বিএসআরএম’র মত প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্রাক-লরির চালকরা সীতাকুণ্ড ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়কের দুই পাশ জুড়ে বেপোরোয়া হয়ে উঠেছে । এসব চালকদের হাতে কেউ নিহত হলে সেই খবর ডে ইভেন্ট হিসেবে ছাপা হলেও এর পিছনে কারা দায়ী তাদের নিয়ে বিস্তারিত খবর ছাপা হয় না। দু একটি পত্রিকায় দোষিদের দায়ি করে খবর চোখে পড়লেও মহাসড়ক চারলেইনে পরিণত হওয়ার পর মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে খবর ছাপানো যেন আরও কমে গেছে।
ঘাতক লরির ধাক্কায় নিহত স্কুলছাত্র জুনায়েদের নিথর দেহ
সম্প্রতি দেখা গেছেক বিএসআরএম এর মত বড় বড় প্রতিষ্ঠান যদি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পিছনে দায়ী হয় সেই খবর ছাপাতেই যেন অদৃশ্য অনিহা প্রকাশ করে মূলধারার সংবাদমাধ্যম গুলো। যেমনটা বিএসআরএম স্টিল মিল্স কোম্পানির রড বহণের কাজে নিয়োজিত একটি লরির ধাক্কায় স্কুল ছাত্র জুনায়েদের মৃত্যু নিয়েও খবর ছাপানোর বিষয়ে অনেক পত্রিকায় কৌশল অবলম্বন করতে দেখা গেছে। শুধুমাত্র ডে ইভেন্ট হিসেবেই ছাঁপানো হয়েছে জুনায়েদের মৃত্যুর খবরটি।
শান্ত সীতাকু-ের অশান্ত যত ঘটনা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। সড়কটিতে বেশিরভাগ সড়কদুর্ঘটনার জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উভয় পাশে গড়ে তোলা শিল্প কারখানার পণ্যবাহী গাড়ি পার্কিং করে রাখার জন্যই দায়ী।
জুনায়েদের সপ্তম শ্রেণির ষান্মাষিক পরীক্ষার প্রবেশপত্র। যা এখন শুধুই স্মৃতির।
শনিবার(৮ জুলাই) আনুমানিক সাড়ে ১২ টারদিকে পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফিরছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র জুনায়েদ। উপজেলার বাঁশবাড়িয়া উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের (রং সাইড) উল্টো দিক থেকে আসা বিএসআরএম স্টিল মিল্স কোং এর একটি লরি তাকে চাপা দেয়। এতে মাথা ও একটি হাত থেতলে গিয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় স্কুলটির ছাত্ররা ক্ষিপ্ত হয়ে মহাসড়কে ব্যারিকেড দেয় এবং ঘাতক লরিটিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এসময় মহাসড়কে বিক্ষোভ শুরু করলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে লরি চালককে আটক করে বিদ্যালয়ে এনে বেঁধে রাখা হয়।
খবর পেয়ে সীতাকু- থানার থানার এস.আই মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
এস আই শাহজাহান হয়তো মেধাবী পুলিশ অফিসার হওয়ায় পরিস্থিতি মুহুর্তে শান্ত করেন কিন্তু পুনরায় যদি এই জুনায়েদের মত আবার কোন স্কুল ছাত্রের প্রাণ যায় তাহলে এর বিপরীতটিও হতে পারে। শান্ত সীতাকুণ্ড অশান্ত হয়ে উঠতে পারে।
স্কুলছাত্র জুনায়েদ
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত স্কুল ছাত্রের একাধিক পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সীতাকু-ে যতগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার বেশিরভাগই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। সম্প্রতি চাল লেন হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের ঝুঁিক যেন আরও বেড়ে গেছে। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে যথেষ্ট সচেতনা অবলম্বন করা হয় মহাসড়ক পারাপারের বিষয়ে।
জুনায়েদের মৃত্যুর খবর শুনে স্বজনদের আহাজারী
বাশঁবাড়িয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত স্কুল ছাত্র মহাসড়ক পার ঠিকই হয়েছিল। কিন্তু কোনভাবেই বুঝার উপায় ছিল না উল্টো পথে বিএসআরএম এর লরি তাকে ধাক্কা দিবে। হয়তো ফুট ওভার ব্রিজ ছিল না । তার পরও সচেতনতায় রাস্তা পার হয়েও শেষ রক্ষা হয়নি শিশু জুনায়েদের। এরপর বাঁশবাড়িয়া স্কুলের সামনে হয়তো ফুট ওভার বিজ্র হবে,কচিকাচা ছেলে- মেয়েরা ফুট ওভার ব্রিজ দিয়েই রাস্তা পার হবে কিন্তু উল্টো পথে গাড়ি চালানো কি বন্ধ হবে?
স্কুলছাত্র জুনায়েদের মৃত্যুর খবররে তার সহপাঠিরা বিক্ষোভ ও রোডব্যারিকেড দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রভাবশালী এসব শিল্পকারখানার মালিকরা টাকার বিনিময়ে কিনতে পারেন প্রাণ। দেনদরবার করে ছাড়িয়ে নেওয়া হবে স্কুল ছাত্রের মৃত্যুর অভিযোগে আটককৃত চালককে। কিন্তু বন্ধ হবে না ঘাতক এসব ট্রাক-লরির চালকদের আস্ফালন।
সমুদ্রের পাড়ে বেড়াতে গেলে বন্ধুদের সাথে জুনায়েদ।
প্রথম বারের মত সীতাকুণ্ড উপজেলায় কোন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এলাকাবাসীর জন্য মুখ খুলেছে। সড়ক দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথে ছুটে গিয়েছে বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বাঁশবাড়িয়া স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মো. শওকত আলী জাহাঙ্গীর। সিটিজিনিউজের এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এই এলাকায় বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের গাড়ি গুলি সহজে কারখানায় প্রবেশ করতে বেশিরভাগ সময় দেখা যায় সঠিক পথে না গিয়ে উল্টো পথে চলে। এতে বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। বিএসআরএম এর গাড়িটি যদি উল্টো দিক থেকে না আসতো তাহলে এ শিশুর করুণ মৃত্যু হতো না। তিনি এসব গাড়ি চালকদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবি করেন।’
চেয়ারম্যানের এই বক্তব্যই হতে পারে সীতাকুণ্ড বাসীর বড় ধরনের হাতিয়ার। এমনটাই আশা করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই বক্তব্য বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই সীতাকু-বাসী পেতে পারে আগামী দিনে মহাসড়কে চলাচল করার নিরাপত্তার দলীল।
সিটিজিনিউজের অনুসন্ধানে দেখা গেছে সিটি গেট থেকে সীতাকু- হাইওয়ে সড়কটি মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে রাস্তার পাশে গড়ে উঠা মিল ফ্যাক্টরির মালামাল বহন করা কাভার্ড ভ্যান, লরি উল্টা পথে (রং সাইডে) চলা এবং রাস্তার পাশে যেন তেন ভাবে পার্কিং করে রাস্তা দখল করে যানজট সৃষ্টি করে রেখেছে, এসব দেখার কেউ নেই, নাই জনপ্রতিনিধি, নাই আইনশৃংখলা বাহিনী, প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। অন্যদিকে সেইফ লাইন, নাভানা, মেট্রো সার্ভিস, ৭ নং, ০৮ নং বাসগুলোতে অপরিপক্ক ড্রাইভারের বেপরোয়া গতিতে ড্রাইভিং দূর্ঘটনা বৃদ্ধি করছে। সন্ধ্যার পর সব গাড়ি দানবে পরিণত হয়, কার আগে কে যাবে এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিন্তু এসবের শেষ কবে? আর কত দিন গুণতে হবে সীতাকুণ্ডবাসীকে।
