ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সরকারিভাবে মহামারির সমাপ্তি ঘোষণাকারী প্রথম কোনো দেশ স্লোভেনিয়া। বিশ্বের অধিকাংশ দেশই নভেল করোনাভাইরাসের মোকাবেলায় অচল হয়ে পড়লেও স্লোভেনিয়া চলতি মহামারির সমাপ্তি ঘোষণা করেছে। অবশ্য এর আগে সম্প্রতি নিজেদের করোনাশূন্য দেশ ঘোষণা দিয়েছিল এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, চলতি মাসের দুই সপ্তাহে স্লোভেনিয়ায় প্রতিদিন সাতজনেরও কম মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মহামারি ঘোষণার আগ পর্যন্ত দেশটিতে মোট আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৬৪ জন। মৃত্যু হয়েছে ১০৩ জনের।

স্লোভেনিয়া গত ১২ মার্চ করোনাভাইরাসকে তাদের দেশে মহামারি ঘোষণা করেছিল। তবে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে করোনা মহামারির সমাপ্তি ঘোষণা করেন। মহামারির কারণে সঙ্কটে পড়া নাগরিকরাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যে আর্থিক প্রণোদনা সরকার দিয়ে আসছিল মে মাসের শেষ থেকে তাও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গত দুমাস ধরে স্লোভেনিয়ায় মহামারি থিতিয়ে এসেছে…ইউরোপে মহামারির প্রেক্ষাপটে তাদের (স্লোভেনিয়া) চিত্র সবচেয়ে ভাল।

এদিকে মহামারির এ সমাপ্তি ঘোষণার ফলে ইউরোপীয় অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সীমান্তে জারি করা কড়াকড়িও শিথিল করেছে স্লোভেনিয়া। তবে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রত্যেক নাগরিককে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা, হাত ধোয়াসহ সব সতর্কতামূলক পদক্ষেপ আবশ্যকীয়ভাবে মেনে চলতে হবে।

এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলো থেকে যারা স্লোভেনিয়ায় প্রবেশ করবে তাদেরকে আগের মতো সাত দিনের কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে না বলেও জানিয়েছে সরকার। তবে ইউরোপের বাইরের দেশগুলো থেকে প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে অন্তত ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকার নিয়ম বহাল থাকছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহ থেকে গণপরিবহন চালু হবে দেশটিতে। স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়া হচ্ছে আগামী সপ্তাহে। আগামী সপ্তাহ থেকে চালু হয়ে যাবে রেস্টুরেন্ট ও ছোটখাটো সব হোটেল।

এদিকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে অনেকটা বিফল হলেও প্রাণ সংহারক এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে এশীয় দেশ ভিয়েতনাম।

নয় কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যার দেশটির সঙ্গে চীনের রয়েছে দীর্ঘ স্থল সীমান্ত। চীনের নিকটতম প্রতিবেশি হওয়ার পরও নজিরবিহীন কড়াকড়িতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত একজনেরও মৃত্যু হয়নি ভিয়েতনামে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের গোড়ার দিকেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া আর দেশের প্রত্যেক নাগরিককে পরীক্ষার আওতায় আনার কারণেই ভিয়েতনাম পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে বলে বিবিসি জানিয়েছে।

এক প্রতিবেদনে বিবিসি বলেছে, ভিয়েতনামকে করোনার বিস্তার ঠেকাতে অনেক শ্রম ও মূল্য দিতে হয়েছে। কারণ যে ধরনের কঠোর পদক্ষেপ দেশটি নিয়েছিল তার নেতিবাচক দিকও ছিল।

তবে বাড়াবাড়ি মনে হলেও যে ধরণের পদক্ষেপ ভিয়েতনাম নিয়েছিল মানুষের প্রাণ বাঁচাতে তেমনটা জরুরি ছিলো বলে জানিয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য গবেষণা বিষয়ক অংশীদার সংস্থার ড. টড পোলাক।

হ্যানয়ে কাজ করা এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘যদিও ভিয়েতনামের এই সাফল্য থেকে অন্য দেশগুলোর শিক্ষা নেওয়ার জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছে। অন্য দেশগুলো সেই সুযোগটা মিস করে গেছে। যখন অজানা ও সম্ভাব্য বিপদজনক একটা জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়া বিকল্প নেই তখন পদক্ষেপের কড়াকড়িটাই অনেক ভাল ফল এনে দিয়েছে।’

চীনের উহানে যখন মারণদশা ছলছিল তখনই ভিয়েতনামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বড়ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারার আশঙ্কায় দেশটির কর্তৃপক্ষ গোড়াতেই ভাইরাস ঠেকাতে ব্যাপক পরিসরে উদ্যোগ নেয়।

জানুয়ারি মাসের শুরুতে একজন আক্রান্তর সন্ধান না মিললেও ভিয়েতনাম সরকার তখনই চরম পর্যায়ে পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। আর জানুয়ারির ২৩ তারিখে প্রথম একজন রোগী শনাক্ত হওয়ার পর জরুরিকালীন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করে দেশটি।

হো চি মিন সিটিতে কর্মরত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিকাল রিসার্চ ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক গাই থোয়েটস বিবিসিকে বলেন, ‘অবাক করার বিষয় ভিয়েতনাম এত দ্রুত পদক্ষেপ নিতে শুরু করে যা তখন বেশি কঠোর আর বাড়াবাড়ি মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা গেছে তাদের প্রতিটা পদক্ষেপই সুবিবেচনার কাজ ছিল।’

‘সরকারের পাশাপাশি ভিয়েতনামিজ লোকজনও সংক্রামক রোগ মোকাবেলায় অনেক অনেক বেশি অভ্যস্ত। তারা ধনী দেশগুলোর থেকে এ ব্যাপারে অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে। তারা জানে কীভাবে এসব মোকাবেলা করতে হয়;- যোগ করেন অধ্যাপক থোয়েটস।

Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031