শরণার্থীরা ফ্রান্সের রাস্তায় কনকনে ঠাণ্ডায় ভয়াবহ দুর্ভোগে রাতদিন কাটাচ্ছে । রাজধানী প্যারিসের রাজপথে উপরন্তু অসদাচরণের শিকার হচ্ছে তারা। পুলিশ তাদের কম্বল, স্লিপিং ব্যাগ কেড়ে নিচ্ছে। লন্ডনের অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক গবেষণায় এমন চিত্র ফুটে উঠেছে। তাতে দেখা গেছে নারী, পুরুষ ও শিশুরা পুলিশের প্রহারের শিকার হচ্ছে। তাদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। সরকার বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও পুলিশের এমন আচরণে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ইরিত্রিয়ার একটি পরিবারকে বলা হয়েছে ‘গেটম আউট অব ফ্রান্স’। অর্থাৎ ফ্রান্স থেকে তাদেরকে বেরিয়ে যেতে বলা হয়েছে। প্যারিসে এখন অসহনীয় মাইনাস ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এমন অবস্থার মধ্যে তাদেরকে কোনো সুরক্ষা না দিয়েই পুলিশ কেড়ে নিচ্ছে শিশুদের কম্বল। রিফিউজি রাইটস ডাটা প্রজেক্টের উপপরিচালক নাতালি স্টান্তন বলেছেন, লা চ্যাপেলে এলাকায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন গবেষকরা। ওই এলাকায় কর্তৃপক্ষ সাম্প্রতিক সময়ে অনেকবার ‘ক্লিয়ারেন্স’ অভিযান চালিয়েছে। নাতালি বলেছেন, আমরা যখন ওই এলাকায় ছিলাম তখন দেখেছি রাতের বেলায়, কখনো দিনের বেলায়ও শরণার্থীদের সব কিছু কেড়ে নিচ্ছে। অহরহই এমন দৃশ্য দেখা যায়। সরকার যে রাতে সবাইকে একটু উষ্ণতা দেয়ার পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছে সে রাতেই প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখতে পেয়েছে পুলিশ তাদের কম্বল কেড়ে নিচ্ছে। কেড়ে নিয়ে তা ফেলে দিচ্ছে পাশে রাখা একটি ট্রাকের ময়লা রাখার পাত্রে। এ নিয়ে যেসব শরণার্থীর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে তার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই বলেছেন, তাদেরকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। শতকরা ৫৪ ভাগ মানুষ এমন আচরণকে সহিংস বলে আখ্যায়িত করেছেন। তারা বলেছেন, এ সময় তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। তাদেরকে এ অভিযানের বিষয়ে কোনো কারণ জানানো হয় নি। ৪৫ বছর বয়সী একজন শরণার্থী গবেষকদের বলেছেন, একজন পুলিশ অফিসার এসে তার কাঁধে লাথি মারে। এতে তিনি এত বেশি ব্যথা পান যে তাকে ২০ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। অন্যরা বলেছেন, তারা দ্রুত স্থান ত্যাগ না করলে তাদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়েছে। এক আফগান যুবকের মতে, আমরা যদি তাদেরকে প্রশ্ন করি বা বলি যে, আমাদের যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই, সঙ্গে সঙ্গে তারা কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। শতকরা ৩৭ ভাগ শরণার্থী বলেছেন, প্যারিসে তাদের ওপর পুলিশ অন্য নানা রকম নির্যাতন চালায়। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক প্রহার। অশ্লীল গালি। এক তৃতীয়াংশের কাছে ছিল স্লিপিং ব্যাগ, তাঁবু, কম্বল, কাপড় ও অন্য বিভিন্ন রকম জিনিস। পুলিশ তার সবই নিয়ে গিয়েছে। নাতালি স্টান্তন বলেছেন, কিছু মানুষ এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন যে, এটা তাদের কাছে নতুন এক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনেকে হতাশ হয়েছেন। তাদের অনেকে ভেবেছিলেন ইউরোপ হলো এমন এক জায়গা যেখানে মানবাধিকার রক্ষা করা হয় এবং সেখানে এমন আচরণ করা হয় না। নির্যাতিত এসব শরণার্থী ঘুমানোর জন্য একটু নিরাপদ জায়গা চান। এক্ষেত্রে ফরাসি রকার যে ধারণার কথা বলেছে তার উল্টো শরণার্থীদের অভিজ্ঞতা। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো লি রৌক্স স্বীকার করেছেন, সব শরণার্থীর আশ্রয় দেয়া খুব কঠিন। তবে তিনি পুলিশের নৃশংসতা ও নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। জানুয়ারিতে তিনি বলেছেন, আমি মোটেও এমনটা বিশ্বাস করি না। পুলিশ এখন যা করছে তা হলো বিপন্ন মানুষগুলোকে আশ্রয় দেয়ার চেষ্টা করছে। প্যারিসে এক মাসের মতো অবস্থান করছেন একজন নারী। তিনি বলেন, আমি রাস্তায়ই দিনরাত কাটাই। আমার এখানে মোটেও কোনো নিরাপত্তা নেই। জরুরি সহায়তা বিষয়ক ১১৫ নম্বরে তিনবার ফোন করেছি। কিন্তু কোনো সাড়া পাই নি। এখানে রাস্তায় থাকা খুব বিপদজনক। এখানে আমার কোনো আপনজন নেই। আমার চারপাশে অনেক পুরুষ থাকে। তাদের মাঝে আমি রাতে ঘুমাতে ভয় পাই। গবেষকরা যেসব শরণার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি বলেছেন, তারা স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন। একজন পুরুষের এফেন্ডিসাইট অপারেশনের পরের দিনই তাকে রাস্তায় চলে আসতে হয়েছে। অন্যরা ডায়াবেটিস ও অন্য মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। কেউ কেউ শুনেছেন ঠাণ্ডা, স্বাস্থ্যগত সমস্যা অথবা সহিংস হামলায় প্যারিসে মারা যাচ্ছেন শরণার্থীরা। বেশ কিছু শরণার্থী দেখতে পেয়েছেন একজন মানুষ রাস্তার ওপর দিয়ে এলোপাতাড়ি দৌড়াচ্ছেন। অনিশ্চিত আরেক সূত্র দাবি করেছে, আরেকজন প্যারিসের পরিস্থিতি দেখে আত্মহত্যা করেছেন। এক অভিবাসী বলেছেন, ওই লোকটি একটি উঁচু ভবনের ছাদে গিয়ে নিচে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। যেসব শরণার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গবেষকরা তাদের অনেকেই বলেছেন, কয়েক মাস ধরে তারা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বসবাস করছেন। কেউ কেউ ক্যালে জঙ্গলে ছিলেন। কেউ ছিলেন ডানকির্ক শিবিরে। কিন্তু ওই শিবির দুটি সরকার উচ্ছেদ করেছে। উল্লেখ্য, ক্যালে জঙ্গল উচ্ছেদ করার পর নভেম্বরে প্যারিসে প্রথম মানবিক সেবা কেন্দ্র চালু করা হয়। ক্যালে জঙ্গলে কয়েক হাজার শরণার্থী অবস্থান করছিলেন। সাক্ষাৎকারে অংশ নেয়া তিন-চতুর্ভাগ শরণার্থী ফ্রান্সে থাকতে চান। শতকরা ৩০ ভাগেরও কম চান বৃটেনে চলে আসতে। কিন্তু যাদের বয়স ১৭ বছরের নিচে তাদের অর্ধেকের বেশি বলেছে, তারা বৃটেনে আশ্রয় চায়। এর মধ্যে রয়েছে ১৬ বছর বয়সী একটি বালক। লন্ডনে তার ৪ ভাইবোন বসবাস করছে। তাদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য সে আবেদন করেছে। কিন্তু বৃটেন থেকে কোনো সাড়া পাচ্ছে না সে। যেসব সংখ্যালঘুর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে তাদের কোনো সঙ্গী নেই। এ অবস্থায় ফরাসি সরকারকে শরণার্থীদের প্রতি সদয় হওয়ার জন্য টেকসই কোনো প্রকল্প হাতে নিতে আহ্বান জানিয়েছে দ্য রিফিউজি রাইটস ডাটা প্রজেক্ট। একই সঙ্গে তারা বৃটিশ সরকারকে তাদের নৈতিক বাধ্যবাধকতা পূরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছে।
| M | T | W | T | F | S | S |
|---|---|---|---|---|---|---|
| 1 | 2 | 3 | 4 | |||
| 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10 | 11 |
| 12 | 13 | 14 | 15 | 16 | 17 | 18 |
| 19 | 20 | 21 | 22 | 23 | 24 | 25 |
| 26 | 27 | 28 | 29 | 30 | 31 | |
