বন্দরে প্রবেশের ৪৫ দিনের মধ্যে খালাস করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে আমদানি করা পণ্য জাহাজ থেকে । কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে রহস্যজনকভাবে পড়ে আছে দেড় হাজারের অধিক পণ্যের চালান, এর মধ্যে চার বছর আগে আমদানি করা পণ্যও রয়েছে। এসব পণ্যের মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘ ধরে পণ্যগুলো খালাস না হওয়ায় বন্দর ইয়ার্ডে স্থান সংকট দেখা দিয়েছে।

আইন অনুযায়ী, আমদানিকৃত পণ্য জাহাজ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে নামার ৩০ দিনের মধ্যে খালাস না করলে বন্দর কর্তৃপক্ষ চালানের যাবতীয় নথি কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করবে। পরবর্তীতে আমদানিকারককে পণ্য খালাসের জন্য ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে চিঠি দেবে কাস্টমস । এ সময়ের মধ্যে পণ্য আমদানিকারক খালাস না করলে নিয়ম অনুযায়ী তা নিলামে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বন্দর ইয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা এসব পণ্য নিলামে তোলেনি চট্টগ্রাম কাস্টমস।

পণ্য আমদানির পর চালানের প্রাথমিক তথ্য নথিভুক্ত বা নোটিং করতে হয়। নোটিংয়ের পর এসব চালানের বিপরীতে আগামপত্র (বিল অব এন্ট্রি) দাখিল করেন আমদানিকারক। পরবর্তীতে আগামপত্রে দাখিলকৃত বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণ করে শুল্কায়ন মূল্য ও পণ্যের শুল্ক নির্ধারণ করেন শুল্ক কর্মকর্তারা। এর পর দাখিলকৃত তথ্যের সঙ্গে আমদানিকৃত পণ্যের তথ্যের সামঞ্জস্য পেলে শুল্ক পরিশোধ করে পণ্য ছাড় করে থাকেন আমদানিকারকরা।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, কাস্টমসে নোটিং, আগামপত্র দাখিলের পরও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া ১ হাজার ৬০১টি চালান খালাস নেননি আমদানিকারকরা। ২০১৩ থেকে চলতি বছরে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে এসব পণ্য আমদানি করা হয়, যার মূল্য প্রায় ১ হাজার ৯৬৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। প্রায় সাড়ে তিন হাজার কনটেইনারে রাখা এসব পণ্য খালাস না হওয়ায় ৪২২ কোটি ৬০ লাখ ৮০ হাজার টাকার রাজস্ব পায়নি চট্টগ্রাম কাস্টমস। এর মধ্যে শুল্কায়ন বা আগামপত্র দাখিলের পরও পণ্য ছাড় করিয়ে নেয়নি এমন চালানের সংখ্যা ১ হাজার ১৮৬। এসব চালানের শুল্কায়ন মূল্য ১ হাজার ৩৪৬ কোটি ২৫ লাখ ৪৩ হাজার ৫৪৩ টাকা এবং শুল্ক নির্ধারণ হয় ৩৬৭ কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৮৭৮ টাকা। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য আসার তথ্য নথিভুক্ত হলেও আগামপত্র দাখিল এবং শুল্ক পরিশোধ হয়নি এমন চালানের সংখ্যা ৪১৫। এসব চালানে থাকা পণ্যের মূল্য ২৫১ কোটি ৯৬ লাখ ৬ হাজার ৩৩৩ টাকা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার এএফএম আবদুল্লাহ খান বণিক বার্তাকে বলেন, আমদানির পরও খালাস না হওয়ায় কাস্টম হাউজ বিপুল পরিমাণ শুল্ক থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার কনটেইনার ভর্তি পণ্য বন্দরে পড়ে রয়েছে। এসব কনটেইনারের মধ্যে প্রায় দুই হাজার কনটেইনারের পণ্যের বিস্তারিত তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। খুব শিগগিরই নষ্ট হয়ে যাওয়া পণ্য ধ্বংস করা হবে এবং বাকি পণ্যের নিলাম করা হবে।

নথির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খালাস না নেয়া এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিক পণ্য, গাড়ি এবং গাড়ির যন্ত্রাংশ, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রী, খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য, চামড়া পণ্য, নির্মাণ শিল্পের কাঁচামাল, টাইলস ও সিরামিক পণ্য এবং মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক ধরনের পণ্য। মূলত আমদানির পর দেশে পণ্যের মূল্য কমে যাওয়া, আমদানির সপক্ষে মূল দলিলাদি উপস্থাপন করতে না পারা, অনিয়ম ধরা পড়ার পর আমদানিকারক কর্তৃক জরিমানা দিতে অস্বীকৃতি জানানো কিংবা পণ্য খালাসে ক্লিয়ারেন্স পারমিট (সিপি) না পাওয়ায় আমদানিকারকরা এসব পণ্য খালাস করছেন না বলে মনে করছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।

গত বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯৯ কোটি ৬ লাখ টাকা মূল্যের নয়টি চালানে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে আসে আবু সালেহ অ্যান্ড কোং নামে একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পরবর্তীতে এসব পণ্য আর খালাস করেনি তারা।

২০১৫ সালের ২৭ আগস্ট থেকে একই বছরের ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ১৮টি চালানে ২৫ কোটি ১৪ হাজার ৮৮৫ টাকা মূল্যের প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল আমদানি করে খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড। এসব চালানের বিপরীতে রাজস্ব আসে ৮ কোটি ৪০ লাখ ৪ হাজার টাকা। কিন্তু দেড় বছরেও এসব চালান খালাস করেননি আমদানিকারক।

জানতে চাইলে আমদানিকারকের পক্ষে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান চৌধুরী শিপিং এজেন্সির মালিক জালাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স থাকলে কী পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করা যাবে, তার ব্যবহার প্রাপ্যতা (ইউডি) পত্র ছিল না। পরবর্তীতে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গেলেও সুরাহা না হওয়ায় আমদানিকারক চালান খালাস নেয়নি।

জানা গেছে, দেশের বাজারে পণ্যের দাম কমে আসায় এবং অধিক হারে শুল্ক ও জরিমানা দাবি করায় চালান নিতে লিখিতভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ঢাকার হাজারীবাগ ঠিকানার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এমএফ এমব্রয়ডারি। ২০১৪ সালের ২৪ জুন ১৪ লাখ টাকা মূল্যের একটি চালানের বিপরীতে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে প্রতিষ্ঠানটি। একই কারণে ৪৮ লাখ টাকা মূল্যের আমদানিকৃত প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের প্রতিষ্ঠান এশিয়াটিক টেক্সটাইলও।

খালাস না নেয়া চালানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চালান রয়েছে গাড়ি ও গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশের। ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৫৩টি চালানে ৩৫৫ কোটি টাকার পণ্য খালাস নেননি আমদানিকারকরা। কোটি টাকার উপরে পণ্য আটকে আছে এমন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে— ফুলকলি অটোমোবাইলস, এনএলবি অটোমোবাইলস, এসিটি অটোমোবাইলস, কার সিলেকশন, ক্রিস্টেল কার, ঢাকা ট্রেড, গ্লোরিয়াস মোটর ইন্টারন্যাশনাল,  এইচএনএস অটোমোবাইলস লিমিটেড ও মেসার্স এনএস ট্রেডিংসহ অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান।

নথির তথ্যমতে, ২০১৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত ১০টি চালানে ১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা মূল্যের বিভিন্ন খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য আমদানির করলেও তা ছাড় করিয়ে নেয়নি ‘এ রহমান ট্রেডার্স’। এসব পণ্যের বিপরীতে শুল্ক আসে ৩ কোটি ৯৯ লাখ ৪৯ হাজার ৬৭০ টাকা। একইভাবে গত ২০১৬ বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং সিটি ফিড প্রডাক্ট লিমিটেডের চারটি চালান চট্টগ্রাম বন্দরে এলেও এখন শুল্ক পরিশোধ করে এসব পণ্য খালাস নেয়নি প্রতিষ্ঠান দুটি।

২০১৪ সালের ২৩ জুলাই ব্রাজিল থেকে আপেলের পাঁচটি চালান আমদানি করেন ‘সাথী ফ্রেশ ফ্রুটস লিমিটেড’। ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খালাস নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এ বিষয়ে খালাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ‘সোনারগাঁ অ্যাসোসিয়েট’র স্বত্বাধিকারী বোরহান উদ্দিন সিকদার বলেন, ‘ব্রাজিল থেকে চট্টগ্রামে আসার পথে মিয়ানমারের কাছে ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে জাহাজ দেড় মাস আটকে থাকে। জাহাজীকরণের দুই-আড়াই মাস পর চট্টগ্রাম বন্দরে আসার পর পণ্যের অধিকাংশই নষ্ট হয়ে যায়। তাই এসব পণ্য খালাস নেয়া হয়নি। একই বছরের মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে সাঙ্গু ট্রেডিং আটটি চালানে প্রায় ৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা মূল্যের খাদ্যপণ্য আমদানি করলেও খালাস করেনি।

এছাড়া পণ্য এনে খালাস করেনি এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে— ইউনিলিভার, রূপালি ট্রেডিং করপোরেশন, এপেক্স হোসাইন করপোরেশন, এশিয়ান ট্রেডার্স, ই-গ্লোবাল ট্রেডিং অ্যান্ড সার্ভিস লিমিটেড, এন আর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, হোসেন এন্টারপ্রাইজ, বেস্ট ওয়ান ট্রেডিং করপোরেশন, সান ডেইরি অ্যান্ড এগ্রো প্রডাক্টস লিমিটেড, ইমিক্সিং ট্রেডিং কোম্পানি, এনএস ফ্রুটস ইন্টারন্যাশনাল, আফতাব ফার্ম, ফরচুন এগ্রো এন্টারপ্রাইজসহ পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠান।

চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) মো. জাফর আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, বন্দর ইয়ার্ডে দীর্ঘদিন এসব পণ্যবাহী কনটেইনার পড়ে থাকলেও কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না বন্দর। কনটেইনারে থাকা পণ্য নিলামে বিক্রির ২০ শতাংশ বন্দরকে দেয়া হলেও তা বন্দরের প্রাপ্য ভাড়ার ১ শতাংশও হয় না। এছাড়া বন্দরের ইয়ার্ডে পর্যাপ্ত জায়গা নেই। এসব কনটেইনার যথাসময়ে নিলাম না হওয়ার কারণে বন্দরের জায়গার সংকট আরো তীব্র হচ্ছে। একই অবস্থা চট্টগ্রাম কাস্টমসের ক্ষেত্রেও। যথাসময়ে নিলাম না তোলার কারণে এসব পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীতে যখন তা নিলামে তোলা হয় তখন কাস্টমসও প্রাপ্য শুল্ক পায় না। তাছাড়া কনটেইনারগুলো আটকে থাকায় এসব কনটেইনার মালিকরাও ভাড়া দিতে পারেন না। নিয়ম মেনে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যদি ৪৫ দিন পরই নিলাম প্রক্রিয়া শুরু করে, তাহলে এ ধরনের সমস্যা তৈরি হতো না।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার এএফএম আবদুল্লাহ খান বলেন, ৪৫ দিন পর খালাস না হওয়া চালানের তালিকা করে এসব পণ্য দ্রুত নিলাম প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য একটি কমিটি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানের চালান পড়ে রয়েছে, তাদের নতুন চালান ছাড়করণের সময় পূর্বের খালাস না নেয়া চালানের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হচ্ছে। আশা করি, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা এসব পণ্যের শিগগিরই সুরাহা হবে।

Share Now
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031