১৪ মে ১৯৪৮ সন। আধুনিক ইসরাইলের স্থপতি ডেভিড বেন গুরিয়ন ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন। তার এই ঘোষণার ১৬ মিনিট পরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুমান ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেন। এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ককে কূটনীতিকরা special relation বলে অভিহিত করে থাকেন। ইসরাইল পৃথিবীতে একমাত্র রাষ্ট্র যে চারপাশেই শত্রু রাষ্ট্র দ্বারা পরিবেষ্ঠিত। তবু ইসরাইল দাপটের সাথে এই পৃথিবীতে মাস্তানি করতে পারছে-তার প্রধানতম কারণ হচ্ছে বিশ্ব মোড়ল আমেরিকার তার প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন। আরব বিশ্বের কয়েকটি দেশ একত্রে ইসরাইলের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নামে বেশ কয়েকবার। ১৯৪৮, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩-এই তিন বার বড় আকারে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ হয়। তিনবারই ইসরাইলি বাহিনীর হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় মিশর, সিরিয়া, জর্ডান ও ইরাকের সম্মিলিত বাহিনী।

কিন্তু ইসরাইলের কোনো ভয় নাই। এত ছোট একটা দেশ, কিন্তু পৃথিবীর বড় বড় দেশের কাছে সে হাইটেক প্রযুক্তি ও অস্ত্রশস্ত্র রপ্তানি করে। ইহুদিরা নিজেদেরকে স্রষ্টার পছন্দকৃত জনগোষ্ঠী হিসেবে ভাবতে ভালোবাসে। কোরআন শরিফে যে রকম বারবার ইহুদিদেরকে অভিশাপ দেয়া হয়েছে, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে, ইহুদিরাও ঠিক তেমনি মনেপ্রাণে সবসময় মুসলমানদের ধ্বংস কামনা করে।

মুসলমান ও ইহুদি এই দুই ধর্মের লোকজনের সহাবস্থান অসম্ভব এ কারণে যে -দুই সম্প্রদায়ের লোকজন পরস্পর পরস্পরকে তীব্রভাবে ঘৃণা করে। কিন্তু মুসলমান  ও ইহুদিদের মধ্যে একটা বড় ধরনের পার্থক্য আছে, সেটা হলো ইহুদিরা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে বিপুলভাবে অবদান রাখছে। কিন্তু মুসলমানরা জ্ঞান চর্চায় মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। ইহুদিরা তাদের অর্থনৈতিক দাপট ও যুদ্ধ সরঞ্জামের কারণে আরবদের সাথে প্রত্যেকটা যুদ্ধে জয়লাভ করেছে। তবু জাতিসংঘে ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব পাস হয় কালেভদ্রে। কারণ, সেখানে আছে তার পরম বন্ধু আমেরিকা। আমেরিকা বারবার ভেটো দিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কর্তৃক কোনো পদক্ষেপ নেয়াকে বানচাল করে দেয়।তবে বারাক ওবামার শাসনামলে ইসরাইল তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে হোঁচট খেয়েছে বারবার।

২০১২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু যখন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পেন্সিল দিয়ে এঁকে এঁকে বিশ্ববাসীকে রাখাল বালকের গল্প শোনাচ্ছিলেন, আশ্চর্যজনকভাবে মার্কিন প্রশাসন তখনও নেতানিয়াহুর গল্পকে বিশ্বাস করেনি। ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে গেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার জন্য বুশ প্রশাসনকে বারবার চাপ দিয়েছে আমাদের মুসলিম উম্মাহর তথাকথিত নেতা সৌদি আরব। ইরানকে শায়েস্তা করার জন্য গোপনে ইসরাইলের সাথে হাত মেলায় সৌদি আরব। সেই ইসরাইলি-সৌদি জুটিকে উপেক্ষা করে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় আসা যে কতখানি কঠিন তা অনেক মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞই স্বীকার করেন। বারাক ওবামা বলেই পেরেছিলেন এরকম অসাধ্য সাধন করতে। চিরশত্রু ইরানকে শায়েস্তা করতে না পারার কারণে ইসরাইল ওবামা প্রশাসনের উপর বছরখানেক যাবত রুষ্ঠ। আবার ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার একেবারে শেষ মুহূর্তে বারাক ওবামা জাতিসংঘে উত্থাপিত ইসরাইলের বিরুদ্ধে একটি নিন্দা প্রস্তাবের বিপক্ষে ভেটো দেয়া থেকে বিরত থাকেন।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে- ইসরাইলকে অবশ্যই পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম থেকে অবৈধ বসতি স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। অন্যান্য সময় যেখানে আমেরিকা ইসরাইলের পক্ষে জাতিসংঘে সরব হয়, এবার ওবামা প্রশাসন ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নেয়নি। ক্ষুব্ধ ইসরাইল আমেরিকার এ পদক্ষেপকে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করে। নিউজিল্যান্ড এর মতো শান্তিবাদী দেশ ইসরাইলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে নেতানিয়াহু নিউজিল্যান্ডকে এই বলে হুঁশিয়ারি করে দেন যে-এটা ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার শামিল। প্রকৃতপক্ষে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ১৫০টি অবৈধ স্থাপনা প্রতিষ্ঠত হয়।

এই অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে যখন নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, তখন ইসরাইল আশা করেছিলো আমেরিকা যেনো তার প্রস্তাবের বিপক্ষে ভেটো দেয়। কিন্তু আমেরিকা ভোটদানে বিরত থাকে। ইসরাইলি লবি ওবামা প্রশাসনের এই আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান দলের মনোনীত স্পিকার পল রায়ান এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ‘absolutely shameful’| রিপাবলিকান দলের সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জন ম্যাককেইন মন্তব্য করেন-‘এটা ইসরাইলের প্রতি জঘন্য আচরণ’।

ভেটো দানে বিরত থাকা নিয়ে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন দূত সামান্থা পাওয়ার মন্তব্য করেন, ‘১৯৮২ সালে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের আমলের গৃহীত প্রস্তাব অনুসরণ করা হয়েছে। সে সময় একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছিলো-ওয়াশিংটন ইসরাইলের কোনো বাড়তি ভূমি অধিগ্রহণকে কখনোই সমর্থন করবে করবে না।’

নেতানিয়াহু মন্তব্য করেছেন- ইসরাইল নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে এই প্রস্তাবের ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচন করবে। এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ট্রাম্প ইতোমধ্যেই টুইট করেছেন, As to the UN,things will be different after jan.20th|

বোঝাই যাচ্ছে-ওবামা চলে যাচ্ছেন, আর ইসরাইলি লবি আরও নির্বিঘ্নে বিশ্বে মাস্তানি করতে পারবে।

লেখক: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

Share Now
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031