মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক টানাপোড়েন প্রকট হচ্ছে মহানবী হযরত মুহম্মদকে (সা.) নিয়ে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির দুই নেতার বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে । উপসাগরীয় দেশ কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইনের পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, মালদ্বীপ, জর্ডান, লিবিয়াও ভারতের ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে। খবর বিডিনিউজের।

কুয়েতের বাজারে ভারতীয় পণ্য বর্জন করা হয়েছে। ইরান, কুয়েত এবং কাতার ওই ঘটনায় নিন্দা জানাতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। সৌদি আরব সমালোচনা জানিয়ে কড়া ভাষায় বিবৃতি দিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, উপসাগরীয় এবং এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এ মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সঙ্গে নয়া দিল্লির সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় ভারতীয় কূটনীতিকরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও ঝড়ের যে আরও অনেকখানি বাকি তা টের পাওয়া যাচ্ছে।

এই বিতর্কের মূলে রয়েছেন নূপুর শর্মা, যিনি ছিলেন ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপির মুখপাত্র। গত মাসে এক টেলিভিশন বিতর্কে তিনি নবীকে নিয়ে বিতর্কিত ওই মন্তব্য করেছিলেন। তার সেই বক্তব্যের ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। বিজেপির দিল্লি শাখার মিডিয়া প্রধান নভিন কুমার জিন্দালও বিতর্কিত এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে টুইটারে উসকানিমূলক পোস্ট দেন। তাদের এসব মন্তব্যকে ভারতে বিদ্যমান তীব্র ধর্মীয় বিভাজনের প্রতিফলন বলছেন সমালোচকরা। এই বিভাজন দেশটি গত কয়েক বছর ধরেই প্রত্যক্ষ করে আসছে। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও আক্রমণ তীব্রভাবে বেড়েছে। দুই বিজেপি নেতার, বিশেষ করে নূপুর শর্মার বক্তব্য ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সমপ্রদায়কে ক্ষুব্ধ করেছে। কিছু রাজ্যে বিচ্ছিন্নভাবে বিক্ষোভও দেখা গেছে। বিজেপির এই দুই নেতা এরই মধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন। নূপুরের সদস্যপদ স্থগিত এবং জিন্দালকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি এক বিবৃতিতে বিজেপি বলেছে, বিজেপি যেকোনো ধর্মের যেকোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে অপমানের কঠোর নিন্দা জানায়। কোনো সমপ্রদায় বা ধর্মকে অপমান বা হেয় করে- এমন যেকোনো আদর্শেরও বিরুদ্ধেও বিজেপি। বিজেপি এ ধরণের মানুষ কিংবা দর্শনকে সমর্থন করে না। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় যেভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গেছে তাতে বিজেপির নেওয়া এ পদক্ষেপ হয়ত যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে না।

ভারতকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলেছে কাতার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ ধরনের ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্যের জন্য যদি শাস্তি পেতে না হয়, এটি যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা মানবাধিকারের জন্য গুরুতর হুমকি হবে। এর মাধ্যমে বিদ্বেষ ও বিভাজন আরও বাড়বে, যা সংঘাত ও ঘৃণার চক্র তৈরি করবে। সৌদি আরবও তাদের বিবৃতিতে কড়া কড়া শব্দ ব্যবহার করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বিজেপির মুখপাত্রের বক্তব্যের নিন্দা জানাচ্ছে তারা।

বিতর্কিত ওই মন্তব্যের জেরে ৫৭ সদস্যের অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স (ওআইসি) এবং পাকিস্তানও ভারতের সমালোচনা করেছে। দিল্লি অবশ্য ওআইসি ও পাকিস্তানের সমালোচনাকে উড়িয়ে দিয়েছে। বলেছে, তাদের মন্তব্য ‘অবাঞ্ছিত ও সংকীর্ণচিত্তের’। বিশ্লেষকরা বলছেন, জল অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামলাতে এখন বিজেপি ও সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রকাশ্যে বিবৃতি দেওয়া লাগতে পারে। তা না হলে আরব বিশ্ব ও ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সংকটে অনেক কিছু: উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) সদস্য কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, বাহরাইন, ওমান এবং ইউএই। এই জোটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে ভারতের। ২০২০-২০২১ সালে জিসিসির সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৮৭ বিলিয়ন ডলার। এসব দেশে লাখ লাখ ভারতীয় কাজ করে, যারা কোটি কোটি ডলার রেমিটেন্স পাঠায় দেশে। ভারতের সবচেয়ে বেশি জ্বালানি আমদানিও হয় এসব দেশ থেকেই।

নবীকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া দেশগুলোর তালিকায় আরব আমিরাতের নাম থাকা নয়া দিল্লির জন্য ‘খুবই দুশ্চিন্তার’, বলছেন বিশ্লেষকরা। গত কয়েক বছরে আরব আমিরাতের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। দেশটি বহুজাতিক বিভিন্ন ফোরামে ভারতকে সমর্থনও করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যে বিতর্ক শুরু হয়েছে তা আরব আমিরাত এবং অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সামপ্রতিক কূটনৈতিক সাফল্যে ছায়া ফেলতে পারে। কয়েক বছরে দিল্লির সঙ্গে তেহরানের সম্পর্কে আগের মতো উষ্ণতা নেই। এর মধ্যে এই বিতর্ক ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আবদুল্লাহিয়ানের আসন্ন ভারত সফরেও প্রভাব ফেলতে পারে।

Share Now
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031