যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলের সঙ্গে উত্তপ্ত ফোনালাপ হয়েছে । সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে অস্ট্রেলিয়া থেকে কিছু শরণার্থী গ্রহণে সম্মত হয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের শরণার্থী-বিরোধী অবস্থানের কথা মাথায় রেখে ফোনালাপে টার্নবুল নিশ্চিত হতে চান ওই চুক্তি ট্রাম্প মেনে চলবেন কিনা। আর এতেই তেঁতে ওঠেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট এমন প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক টুইট বার্তায় ট্রাম্প ওই চুক্তিকে ‘ডাম্ব’ (বোকামিপূর্ণ) বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, এ চুক্তি তিনি খতিয়ে দেখবেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একটি অস্ট্রেলিয়া। এই উত্তপ্ত কথোপকথনের ফলে দুই মিত্রের সম্পর্ক বিরল অবনতির দিকে যাওয়ার হুমকিতে পড়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়, টার্নবুলের সঙ্গে কথোপকথনেই ওবামা আমলের ওই শরণার্থী চুক্তিকে ‘সর্বকালের সবচেয়ে খারাপ চুক্তি’ বলে অভিহিত করেন ট্রাম্প। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, এর মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রে ‘পরবর্তী বোস্টন বোমা হামলাকারী’ পাঠাতে যাচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে খবরে আরো বলা হয়, ফোনালাপটি ১ ঘণ্টা ধরে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টার্নবুল সিরিয়া প্রসঙ্গে কথা বলতে চাইলে ২৫ মিনিটের মাথায় এটি শেষ হয়ে যায়। এবিসি নিউজ অস্ট্রেলিয়ার একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এ সংবাদ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে। ওই দিন টার্নবুলের আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এনরিক পেনা নিয়েতো ও জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। সবশেষে টার্নবুলের সঙ্গে কথা বলার সময় এক পর্যায়ে রেগে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, আজ এখন পর্যন্ত এটা আমার সবচেয়ে খারাপ ফোনালাপ। এমনকি অস্ট্রেলিয়া থেকে ওই শরণার্থীদের নিলে (রাজনৈতিকভাবে) তিনি ‘খালাস হয়ে’ যাবেন বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। ফোনালাপে ট্রাম্প নিজের নির্বাচনী বিজয়, জয়ের ব্যবধান ও নিজের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে মানুষের উপস্থিতি নিয়ে বড়াইও করেন। তবে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন প্রকাশের পর টার্নবুল নিজে সাংবাদিকদের বলেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার ফোনালাপ ছিল স্পষ্ট ও খোলামেলা। কিন্তু এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু তিনি বলেন নি। তার ভাষ্য, ‘আমি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে কথা বলি। আমার কাজ হলো অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থ রক্ষা করা।’ তবে ফোনালাপের একপর্যায়ে ট্রাম্প ওই কলকে ‘সবচেয়ে খারাপ’ বলেছিলেন কিনা, তা নিশ্চিত করতে রাজি হননি টার্নবুল।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের রুক্ষ মেজাজ নজিরবিহীন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তৎকালীন অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রী গফ হুইটল্যামের সময়ে দুই দেশের কিছুটা তিক্ত সম্পর্ক চলাকালেও এমনটা হয়নি। তখন হুইটল্যাম ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে অস্ট্রেলিয়ার সেনা প্রত্যাহার করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার এডিথ কাওয়ান ও কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক হ্যারি ফিলিপস বলেন, ‘ওই সময়ও কথাবার্তা বলা হতো কূটনীতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে।’ এদিকে দুই নেতার এমন তিক্ত কথোপকথনের খবর প্রকাশের পর, ট্রাম্প টুইট করেন, ‘আপনারা বিশ্বাস করতে পারেন? ওবামা প্রশাসন অস্ট্রেলিয়া থেকে হাজার হাজার অবৈধ অভিবাসী নিতে সম্মত হয়েছে। কেন? আমি এই বোকামিপূর্ণ চুক্তিটি খতিয়ে দেখবো।’ তার এ টুইটের পর চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় জন্মায়। এর ফলে ওবামা যে অস্ট্রেলিয়া থেকে সর্বোচ্চ ১২৫০ জন শরণার্থী গ্রহণে সম্মত হয়েছিলেন, তা নিয়ে আরো বিভ্রান্তিও তৈরি হয়। এই শরণার্থীরা পাপুয়া নিউগিনি ও নাউরুতে শরণার্থী শিবিরে রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ট্রেলিয়াও এল সালভাদর, গুয়েতেমালা ও হন্দুরাসের শরণার্থী গ্রহণে সম্মত হয়। তবে অস্ট্রেলিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব শরণার্থী গ্রহণের কথা তাদের অনেকের মূল দেশ মধ্যপ্রাচ্যে। আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক ও ইরানসহ এমন কয়েকটি দেশ ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র শিন স্পাইসার ও অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস বলেছে, ওবামার আমলে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তি মেনে নেবেন ট্রাম্প। এ ছাড়া ট্রাম্পের ওই টুইটের পরও, টার্নবুল বলেছেন, তার বিশ্বাস আমেরিকার প্রশাসন ওই চুক্তি মানবে। টার্নবুল বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) বলছেন যে, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকলে এমন চুক্তি করতেন না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তিনি কি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গিকার রক্ষা করবেন? তিনি ইতিমধ্যে বলেছেন তিনি করবেন।’
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ওয়াশিংটন ও ক্যানভেরার এ চুক্তি না টিকলে, এর মারাত্মক পরিণতি হতে পারে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির নেটওয়ার্ক ‘ফাইভ আইজ গ্রুপে’র সদস্য যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া। এ বছরে মার্কিন মেরিন সেনা মোতায়েন বৃদ্ধির অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মপ্রধান উত্তরাঞ্চলে অতিরিক্ত সামরিক এয়ারক্রাফট পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এর ফলে বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরের কাছাকাছি নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে পারবে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের যে ১০টি মিত্র দেশ সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান লকহিড মার্টিন এফ-৩৫ কিনছে, তার মধ্যে অস্ট্রেলিয়া একটি।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031