বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্ট্যাডিজ (সিজিএস) কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি ও সুশাসনের ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে । প্রতিষ্ঠানটি বলছে, করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের নানা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার অভাব ও দুর্নীতি লক্ষ্য করা গেছে। এসব কর্মকাণ্ড অংশগ্রহণমূলকও হয়নি। স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ও দেশে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব একই সূত্রে গাঁথা। এভাবে করোনা সংকট রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সিজিএস’র পক্ষ থেকে বেশকিছু সুপারিশও রাখা হয়েছে। গতকাল ঢাকায় এক ওয়েবিনার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সিজিএস। অনুষ্ঠানে ইউএনডিপি’র সহযোগিতায় ‘সার্চিং ওয়েস ফরোয়ার্ড ফর বাংলাদেশ ইন দ্যা টাইম অব প্যানডেমিক: কোভিড-১৯ অ্যান্ড গভর্নেন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক পলিসি ব্রিফ প্রকাশ করা হয়।

পলিসি ব্রিফটি লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ। ওয়েবিনার সঞ্চালনা করেন সিজিএস’র নির্বাহী পরিচালক ও টিভি উপস্থাপক জিল্লুর রহমান। পলিসি ব্রিফে ড. আলী রীয়াজ বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব শুধুমাত্র স্বাস্থ্য খাত কিংবা অর্থনৈতিক খাতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ব্যাপক মাত্রার একটি রাজনৈতিক সংকটেও পরিণত হয়েছে। এই মহামারির কারণে যে ইস্যুগুলো সামনে এসেছে সেগুলো ওতপ্রোতভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। গত নয় মাস যাবৎ বাংলাদেশ বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলা করে আসছে। এর মধ্যে প্রতিনিয়ত বিশ্বাসের ঘাটতি, দুর্বল শাসন ব্যবস্থা প্রদর্শন এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। ব্রিফে আরো বলা হয়, কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপকে বেশ কয়েকটি মৌলিক উপাদানের মাপকাঠিতে পরিমাপ করা যায়।  সেগুলো হচ্ছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মদক্ষতা, অংশগ্রহণমূলক কাজ ও আইনের শাসন। এসব উপাদানের মাপকাঠিতে করোনা মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা প্রকাশ পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে সরকারের সরে আসায় যে দুর্বল শাসন ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছে তা কোভিড-১৯ এর মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে কিছু সুপারিশ রাখা হয়েছে। সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, এনজিও ও নাগরিক সমাজের অন্তর্ভুক্ত করে কৌশল প্রণয়ন, প্রণোদনা প্যাকেজ বিতরণে কার্যকরী তত্ত্বাবধান এবং সুবিধাভোগীদের চাহিদা পুনঃনিরূপণ করে প্রতিনিয়ত তাদের খোঁজখবর রাখা, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনসহ সকল প্রকার নিপীড়নমূলক ও বিচারবহির্ভূত কার্যক্রম বন্ধ করা, দুর্নীতি বন্ধে দলীয় অনুগতদের প্রশ্রয় না দেয়া এবং দুদককে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়া, অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় বর্তমান সংকটকে চিহ্নিত করে তার সমাধানে পরবর্তী দুই বছরব্যাপী পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ বলেন, স্বাস্থ্যখাতে অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে বলে সরকার প্রচার করেছে। কিন্তু কোভিড-১৯ আসার পর দেখা যাচ্ছে পর্যাপ্ত আইসিইউ নেই, করোনা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অনেক উপকরণই সরকারের কাছে নেই। এতে বোঝা যাচ্ছে স্বাস্থ্যখাতে কার্যকর বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, করোনাকালীন সময়ে পর্যাপ্ত টেস্ট, চিকিৎসা সুবিধা পায়নি বহু নাগরিক। কিন্তু ভুক্তভোগীরা ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের ভয়ে তা প্রকাশ করতে পারেনি। এই আইন বাতিলের দাবি রেখে রাষ্ট্রকে আরো সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানান প্রফেসর আলী রীয়াজ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. আমেনা মোহসিন বলেন, করোনাকালীন সময়ে সামাজিক অস্থিরতা বেড়েছে। যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, শিশু নির্যাতন এমনকি আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে। দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরে অস্থিরতা লক্ষণীয় ছিল।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমরা শুধু স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। কিন্তু একই সঙ্গে একটা প্রজন্মের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অটোপাসের মাধ্যমে যারা উত্তীর্ণ হলো তাদের মান নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে। নির্বাচনে অনিয়ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের সুশাসনের ঘাটতি নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক সময় চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে আমরা লক্ষ্য করেছি সবাই যেন জবাবদিহিতার বাইরে। এই ধরনের নির্বাচনকে আমি ১০-এর মধ্যে ৪ নম্বর দেব।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশের শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আইন শাসকদের স্বার্থে ব্যবহার হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লোকজন জনগণের টাকা লুট করছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে নাগরিকরা। আগে ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তুলতো। এখন আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলছে। সরকারি দপ্তরে শুধু সরকারি দলের লোকজন সব সুবিধা পায়।

Share Now
April 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930