নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন  বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সে  আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক মাহাথির মোহাম্মদ। সাড়া জাগানো এ জয়ের মাধ্যমে আবারও ক্ষমতায় বসছেন তিনি। আর ক্ষমতায় বসে বুড়ো বয়সে আবারও ভেলকি দেখানোর জন্যও প্রস্তুত তিনি।

রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার পর সাড়া জাগিয়ে নির্বাচনে ফেরেন ৯২ বছরের মাহাথির। দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর নাজিবের বিরুদ্ধে বিরোধী জোট গড়ে নির্বাচনের ঘোষণা দেন তারই একসময়ের গুরু মাহাথির মোহাম্মদ।

নির্বাচনের আগে থেকেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছিলো। সে আভাসকে সত্য প্রমাণিত করেছে মালায়েশিয়ার প্রায় দেড় কোটি ভোটার। ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই মূলত দেশটির ক্ষমতায় রয়েছে বারিসান ন্যাশনাল (বিএন)। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো বিএনকে হটিয়ে ক্ষমতায় বসবে পাকাতান হারাপান জোট।

নির্বাচনের জয়লাভের পর মাহাথির মোহাম্মদ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তার জোট আইনের শাসন পুনঃস্থাপন করবে। এ ঘোষণার মাধ্যমে আবারো ভেলকি দেখানোর ইঙ্গিত দিলেন বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদ। তবে এখন পর্যন্ত নির্বাচন বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি নাজিব রাজাক। বিজয়ের পর সারাদেশে আনন্দ মিছিল করেছে পাকাতান সমর্থকরা।

সর্বশেষ সরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, সর্বমোট ২২২টি আসনের মধ্যে মাহাথিরের পাকাতান হারাপান জোট পেয়েছে ১২১টি আসন। আর নাজিব রাজাকের বারিসান ন্যাশনাল পেয়েছে ৭৯টি আসন। ১১২টি আসনে জয়লাভ করলেই সরকার গঠন করার এখতিয়ার রয়েছে। খবর সিএনএনের।

পাকাতান হারাপানের প্রধান নেতা মাহাথির মোহাম্মদ পিকেআর প্রধান ডা. আজিজান, ভাইস প্রেসিডেন্ট নূরুল ইজ্জাহ আনোয়ার, সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী মহিউদ্দিন ইয়াসিন, আমানহ প্রধান মোহাম্মদ সাবু সহ অধিকাংশ নেতা বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক ও উপপ্রধানমন্ত্রী আহমদ জায়েদি হামেদি জয় লাভ করলেও শাসক জোটের অনেক নেতা ও মন্ত্রী পরাজিত হয়েছেন।

বিজয় ঘোষণার পর মাহাথির বলেন, ‘শুধু কয়েকটি ভোট নয়, কয়েকটি সিট নয়, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই জয়লাভ করেছি।’ বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর সমর্থকদের নিয়ে জয় উদযাপনের ঘোষণাও দেন তিনি।

মালয়েশিয়ার এই পরিবর্তনের মধ্যে ভালো কিছু দেখছেন বলে জানিয়েছে সমর্থকরা। তারা আগামীতে ভালো সরকার এবং পূর্ণ স্বাধীনতা ও একতা দেখতে চান।

তবে ইতিহাস গড়ে জয়লাভ করলেও পূর্বের মতো পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না মাহাথির মোহাম্মদ। দায়িত্ব নেয়ার দুই বছর পরই ক্ষমতা ছাড়তে হবে তাকে। এই শর্তেই বিরোধী জোট গঠনের সম্মত হন তিনি। দুই বছর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দেশটির জেলে থাকা আরেক রাজনীতিবিদ আনোয়ার ইব্রাহিমকে নি:শর্ত ক্ষমা করে মুক্তি দেবেন তিনি। এরপরই মাহাথির মোহাম্মাদের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করবেন আনোয়ার ইব্রাহিম।

১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ বছর ক্ষমতায় থেকেছেন মাহাথির মোহাম্মাদ। ২০০৩ সালে নাজিব রাজাকের সঙ্গে দ্বন্দ্বের পর রাজনীতি থেকে সেচ্ছায় ইস্তফা দেন তিনি। তবে দেশটির হাল ধরতে শেষ বয়সে এসে আবারও রাজনীতির মাঠে নামেন তিনি।

সাধারণ একটি পরিবার থেকে উঠে আসা মাহাথির মোহাম্মদ ২২ বছর ক্ষমতায় থেকে সমস্যায় জর্জরিত মালয়েশিয়াকে আধুনিক মালয়েশিয়ায় রূপান্তরিত করেন। ১৯৬৪ ও ৬৯ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭২ সালে সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭৪ সালের নির্বাচনে জয়ের পর শিক্ষামন্ত্রী হন মাহাথির। পরে ১৯৭৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তুন হোসেন শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে উপ-প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।

এরপর ১৯৮১ সালের নির্বাচনে দেশটির চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। দীর্ঘ ২২ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার পর ২০০৩ সালে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান মাহাথির মোহাম্মদ।

২০২০ সাল পর্যন্ত বর্তমান অর্থনৈতিক কর্মসূচিও তার ঘোষণা করা ছিল। আশির দশকে গৃহিত ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি বাস্তবায়ন করা শুরু করেন। ফলাফল এই যে, ১৯৯২ সালে নিজ দেশের সবাইকে কর্মসংস্থান দিয়ে আরও আট লাখ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ দেয় মালয়েশিয়া। ১৯৮২ সালে থাকা মালয়েশিয়ার ২৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ জিডিপি ২০০২ সালে এসে দাঁড়ায় ৯৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।

তলানীতে থাকা একটি দেশকে ২২ বছরের মধ্যে যে উচ্চশিক্ষিত ও উন্নত দেশে পরিণত করা যায় তা মাহাথির মোহাম্মদ প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। বর্তমান অগ্রসরমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবারও তার নেতৃত্ব ও পরামর্শে মালয়েশিয়া আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে এই চাওয়া সাধারণ মালয়িদের। সূত্র: বিবিসি, সিএনএন, মালয়েশিয়া টুডে।

Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031