কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী জঙ্গিদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তাদের স্ত্রীদের বিয়ের বিষয়ে থাকা রীতির নিন্দা জানিয়েছেন । তিনি বলেন, জঙ্গিরা কেউ স্ত্রী রেখে মারা গেলে সংগঠনের নির্দেশে তাকে অন্য জঙ্গিদের কাছে বিয়ে দেয়া হয়। এটা কেমন রীতি।
জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে এই কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘জঙ্গিদের হিযরতের সময় (পালিয়ে বেড়ানো) কাউকে খুঁজে পাওয়া না গেলে বা মারা গেলে যোগ্যতার বিচার না করে সংগঠনের মধ্য থেকে যে কাউকে বিয়ে করার নির্দেশনা রয়েছে নারী জঙ্গিদের প্রতি। নব্য জেএমবির মধ্যে এমন নেতাও দেখা গেছে, যে জীবিত অবস্থায় ঠিক করে গেছে যে সে মরে গেলে কে তার স্ত্রীকে বিয়ে করবে।’
কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে ২০১৩ সালে দিনাজপুরে ডা. নজরুল খুন হয়। পরে তার স্ত্রী আরেক জঙ্গিনেতাকে বিয়ে করে যা তিনি আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন।’
মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘জঙ্গিবিরোধী অভিযানে মেজর জাহিদুল ইসলামের মৃত্যুর পর (গত বছরের ২ সেপ্টেম্বরে) নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা মাইনুল ইসলাম মুসার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল জাহিদুলের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা। রাজধানীর পূর্ব আশকোনার সূর্যভিলা বাড়িটি ভাড়া নিয়ে মুসা ও শিলা একসাথে থাকতেন।’
গত ডিসেম্বরে আশকোনার এই ‘জঙ্গি আস্তানা’য় পুলিশের অভিযানে আত্মঘাতী নারী শাকিরাও একইভাবে স্বামীর মৃত্যুর পর সন্দেহভাজন আরেক জঙ্গিকে বিয়ে করেছিলেন। এ বিষয়ে মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘জঙ্গি শাকিরা সুইসাইড এটেমপ্টে মারা গেছেন। তারও দুই বিয়ে হয়েছিল। তার প্রথম স্বামীর নাম ইকবাল, তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, এরপর সন্ত্রাসী সুমনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ওই বিয়ের পর থেকেই এই নারী নব্য জেএমবির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।’
কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বুঝতে অক্ষম, মেয়েরা কি হাতবদলের জিনিস? আমার প্রশ্ন, কেউ তো স্বামী মারা গেলে বিয়ে নাও করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই যখন একটা মেয়ে সমাজ সংসার সব ছেড়ে বেরিয়ে আসে, তখন আর তার হাত বদল হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।’
আশকোনায় আত্মঘাতী নারী শাকিরার মৃত্যু নিয়ে আফসোসের কথা বলেন মতিয়া চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘হায়রে মেয়ে, হায়রে বোন, তোমার আগের স্বামী ক্যান্সারে মারা গেছে। পুলিশকে খতম করার জন্য এবং ঠেকানোর জন্য জেহাদীরা তোমাকে এবং তোমার বাচ্চা মেয়েকে পাঠিয়ে দিল!’
গত ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযান নিয়েও কথা বলেন মতিয়া চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আজিমপুর জেএমবি নেতা কাদেরী হত্যার পর যারা আহত হয়েছিল, তারা আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আত্মহত্যা কি ইসলামে জায়েজ? আত্মহত্যা গুনাহ।’
গত ৩১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার কথা উল্লেখ করে মতিয়া বলেন, “হলি আর্টিজানে একজন ইতালিয়ান মহিলা মারা গেছেন এই আক্রমণে। তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। দুদিন পর তার চলে যাওয়ার কথা ছিল। সে বলেছে, ‘আমি প্র্যাগনেন্ট, আমি চলে যাবো’। কিন্তু তাকে ছাড়া হয়নি, তাকে হত্যা করা হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে একে অপরকে মারে, সেটা যুদ্ধের নিয়ম, কিন্তু হলি আর্টিজানে নিরস্ত্র লোকের ওপর হামলা-এটা কোন ধরনের ইসলামের কাজ।”
মতিয়া বলেন, ‘আল্লাহ, তুমি রহমানুর রাহিম, তুমি রহম কর, তোমার সৃষ্টি মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত, তুমি তাদেরকে হানাহানির জীবন থেকে মুক্ত বায়ুর জীবনে নিয়ে আসো। আল্লাহ তুমি রহমত করো।’
‘পোড়া লাশের গন্ধকে বেগম জিয়া আতরের গন্ধ হিসেবে বিবেচনা করেন’
১৫ মিনিটের এই বক্তব্যে বিএনপি ও দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ারও তীব্র সমালোচনা করেন মতিয়া চৌধুরী। বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলনের সময় পেট্রল বোমা হামলায় ব্যাপক প্রাণহানির নিন্দা জানান তিনি।
মতিয়া বলেন, শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সাংবিধানিক গণতন্ত্রের কারণে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিএনপি তা চায় না। তিনি বলেন, ‘এই দলটির সৃষ্টি সামরিক ছায়াতলে আর এর প্রসার হ্যাঁ-না ভোটে জয়ী মেজর জিয়ার শাসনামলে। জিয়ার শাসনামল কেটেছে কারফিউ দিয়ে, স্লোগান ছিল মানি ইজ নো প্রবলেম। এরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, এরা মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করে না। মুক্তিযুদ্ধের শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু, মানবতার শত্রু।’
কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭১ সালে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের এরা বিরোধিতা করে। এরা সন্ত্রাস করে ক্ষমতা দখল করতে চায়। এর উদাহরণ ২০১৪ সালের নির্বাচন পূর্ববর্তী অবস্থা। আমরা জানি ওই নির্বাচন ভণ্ডুল করতে পারলে সাংবিধানিক গণতন্ত্র কৃষ্ণ গহ্বরে নিপতিত হতো।’
মতিয়া বলেন, ‘সেই দানবীয় লক্ষ্য নিয়ে বিএনপি দিনের পর দিন পৈশাচিক কর্মকাণ্ড চালায়। বেগম জিয়া সারাদেশে আগুন নিয়ে খেলতে গিয়ে আগুন সন্ত্রাসী হিসেবে তিনি আখ্যা লাভ করেছেন। বিদ্যুৎ স্টেশনে আগুন দেয়া, রেলপথ উপড়ে ফেলা, লঞ্চ-স্টিমারে আগুন দেয়া, সাধারণ পথযাত্রীদের অগ্নিদগ্ধ করা, স্কুল ঘর পোড়ানো, পেট্রল বোমা মেরে মানুষ হত্যা করা তাদের নেশায় পরিণত হয়েছে। পোড়া লাশের গন্ধকে বেগম জিয়া আতরের গন্ধ হিসেবে বিবেচনা করেন। অমানুষ, পাষণ্ড কাকে বলে, কত প্রকার কী কী-এটা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।’
মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মত জঙ্গি ও জংলী দেশে পরিণত করতে বেগম জিয়া তার পাকিস্তানি দোসরদের পরামর্শেই এই সমস্ত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন। যে দলের জন্ম সেনা ছাউনিতে সেই বিএনপি স্বৈরশাসক আইয়ুবের আদলে পার্টি চালাবে, তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে।’
মতিয়া বলেন, ‘বিএনপি নেত্রী তার স্বপ্নের দেশ পাকিস্তানের মন্ত্র এমনভাবে আত্মস্থ করেছেন যে, তিনি আজ মুক্তিযুদ্ধের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার লক্ষ্য দেশকে অস্থিতিশীল করা। গণতন্ত্রকে ব্যাহত করা। এ সমস্ত কর্মকাণ্ড করতে পারলে তারা বেগম জিয়াকে সন্দেশের কিসমিসের মতো ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। এই হলো তার স্বপ্ন।’
জনগণ খালেদা জিয়ার এই আশা পূরণ হতে দেয়নি মন্তব্য করে কৃষিমন্ত্রী বলে, ‘ক্ষোভ, আক্রোশ আর ক্ষমতার লোভে বেগম জিয়া অন্ধ হতে পারেন, কিন্তু দেশের জনগণ তা সমর্থন করতে পারে না। এই দেশের জনগণের গণতন্ত্রের তৃষ্ণা জয়লাভ করেছে। জনগণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পাহাড়সম ঐক্য হিসেবে এক হয়েছে।’
