছু কারণ যোগ করতে চান। তাদের মতে, প্রশাসনের পর্যবেক্ষণের বাইরেও আর অনেক কারণ আছে যেগুলো পরিবহণ ব্যবস্থায় এক ধরণের নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। এগুলো হলো : ছোট আকারের গণপরিবহণের আধিক্য, দিনের বেলায় নগরীর রাস্তায় আন্তঃজেলা বাস–ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লং ভেহিকেলসের অবাধ চলাচল, ইপিজেড থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত নগরীর প্রধান সড়কে রিকশাসহ ধীরগতির গাড়ি চলাচল করা, প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রুট পারমিটবিহীন অবৈধ যানবাহনের ইচ্ছেমাফিক রুটে চলাচল, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি না থাকা, অধিকাংশ বাস কাউন্টার সার্ভিসের আওতায় না থাকা, লাইসেন্সবিহীন চালক, ট্রাফিকের অব্যবস্থাপনা, মালিক–শ্রমিকদের চাঁদাবাজি, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার সততা ও নিষ্ঠার অভাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সিটি সার্ভিসের গাড়িগুলো কাউন্টার সার্ভিসের আওতায় আনা গেলে মোড়ে মোড়ে গাড়ি দাঁড়ানো বন্ধ হয়ে যাবে। যানজটের জন্য মোড়ে মোড়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামাকে অন্যতম কারণ বলে দায়ী করা হয়।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, আলোচ্য সব অনিয়ম একদিনে নৈরাজ্যে পরিণত হয়নি। মূলতঃ প্রশাসনের উদাসীনতাই পরিবহন ব্যবস্থার আজকের এই পরিণতির জন্য দায়ী।
আমরা দেখেছি, ওয়ান ইলেভেনের সময় ট্রাফিক বিভাগ রাতারাতি পরিবহন ব্যবস্থায় একটি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিল। সে সময় নগরীতে যে স্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, শুধুমাত্র সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে না পারায় আজ নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আমরা নগর পরিবহণ নিয়ে প্রশাসনের যুতসই পরিকল্পনা আর দেখিনি। সঠিক ও কার্যকর পরিকল্পনা ছাড়াই কেউ কেউ হঠাৎ বিচ্ছিন্নভাবে পদক্ষেপ নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর সফল হতে পারেন না। জনদুর্ভোগ যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যায়।
শুধু প্রশাসনকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরা দুঃখের সাথে লক্ষ্য করেছি, ফুটপাত হকারমুক্ত করতে প্রশাসনের এবারের যে উদ্যোগ ছিল তা শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায়নি। রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপ এজন্যে দায়ী। দেখা গেছে, অনিয়ম বন্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে গেলেই দায়ীগণ রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছে গিয়ে ধর্ণা দেন। রাজনৈতিক দলের নেতারাও নিজেদের স্বার্থে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ জলাঞ্জলী দিতে ওঠেপড়ে লাগেন। অসহায় হয়ে পড়ে প্রশাসন।
নগরবাসী এবারের ট্রাফিক বিভাগের উদ্যোগে সেই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি চান না। পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ট্রাফিক বিভাগ সেই কঠোর অবস্থান ধরে রেখে এগিয়ে যাবে সেটাই কামনা করেন নগরবাসী। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে সাথে নিয়ে ধাপে ধাপে সকল অনিয়ম দূর করতে হবে। গাড়ির লাইসেন্স ও ফিটনেস প্রদানে অনিয়ম, জটিলতা বন্ধে কার্যকর নজরদারি, লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া সহজলভ্য করা, গ্রাহক সেবার অনিয়ম রোধে তাৎক্ষণিক গ্রাহক সেবা কেন্দ্র চালু, হয়রানি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেই নগরীর পরিবহণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আসবে। অনিয়ম–নৈরাজ্য বহাল রেখে একটি নগরীর স্বাভাবিক কার্যক্রম চলতে পারে না। দরকার সকলের সহযোগিতা।

Share Now
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031