রোহিঙ্গারা আর সেখানে ফিরে যেতে চায় না মিয়ানমারের রাখাইনে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা । মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে রোহিঙ্গারা জানায়, মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার অর্থ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা।
সোমবার থাইনখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। রোহিঙ্গাদের ভাষ্য, সহায়-সম্বল, ঘরবাড়ি, আত্মীয়স্বজন হারিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তারা। মিয়ানমারে ফিরতে হলে শূন্য হাতেই ফিরতে হবে তাদের। সরকার ফিরে যেতে বাধ্য করলে তারা বাংলাদেশের মাটিতে মরতে রাজি।
এদিকে মিয়ানমার সরকার বলছে, সুনির্দিষ্ট নাগরিকত্ব ছাড়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে না।
মিয়ানমারের বুচিডং টংবাজার এলাকার হাফেজ ইদ্রিস স্থানীয় এক মসজিদে চাকরি করতেন। পরিবার নিয়ে সুখে-শান্তিতে ছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে সব ওলট-পালট হয়ে গেছে। তাদের ঘরবাড়ি সব জ্বালিয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী। সাত দিন ধরে হেঁটে বন-জঙ্গল পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। তিনি আরো জানান, মিয়ানমারের নৃশংস নির্যাতনের মুখে তিনি আর স্বদেশ ফিরে যেতে চান না।
মিয়ানমারের মংডু জেলার বলিবাজার থেকে আসা সিব্বির মিয়ানমারে নির্মমতার বর্ণনা তুলে ধরেন এভাবে, ‘আমার চোখের সামনে আমার বড় ছেলে শহীদ হয়েছে। তাই এক কাপড়ে চলে এসেছি। ছেলেটারে দাফনও করতে পারিনি। আর কোনোদিন ফিরতে পারব কি না জানি না। ফেরার ইচ্ছাও নেই।’
চার দিন আগে ১৪ জন সদস্য নিয়ে আসা আনচুর আলী বলেন, ‘মুসলমান দেখলেই মগরা কেটে ফেলছে। সেনাবাহিনী গুলি করে মেরে ফেলছে। সেখানে যখন থাকতে পারছি না, তখন মুসলিম দেশে এসেছি। মরতে হলে এখানেই মরব।’
স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন বুচিডং টংবাজার এলাকার মৌলভী আবু শামা। আগের কোনো সংকটের সময়ই তিনি বাংলাদেশে আসেননি। কিন্তু এবার টিকতে পারেননি। নির্যাতনের মাত্রা ভয়াবহ হওয়ায় পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, তার জন্মভূমিতে ফিরতে চান তিনি, তবে তাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। বাঁচার সুযোগ দিতে হবে। অন্যথায় তিনি মিয়ানমারে আর ফিরে যাবেন না।
একই এলাকার বয়োবৃদ্ধ কামাল মিয়া অবশ্য ১৯৭৮ ও ১৯৯১ সালে সংঘাতের সময়ও বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন। দুবারই এনজিওর সহযোগিতায় নিজ দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। তবে এবার ফিরে যেতে হলে সব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে যাবেন। তাদের ভোটের অধিকারও ফিরে পেতে চান। এ ছাড়া কোনোভাবেই মিয়ানমার ফিরে যেতে চান না বলে জানান তিনি।
গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে ৩০টি পুলিশ ফাঁড়িতে বিদ্রোহীদের কথিত হামলার অভিযোগে রাখাইন রাজ্যে অভিযানে নামে সেনাবাহিনী। সাধারণ মানুষের ওপর হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে আগুনসহ রোহিঙ্গা নির্মূল করতে থাকে। প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। তবে স্থানীয় সূত্রমতে, এই সংখ্যা আরও বেশি।
সাগর ও নদীপথেও প্রচুর রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। নৌকা ডুবে নারী-শিশুসহ প্রাণ হারিয়েছে শতাধিক। শরণার্থীদের মধ্যে অনেকে গুলিবিদ্ধ ও আগুনে পুড়ে আহত ছিল।
এর আগে গত বছরের ৯ অক্টোবরের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একইভাবে হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় প্রাণভয়ে পালিয়ে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা।
