বারবার দেশের বাইরে চলে যেতে চাওয়া গণজাগরণমঞ্চের কর্মী দিয়াজ ইরফান চৌধুরীকে নিজ বাসার সিলিংয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়ার পর থেকে তার মৃত্যুর ঘটনাটি সাজানো কিনা সে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তার সহযোদ্ধা, স্বজন, এমনকি পুলিশের মধ্যেও। কী করে পরিপাটি অবস্থায় বিছানার ওপর দুই পা রেখে সিলিং এ ঝুলে আত্মহত্যা করা যায় তা নিয়ে নানা সমালোচনাও শুরু হয়েছে।

তাকে আগেই হত্যা করে ঝুলিয়ে দেওয়ার প্রমাণ স্পষ্ট এমনটা জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তাও। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘ময়নাতদন্ত নিয়ে কোনও কথা না বলার নির্দেশনা থাকায় আমরা এখনই কিছু বলতে পারছি না। তবে তার শরীরের তিন জায়গায় সুস্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর চেয়ে বিস্তারিত বলা এ মুহুর্তে সম্ভব নয়।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তার বাম কাঁধে যে আঘাতের চিহ্ন আছে তা মারাত্মক এবং তার হাতের মুষ্টি যেভাবে বদ্ধ করা ছিল তাতে বোঝা যায় দিয়াজ ভীষণ কষ্ট পেয়ে মারা গেছেন। বাকিটা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এলে জানানো হবে।

দিয়াজ ইরফান (২৭) ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক। দিয়াজ চট্টগ্রাম ছাত্রলীগের সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী পক্ষের নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বাড়ি ফটিকছড়ি উপজেলার পাইন্দংয়ে। তবে তার চেয়ে বড় পরিচয় তিনি গণজাগরণ মঞ্চে সক্রিয় থেকে বেশ কয়েকবার হুমকিও পেয়েছেন।

গত রবিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যলয়ের দুই নম্বর ফটকের বাসায় সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানায়।

ঝুলন্ত এই ছবি বিশ্লেষণ করে অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘এ রকমআত্মহত্যার ঘটনা তারা আগে পর্যবেক্ষণ করেননি। তাই এটি আত্মহত্যা কিনা সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আত্মহত্যার ঘটনাগুলো সবসময়ই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দেয় সাধারণ মানুষকে। তবে কেউ সম উচ্চতার কোনও অবস্থানে দাঁড়িয়ে গলায় ফাঁস দিতে পারবে না। এর জন্য তাকে ঝুলতেই হবে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আসুক। তারপরে বিস্তারিত জানাবো।’

দিয়াজের মরদেহ উদ্ধারের সময় থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, তার (দিয়াজ) শারীরিক যে অবস্থা দেখা গেছে তাতে আত্মহত্যার কোনও প্রভাব চোখে পড়েনি। তাছাড়া পরনে বাইরের পোশাক পরা ছিল। এতে ধারণা করা হচ্ছে, তাকে বাইরে বা ঘরে খুন করে সঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে কেউ। তবে ঘরের দরজা কীভাবে ভেতর থেকে বন্ধ রাখা হলো সে বিষয়েও ধন্দে পড়েছেন তারা।

প্রবাসে বসবাসরত গণজাগরণ মঞ্চের এক কর্মী নিজেকে দিয়াজের ঘনিষ্ঠ দাবি করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও একটা সমস্যার মধ্য দিয়ে সে (দিয়াজ) যাচ্ছিল এটা স্পষ্ট। সে একমাস আগেও আমার কাছে দেশ ছাড়ার কথা বলেছিল।

তিনি আরও দাবি করেন, ‘আমি দেশছাড়ার কয়েকদিন আগেও তার সঙ্গে একত্রে রাত কাটিয়েছি। আমার কাছের পাঁচজন মানুষের একজন ছিল দিয়াজ। গণজাগরণ চট্টগ্রামের খুব গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিল দিয়াজ।

ওই প্রবাসী দাবি করেন, ‘এটা ক্লিয়ার মার্ডার।’

এদিকে, দিয়াজের লাশ উদ্ধারের সময় ঘরের পেছন দিকে একটি মই পাওয়া গেছে। ওই মই বেয়েই আততায়ী ঘরে প্রবেশ করেছে বলে পুলিশের ধারণা।

উল্লেখ্য, এর আগেও একাধিক ব্লগার নিরাপত্তার প্রশ্নে দেশের বাইরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার পর নানাভবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এভাবে একের পর এক কর্মী হারিয়ে শঙ্কা এবং ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন ছাত্রলীগসহ গনজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা।

দিয়াজের ঝুলন্ত ছবিটি সংগ্রহ করে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন তার বন্ধু রাজেশ পল। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঝুলন্ত ছবিটি ফেসবুকে দিতে চাইছিলাম না। কিন্তু আত্মহত্যা আত্মহত্যা চেঁচামেচিতে আর সহ্য করতে পারলাম না। খাটের সঙ্গে পা লাগিয়ে ফাঁসিতে আত্মহত্যা কি কখনোই সম্ভব?’

তিনি জানান, ‘এটাকে ভিন্নভাবে নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে বলেই আমি ছবিটি প্রকাশ করেছি। তবে ছবির সোর্স এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এটা তার জন্যও বিপদজনক হতে পারে।

ওই ছবিতে দেখা যায়, ভীষণ শান্তভাবে দিয়াজ সিলিং এ ঝুলে আছে। তার পা দুটো খাটের ওপর। বাইরে যাওয়ার শার্ট প্যান্ট পরিহিত।

Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031