পানিবাহিত রোগে তিনজনের মৃত্যুর পর বাসিন্দাদের মধ্যে আতংক তৈরী হয়েছে; বর্তমানে ফিল্টার পানি ও বোতলজাত বিশুদ্ধ পানি কিনে পান করছেন অনেকেই চট্টগ্রামের হালিশহরে।

এর আগে গত মার্চ ও এপ্রিলে হালিশহরে পানিবাহিত রোগে তিন শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। গত কয়েকদিন ধরে ওই এলাকায় টাইফয়েড, জন্ডিস ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

পানিবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা দেওয়ার কারণ অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) স্বাস্থ্য বিভাগের তিন সদস্যের একটি দল মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে একজন চিকিৎসকের নেতৃত্বে দুইজন স্বাস্থ্যকর্মী তদন্ত কাজ শুরু করেন।

এ দিকে নগরীর হালিশহরে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ার পর গত সোমবার ওই এলাকার অন্তত ২৫টি বাসা থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করার পর মঙ্গলবার আরও পাঁচটি বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা।

হালিশহরের এ, বি, আই, কে ও এইচ ব্লকের বিভিন্ন বাসার ওয়াসার রিজার্ভ পানি ও লাইনের পানির নমুনা নিয়ে যায় ওয়াসার কর্মীরা। পানির নমুনা পরীক্ষার ফলাফল ৪৮ ঘন্টা পর জানানো হবে বলে জানিয়েছেন ওয়াসার গবেষকরা।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ক্যামিস্ট মিলন চক্রবর্ত্তী বলেন, এর আগেও আমরা নমুনা নিয়ে গেছি। কিন্তু কোন ধরনের জীবানু পাওয়া যায়নি। জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া একজনের বাসায়ও গিয়েছি আমরা। ওই বাসায় ওয়াসার সংযোগ নেই এবং সাম্প্রতিক সময়ে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করে আসছিল পরিবারটি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও হালিশহর এলাকার এই পানির নমুনা পরীক্ষা করানো হয়েছে। কিন্তু সেখানেও কিছু মেলেনি।

চট্টগ্রাম ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী আজিজুর রহমান বলেন, ওয়াসার পানির মাধ্যমে কোথাও ভাইরাস ছড়ায়নি বলে আমার ধারণা। তারপরও আমরা এসব নমুনা গুরুত্বের সাথে আমাদের ল্যাবে পরীক্ষা করবো। যারা বাসায় ওয়াসার পানি নিচের রিজার্ভ ট্যাংকে জমান, জলাবদ্ধতার কারণে তাদের পানিতে জীবানু প্রবেশ করতে পারে।

এদিকে মঙ্গলবার দুপুর একটায় হালিশহর বি ব্লকের দুই নাম্বার রোডের ১৬ লাইনের ১৯ নম্বর বাসা থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করতে যান ওয়াসার প্রকৌশলী মো. মামুন; তিনি জানান, মঙ্গলবার পাঁচটি বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ওই বাড়ির মালিক হাছিনা বেগম বলেন, হালিশহরের পাঁচ শতাধিক মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে চসিকের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলী বলেন, হালিশহরে তিনজনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে আমাদের একজন চিকিৎসকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের দল মঙ্গলবার থেকে কাজ শুরু করেছে। তারা মারা যাওয়া তিনজনের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন। তদন্ত দল বুধবার প্রতিবেদন জমা দিতে পারে। তারপরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

প্রসঙ্গত সম্প্রতি নগরের হালিশহরে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে এইচ ব্লকের বাসিন্দা শাহেদা মিলি, বি ব্লকের বাসিন্দা ও কমার্স কলেজের ছাত্র আশিফুল হাসান রিয়াদ এবং বি ব্লকের বাসিন্দা মাকসুদুর রহমান মারা যান বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।

এদিকে পানিবাহিত রোগ থেকে বাঁচতে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয় জরুরি ভিত্তিতে ১০টি নির্দেশনা দিয়েছে।

নির্দেশনাগুলো হলো- বিশুদ্ধ পানি পান ও ব্যবহার নিশ্চিত করা। পানি ৩০ মিনিট ফুটিয়ে ফিটকিরি ব্যবহার করে অথবা পাঁচ লিটার পানিতে একটি পানি বিশুদ্ধকরণ টেবলেট দিয়ে আধ ঘণ্টা থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহার করা, হোটেল বা দোকানের পানি খাওয়া বন্ধ করা। এ ছাড়া রাস্তায় খোলা জায়গার শরবত, খাবার খাওয়া বন্ধ করা, এলাকায় কারও চোখ হলুদ হলে, ডায়রিয়া হলে বা তিনদিনের বেশি জ্বর থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া। হালিশহর বিডিআর মাঠ থেকে বিশুদ্ধকরণ টেবলেট সংগ্রহ করা।

অন্য নির্দেশনাগুলো হচ্ছে- গর্ভবতী মহিলার চোখ হলুদ হলে স্থানীয় হাসপাতালে যোগাযোগ করা, বাসার ছাদে বা পানির নিচে সংরক্ষিত পানির ট্যাংক চারমাস পরপর ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করা, খাবারের আগে ও মলত্যাগের পরে হাত অন্তত ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে পরিষ্কার করা, হাতের নখ ছোট রাখা, খালি পায়ে বাথরুমে না যাওয়া এবং বাথরুমে আলাদা জুতা ব্যবহার করা, বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণের পাত্রটির নিচের অংশ নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখা, পাতলা পায়খানা হলে ওরস্যালাইন ও ঘরের তৈরি চিনি লবণ মিশ্রিত শরবত বেশি বেশি পান করা এবং আতংকিত না হয়ে বিশুদ্ধ খাবারের পানি খাওয়া ও ব্যবহার করা।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ওয়াসার পানি নিয়ে প্রশ্ন থাকা, বাসার অপরিস্কার পানির টাংকি, ভূ-গর্ভস্থ পানির সমস্যা থাকা, পুকুর-ডোবার পানি পান করা এবং বর্ষায় জলাবদ্ধতা হয়ে সুপেয় পানির সংকট থাকাসহ নানা কারণে তারা বিশুদ্ধ পানি পান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হালিশহরের বাসিন্দারা। তাই ওই এলাকায় পানিবাহিত রোগের সমস্যাটি দেখা দিচ্ছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য হালিশহর এলাকায় পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি বিতরণ করা হচ্ছে বলেও জানান সিভিল সার্জন।

Share Now
February 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
232425262728