দেশে ধর্ষণের ঘটনার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধিতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও তারুণ্যের শক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করার সুযোগ কম থাকাকে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক খন্দকার ফারজানা রহমান।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ধর্ষণের মতো ঘৃণিত অপরাধের রাশ কমিয়ে আনতে পরিবার ও সমাজ থেকে তরুণদের মধ্যে নারী-পুরুষের সমতা ও অধিকারের বিষয় সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি ধর্ষণের মামলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যথাসময়ে এর বিচার শেষ করে রায় কার্যকর করতে হবে। যেসব রায় উদাহরণ হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাতে মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চারিত হয়।

এই অপরাধ বিশ্লেষকের বিশ্লেষণ, প্রতিটা বয়সের কিছু পজিটিভ এনার্জি থাকে। বিশেষ করে তারুণ্য বা কিশোর বয়সের। কিন্তু সমস্য হলো আমাদের দেশে সেই এনার্জিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করার সুযোগ অত্যন্ত কম। অবসরে তারা মোবাইলে পর্নোগ্রাফি বা ভায়োলেন্ট সিনেমা দেখে বেড়ে উঠছে।

ফারজানা রহমান বলেন, ‘হতে পারে তারা কোথাও কোনো কিছু দেখে এমন কিছু আবিষ্কার করল, আবার হয়তো ভায়োলেন্ট বা এগ্রেসিভ হয়ে গেল। এই ধরনের কিছু ভূমিকা থাকতে পারে। কারণ আমাদের কিশোরদের শারীরিক চর্চার জায়গা খুব সীমিত।’

‘পাশাপাশি ধর্ষণের ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিও আরেকটি বড় কারণ। দেখা যাবে, গত দশ বছরের মধ্যে ১০টি ধর্ষণের ঘটনারও চূড়ান্ত রায় হয়েছে, এমন উদাহরণ নেই। আর দেশের নারী শিশু বিচার ট্রাইব্যুনালে সাজার হার মাত্র ৩ ভাগ। আবার সেখানে বেশিরভাগ দেখা যায় মিথ্য মামলা। অনেক আসামি ছাড়াও পেয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আর ব্যক্তিগতভাবে যারা এসব করছে তাদের নিজস্ব কিছু ক্ষোভ হয়তো থাকতে পারে। কিন্তু একটা বিষয় সত্য যে কেউ জন্ম থেকে অপরাধী হয় না। কখনো মিডিয়া, কখনো পরিবার, কখনো আবার সমাজ থেকে সে অপরাধ শেখে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও কখনো শেখে। এক পর্যায়ে সমাজের আশপাশের সামাজিক ঘটনা দেখে এরা অপরাধ করে।’

‘আবার সমাজের একজন নেতা সে ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু সে ধরে নিবে তার বিচার হওয়ার সম্ভাবনা কম। যারা ধর্ষণ করে তাদের সঙ্গে আর্থিক প্রতিপত্তি, ক্ষমতা কোনো না কিছু জড়িত থাকে। ফলে তারা অনেক সময় নিরাপদ থাকেন।’

রাজধানীতে সাম্প্রতিক কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনার ব্যাখ্যা করে ফারজানা রহমান বলেন, ‘ধর্ষণের ক্ষেত্রে যেটা হয়, কোনো মেয়ের কাছ থেকে যদি প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ক্ষোভ বা কোনো কারণে ঝগড়া থাকে সেখানে মেয়েটির সতীত্ব নষ্ট করাটা সহজ। এমনটাই ধারণা। আর আমাদের সমাজব্যবস্থা এমন, যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে সে অপরাধ করে ফেলেছে। তাকে সমাজ থেকে আলাদা করা হয়। ফলে তার সমাজে পুনর্বাসিত হওয়া কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু এই বিষয়টি হওয়া উচিত ধর্ষণকারীর। কারণ সে অপরাধী। তাকে সমাজ থেকে আলাদা করে রাখতে হবে। এত বছরেও আমাদের সমাজব্যবস্থা ধর্ষিতবান্ধব নয়।’

ধর্ষণের ঘটনায় গণমাধ্যমে ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া দরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কারণ সব সময় ছবি দেয়া হয় মেয়েটির দিকে হাত বাড়িয়ে আছে, অথবা মেয়েটি কান্না করছে। কিন্তু ধর্ষকের কোনো প্রতিবিম্ব আমরা গণমাধ্যমে কম পাই। তবে ইদানীং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দেয়াল লিখনে এই প্রচলনের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। সেখানে দেখা যাচ্ছে ধর্ষকের মুখের দিকে পিস্তল তাক করে রাখা হয়েছে।’

‘ধর্ষিতার সাক্ষাৎকার বা আদালতে বক্তব্য দেয়ার কথা একজন নারী বিচারকের কাছে কিন্তু বাস্তবতা হলো অনেক জায়গায় নারী বিচারক নেই। আইনি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও নারীদের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এসব বিষয়গুলোতে নজর দেয়া উচিত।’

উত্তরণের উপায় হিসেবে দুটি বিষয় জোর দেয়া দরকার উল্লেখ করে এই অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, ‘এক হলো শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। যেমন- মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন অনেক স্কুলে প্রাথমিকভাবে একজন নারী পুরুষের শরীর সম্পর্কে ধারণা দেয়। বোঝানো হচ্ছে- এটা যে একজনের সম্মতিতে হওয়া উচিত, এটা জোর করে করার কিছু নয়। এগুলো সামাজিক এবং শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সামনে নিয়ে আসা উচিত। পরিবার থেকে বাবা-মায়ের সমতা এবং অধিকার নিয়ে সন্তানদের শেখানো উচিত। কারণ অনেক সময় দায় দেয়া হয় খারাপ পোষাক পড়েছে তাই ধর্ষণের শিকার হয়েছে। কিন্তু আমরা তো ছয় বছরের শিশুকেও ধর্ষিত হতে দেখি। আবার বোরকা পড়া নারীও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন।

‘আর দুই হলো সর্বোপরি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কঠিন কিছু কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সব ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে তা নয়, কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় যথাসময়ে শেষ করতে হবে। রায় কার্যকর করতে হবে। যা উদাহরণ হয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে এমন ঘটনা যারা করেন সেসব মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করবে।’

Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031