সিরিয়ার বিমানবাহিনী তুরস্কের সামরিক বাহিনীর ঘাঁটিতে আবারো বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে । গত বৃহস্পতিবার ইদলিবের তাফতানাজ সামরিক বিমানবন্দরে সর্বশেষ দফায় হামলা চলে। হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সেখানে ঘাঁটি স্থাপন করেছিল তুরস্কের সেনারা। এর আগে গত সোমবারও তুর্কি সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় বাসার আল-আসাদের অনুগত বাহিনী। একে বলা হচ্ছে, সিরিয়া যুদ্ধে এ বছরের সবথেকে নাটকীয় ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ওই হামলায় নিহত হয় তুরস্কের ৮ সেনা ও বেসামরিক কর্মকর্তা।
সিরিয়ার একমাত্র বিদ্রোহী অধ্যুষিত এলাকা ইদলিব। গত বছরের এপ্রিল থেকে সিরিয়ান সেনারা এটি পুনরায় দখলে নিতে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করছে।
সেখানে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে বেশ কয়েকটি বড় যুদ্ধ হয়েছে সরকারি বাহিনীর। এতে উভয়পক্ষের ব্যাপক হতাহতের পাশাপাশি নিহত হয়েছেন সহস্রাধিক বেসামরিক নাগরিকও। একইসঙ্গে প্রাণ বাঁচাতে বাড়ি ছেড়েছেন আরো কয়েক লাখ মানুষ। যে করেই হোক ইদলিব দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে আসাদ বাহিনী।
সিরিয়া যুদ্ধে দেশটির প্রধান সহযোগী রাষ্ট্র রাশিয়া। ২০১৫ সাল থেকে বাসার আল-আসাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত ও সিরিয়া যুদ্ধে তার জয় নিশ্চিতে সবসময় পাশে ছিল রাশিয়া। ইদলিবেও বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে মস্কো। তবে তুরস্ক সম্প্রতি সিরিয়ার বিদ্রোহীদের হয়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেছে রাশিয়ার সঙ্গে। দেশটি আশঙ্কা করছে ইদলিবে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ও রাশিয়ার অভিযান অব্যাহত থাকলে ওই অঞ্চল থেকে উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়া লাখ লাখ মানুষকে তুরস্ককে আশ্রয় দিতে হতে পারে। সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর ওপর গৃহহীনদের তুরস্কের দিকে ঠেলে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পরেও থেমে নেই অভিযান। বিদ্রোহীরা হামলা করছে এমন অভিযোগের জেরে সিরিয়া সেখানে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। ইতিমধ্যে সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে ইদলিবের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি শহর। ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে বিদ্রোহীরা।
ইদলিবে
অভিযান শুরু হওয়ার পর নতুন একটি বিষয় খুব স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসাদ
বাহিনী বিদ্রোহীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে, তুরস্ক তা নিয়ে রাশিয়ার কাছে বিচার
দিচ্ছে এবং রাশিয়ার মধ্যস্ততায় হামলা কিছুটা ধীর হয়ে আসছে। এরপর কয়েকদিন
যেতে না যেতেই আবারো আসাদ বাহিনী হামলা চালাচ্ছে এবং এই চক্র অব্যাহত আছে।
তবে সম্প্রতি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেফ তাইয়েফ এরদোগান হুঁশিয়ারি দেন,
রাশিয়া যদি ইদলিবে পরিস্থিতির উন্নতি করতে না পারে তাহলে সামরিক শক্তি
ব্যবহার করবে তুরস্ক। হুঁশিয়ারি কেউ কর্ণপাত না করায় সিরিয়ার অভ্যন্তরে
অভিযান পরিচালনা করে তুরস্ক। এরপরই ঘটনা দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। তাই
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি আর অন্যবারের মতো সাধারণ ঘটনা নয়। কারণ, এখন সিরিয়ার
হামলায় তুরস্কের সেনা মৃত্যুর হার কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
এদিকে
বৃহসপতিবার তুর্কি সেনাদের ওপর হামলার পর একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে
তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, রাশিয়াকে অবশ্যই
ইদলিবে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর এমন আচরণ বন্ধ করতে হবে। রাশিয়া জানিয়েছে,
তাদের একটি প্রতিনিধি দল ইদলিবের পরিস্থিতি নিয়ে তুরস্কের সঙ্গে আলোচনা
করবে। আশ্বাস দেয়া হয়েছে, প্রয়োজনে এরদোগানের সঙ্গে কথা বলবেন রুশ
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
সিরিয়ায় এখন কার্যত তুরস্কের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান করছে বাসার আল-আসাদের সরকারি বাহিনী ও রুশ সেনারা। গত বৃহস্পতিবার ইদলিবে রুশ ও সিরিয়ান সেনাদের আটকাতে সমরযান, ট্যাংক ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেনা মোতায়েন করে তুরস্ক। জবাবে এসব লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় সিরিয়া। এদিনই তুরস্ক সমর্থিত বিদ্রোহীরা হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ জানায় রাশিয়া। ইদলিবে এমন পরিস্থিতির জন্য তুরস্ককে দায়ী করে দেশটি।
মুখোমুখি তুরস্ক ও রাশিয়া
ইদলিবের
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তলানিতে অবস্থান করছে মস্কো ও আঙ্কারার মধ্যেকার
সম্পর্ক। দীর্ঘদিন ধরে চলা সিরিয়া যুদ্ধে পরস্পরের বিপক্ষ দলগুলোকে সমর্থন
করে আসছিল দেশ দুটি। তবে দুই দেশের মধ্যে থাকা বোঝাপড়ার কারণে তার খুব বেশি
প্রভাব নিজেদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়নি। বর্তমানে সিরিয়া ও লিবিয়াতে এই
দ্বন্দ্ব আরো কাছ থেকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে দেশ দুটিকে।
এরদোগান
চাচ্ছেন, রাশিয়া ২০১৭ সালে হওয়া আস্তানা চুক্তিকে সম্মান করুক। ওই চুক্তি
অনুযায়ী দেশগুলো সিরিয়ায় একটি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করবে ও তা
বাস্তবায়ন করবে। এতে সিরিয়ার অভ্যন্তরে ইদলিবসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে
যুদ্ধবিরতির কথাও উল্লেখ ছিল। ইদলিবে অভিযান শুরুর পর আঙ্কারা এখন সিরিয়ার
সরকারের বিরুদ্ধে সেই চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ এনেছে। একইসঙ্গে আসাদকে না
থামানোর জন্য রাশিয়াকেও হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
তবে রুশ বিশ্লেষকরা বিষয়টাকে
অন্যভাবে দেখছেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্সি
ক্লেবনিকভ মনে করেন, সিরিয়ার আসাদ সরকারের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে
তুরস্কের ধারণা অতিরঞ্জিত। রাশিয়া চাইলেই আরেকটি দেশের প্রধানকে দিয়ে যা
খুশি তাই করাতে পারে না। সিরিয়ার বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আসাদ সরকারের সঙ্গে
রাশিয়ার বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে। দামেস্ক কখনই মস্কোর পূর্ণ
নিয়ন্ত্রণে ছিল না। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগের তীর তুরস্কের দিকে ঠেলে দেন।
বলেন, আঙ্কারা নিজেও আস্তানা চুক্তির দিকগুলো মেনে চলেনি। এরমধ্যে একটি
হচ্ছে, চুক্তি অনুযায়ী তুরস্ক শুধু উদারপন্থি বিদ্রোহীদের সমর্থন দিতে
পারবে। কিন্তু সেখানে দেশটি ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলোকেও বাঁচানোর চেষ্টা
করছে।
তবে সংকট যখন প্রবল তখনো অন্য অনেক ক্ষেত্রে তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে রয়েছে ভালো সম্পর্ক। কিছু ক্ষেত্রে দেশ দুটির স্বার্থও এক। এরমধ্যে রয়েছে কৃষ্ণ সাগর পাইপলাইন কিংবা ন্যাটোর অস্বস্থি উপেক্ষা করে রাশিয়ার থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়। সার্বিকভাবে দেখলে এরদোগান ও ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কও বেশ ভালো। যখন তারা দেখা করেন তখন সাধারণত নিজেদের ‘ডিয়ার ফ্রেন্ড’ বা প্রিয় বন্ধু বলে সম্বোধন করে থাকেন তারা। তুর্কি সেনা নিহত হওয়ার পর পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথাও বলেন এরদোগান। এতে তিনি, ইদলিবে শান্তিচেষ্টা ভণ্ডুল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। পুতিনও তাকে আশ্বস্ত করেছেন বলেও জানিয়েছে রুশ গণমাধ্যমগুলো।
