সাব্বিরের একদিন আগে অর্থাৎ বৃহস্পতিবার জন্মদিন ছিল । ঘনিষ্ঠ বন্ধু আহাদ জন্মদিনে তাকে উইশ করেছে, উপহার দিয়েছে; সবই ঠিক আছে। কিন্তু দুজন মিলে সেই অর্থে গতির ঝড় তোলাটা হয়নি। দুজনেরই যেটি ভীষণ পছন্দের। গতকাল তাই দুই বন্ধু মোটর সাইকেল নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন। সাব্বির মোটর সাইকেল চালাচ্ছিলেন, আহাদ পেছনে বসা ছিলেন। কে জানত সেই যাত্রাটা হবে অগস্ত্য যাত্রা?
নগরীর আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের ষোলশহর এলাকায় দ্রুতগামী একটি বাস পেছন থেকে ধাক্কা দেয় মোটর সাইকেলটিকে। বাসের ধাক্কায় আহাদ ফ্লাইওভারের উপর থেকে ছিটকে নিচে পড়ে যান। সাব্বির মোটর সাইকেলসহ পড়ে থাকেন ফ্লাইওভারের উপরে। চালক ঘাতক বাসটি নিয়ে দ্রুতবেগে পালিয়ে যায়। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। বাসটিকে পরে সীতাকুণ্ড উপজেলার ফকিরহাট এলাকায় ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে জব্দ করে পুলিশ। বাসের চালক জাহাঙ্গীর মাহমুদ (৫০), তার সহকারী মামুনুর রশিদ (৩০) ও বাস সুপারভাইজার মাহবুবুর রহমানকে (২৯) গ্রেপ্তার করা হয়।
গত ঈদুল আজহার আগের দিন ১ সেপ্টেম্বর আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারটি যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর এটি প্রথম বড় দুর্ঘটনা ঘটল। নিহতরা হলেন নগরীর মধ্যম গোসাইলডাঙা এলাকার হাজী বলু সওদাগর বাড়ির হাজী আব্দুন নূরের ছেলে আব্দুল আহাদ (২৪) ও খতিবের হাট লতিফ জামে মসজিদের পাশের বাসিন্দা মৃত হাজী আব্দুল হামিদের ছেলে মো. কাসিব হামিদ সাব্বির (২৪)। এদের মধ্যে আহাদ প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ও কাসিব সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ বিবিএস তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর জহিরুল হক আজাদীকে বলেন, শুক্রবার বিকেল তিনটার দিকে ষোলশহর কৃষি ব্যাংকের সামনে মুরাদপুর থেকে লালখান বাজারের দিকে আসা দেশ ট্রাভেলসের একটি বাস ওই মোটর সাইকেলকে ধাক্কা দেয়। মোটর সাইকেল আরোহী দুই যুবকের একজন ফ্লাইওভার থেকে নিচে পড়ে যায়। পথচারীরা দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
জেলা পুলিশের মেডিকেল–১ এর সহকারী উপ–পরিদর্শক আলাউদ্দিন তালুকদার বলেন, কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম আসছিল বাসটি। এটি আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার দিয়ে ফিরছিল। ফ্লাইওভারের একই পাশ দিয়ে মোটরসাইকেল আরোহী দুই তরুণও আসছিল। এসময় বাসটি মোটরসাইকেলটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে একজন ফ্লাইওভারের নিচে পড়ে যান। আরেকজন বাসের চাকায় পৃষ্ট হন।
এদিকে মেধাবী দুই তরুণের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে বন্ধু ও পরিচিত মহলে। নিহত আহাদ ও সাব্বিরের বন্ধুদের স্ট্যাটাস পেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই শোক প্রকাশ করে মন্তব্য করেন। আহাদ ছিলেন মা–বাবার এক ছেলে, দুই মেয়ের মধ্যে সবার বড়।
হোসেন রিয়াদ নামে তাদের এক বন্ধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন : ‘২০১১ তে আগ্রাবাদ শিশু পার্কের সামনে চায়ের টেবিলে। একাডেমিক দিক দিয়ে জুনিয়র হলেও সম্পর্কটা বন্ধুর মত ছিল। একসাথে দীর্ঘদিন আড্ডা, গল্প, ঘোরাঘুরি করে কাটিয়েছি। অনেক মায়া জড়ানো মধুর মুহূর্ত পার করেছি একসাথে। বিকেলবেলা নিউজটা শোনার পর থেকে কেমন জানি মনটা এখনো ছটফট করছে। বিশ্বাস করতে পারছি না এখনো। সবকিছু ঘোলাটে এবং ঝাপসা মনে হচ্ছে। জানি না তাদের পরিবারের কি অবস্থা। এইসব ভাবতেই পুরা শরীর শিহরণ দিয়ে উঠছে। নিয়তির এই নির্মম পরিহাস মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ওপারে ভালো থাকিস বন্ধু।’
রাকিব নামে অপর এক বন্ধু লিখেছেন, ‘এতো সহসাই না ফেরার দেশে চলে গেলি দোস্ত? ওপারেও প্রাণবন্ত থাকিস।’
