বাস- টেম্পো আসতেই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। মোড়ে মোড়ে যাত্রীদের জটলা। দুইএকজন তাতে উঠতে পারলেও বাকিরা ব্যর্থ হয়ে পরবর্তী গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন। প্রতিটি গণপরিবহন যাত্রীতে ঠাসা। দরজার সাথেও ঝুলছেন অনেকে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়েও গণপরিবহনে উঠতে না পেরে অনেকে হেঁটেই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। গতকাল (বুধবার) বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাস্তায় যাত্রীদের চরম দুর্ভোগের এমন দৃশ্য দেখা গেছে। এমনিতেই নগরীতে গণপরিবহনের তীব্র সংকট। তার উপর আকস্মিক পুলিশের অভিযানে রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা আরও কমে গেছে। অভিযানে কিছু যানবাহন আটক হয়েছে, বিপুল সংখ্যক যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এতে চালকদের অনেকে রাস্তায় বাস, মিনিবাস নামাতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে যানবাহন সংকটে নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আবার সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে সিএনজি অটোরিকশা আর রিকশা চালকরা গলা কাটা ভাড়া আদায় করছে। ট্রাফিক পুলিশের অভিযান চলমান একটি বিষয়। অভিযানকে ভয় পেয়ে রাস্তায় গাড়ি না নামানোর কারণ কী? তবে কি অধিকাংশ গাড়িই ত্রুটিপূর্ণ; ঝুঁকি নিয়ে দিনের পর দিন চলছে রাস্তায়? এ বিষয়ে সিএমপির ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পরিবহন মালিক শ্রমিক নেতৃবৃন্দ নিজেদের যুক্তি তুলে ধরেন আজাদীর কাছে। তবে প্রত্যেকেই স্বীকার করেন, অভিযানের ভয়ে রাস্তায় যানবাহন কমে যাওয়ায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বরাবরের মতো নগরবাসীকেই।

অভিযোগ রয়েছে প্রতিবার অভিযান শুরু হলেই মালিকরা কৌশলে রাস্তায় গাড়ি কমিয়ে দেন। এর মাধ্যমে মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি করে তাঁরা সরকারের ওপর চাপ তৈরি করেন, এতে কাজও হয়। কিছুদিন পর অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। অভিযান শুরু হলে পরিবহন মালিকরা সরকারের কাছে সময়ের আবেদন করেন। তাঁরা নতুন গাড়ি নামানোর প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর বছরের পর বছর পার হয়; কিন্তু কথা রাখেন না মালিকরা। ফলে আবারও রাজপথ দাপিয়ে বেড়াতে শুরু করে সেই লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ ও বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ) কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোয়ারা দিয়েই ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো হয়। ভুয়া চালকরাও একই কায়দা ব্যবহার করে।

সকালে এবং বিকালে বিভিন্ন রুটের আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ বাস বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের পরিবহন করতে রির্জাভ ভাড়ায় চলে যাচ্ছে। এর ফলে প্রায় প্রতিটি রুটে যানবাহনের তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। তার উপর অভিযান জোরদার হওয়ায় সংকট আরও বেড়ে গেছে। ট্রাফিক বিভাগের অভিযানে বিশেষ করে অফিস শুরু আর ছুটির সময় কর্মজীবী মানুষকে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ঘর থেকে বের হয়ে যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছা আবার কাজ শেষে সময়মতো বাড়ি ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিকল্প যানবাহনে গন্তব্যে পৌঁছতে গিয়ে স্বল্প ও সীমিত আয়ের কর্মজীবীদের পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। অভিযানের খবরে গতকাল বুধবার রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যা কমে যায়। অভিযান চলবে আগামী ২২ জুলাই পর্যন্ত। আর এই সুযোগে অটোরিকশা ও রিকশা চালকেরা গলাকাটা হারে ভাড়া আদায় করছে। স্বল্প ও সীমিত আয়ের কর্মজীবী এবং শ্রমজীবী মানুষের আয়ের বিরাট অংশ চলে যাচ্ছে যাতায়াত খাতে।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগরীর বন্দরনগরী ও বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রামে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় ইপিজেড। এই চট্টগ্রাম ইপিজেডে দুই লাখের বেশি শ্রমিক কর্মরত। কর্ণফুলী ইপিজেডে আছে প্রায় পৌনে এক লাখ শ্রমিক। প্রায় চার শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানার পাশাপাশি নগরীর পতেঙ্গা, সাগরিকা, ষোলশহর ও কালুরঘাট শিল্প এলাকায় রয়েছে ছোটবড় অনেক শিল্প কারখানা। এসব শ্রমিকদের বেশির ভাগই গণপরিবহনে যাতায়াত করেন। সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবীদের বিরাট অংশও নির্ভরশীল গণপরিবহনের উপর। আবার সরকারিবেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, মাদরাসার শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নানা কাজে নগরীতে আসা হাজার মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম গণপরিবহন। লোকসংখ্যার তুলনায় গণপরিবহনের সংখ্যা একেবারেই কম।

সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (যানবাহন) দেবদাস ভট্টাচার্য আজাদীকে জানান, চট্টগ্রাম নগরীতে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই এ অভিযান চলছে। এটা প্রতি মাসেই হয়ে থাকে। তবে এবার একটু কড়াকড়ি হচ্ছে বেশি। তিনি বলেন, আইন অমান্য করা, গাড়ির যাবতীয় ডকুমেন্ট হালনাগাদ না করা, ট্রাফিক আইন না মানা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এভাবে তো চলতে পারে না। একটা সিস্টেমে আসতেই হবে। আমরা সে চেষ্টাই করছি। আর রাস্তায় গাড়ি কমে যাওয়ার কারণটাতো মালিকরাই ভালো বলতে পারবেন। আমার গাড়ির কাগজপত্র সব যদি ঠিক থাকে, ফিটনেস যদি থাকে তবে মামলা বা টো করার ভয় থাকার কথা নয়। তিনি বলেন, অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এতে করে রাস্তায় কিছু গণপরিবহন নামছে না আর তাতে মানুষের দুর্ভোগও কিছুটা বেড়েছে। তবে অবৈধ কোন যানবাহনকে রাস্তায় চলতে দেয়া হবে না। কোন অনিয়ম বিশৃঙ্খলাকে প্রশ্রয় দেয়ার সুযোগ নেই।

চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের অতিরিক্ত মহাসচিব আজাদীকে বলেন, নগরীতে গত মঙ্গলবার থেকে হঠাৎ করেই গণপরিবহনের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে ট্রাফিক পুলিশ। গাড়ির মালিকদের কাছে আমরাও উত্তর দিতে পারছি না। রুট পারমিট না থাকলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে আপনি মামলা দেন। কিন্তু গাড়ি টো করে তিন দিনের আগে ছাড়বেন নাএটা কেমন কথা? আর যেকোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে মালিক শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সাথে আগে আলোচনা করা হতো। এখন তাও করা হয় নি। আমরা আগামী শনিবার মালিক শ্রমিক নেতৃবৃন্দ বসে এ ব্যাপারে করণীয় নির্ধারণ করে প্রশাসনকে জানাবো। যদি তা মানা না হয় তবে পরবর্তীতে করণীয় কী তা ভাবা যাবে।

চট্টগ্রাম সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মো. মুছা আজাদীকে বলেন, জনগণের এ দুর্ভোগতো প্রশাসনের হঠাৎ সিদ্ধান্তের কারণে। আমি যতদূর জানি, ট্রাফিক সংক্রান্ত কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে মালিক শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ আলোচনা করা হতো। তারপর সব দিক বিবেচনা করে যেটা ভালো মনে হতো সেটিই করা হতো। এবারই প্রথম দেখলাম, বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ করে নিউমার্কেট মোড়ে ডকুমেন্টস হালনাগাদ না থাকায় টো করে দেয়া হচ্ছে। কাগজপত্রের মেয়াদোত্তীর্ণ হলে মোটর যান আইনে মামলা দেন। কিন্তু মামলাও দিলেন না, টো করলেন যে তার স্লিপও দিলেন না, নিয়ে গিয়ে আটকে রাখলেন, মালিকের থেকে মুচলেকা নিয়ে দুই তিন দিন বাদে ছেড়ে দিলেন। এটা কতোটা আইন সম্পর্কিত সে ব্যাপারে আমার প্রশ্ন আছে। তিনি আরো বলেন, আমরা সবসময় বলেছি যে, নগরীতে যানবাহন চলাচলে একটা শৃঙ্খলা আনা প্রয়োজন। হঠাৎ করেই এ অভিযান শুরু হওয়ায় মালিকরা রাস্তায় গাড়ি নামাতে চাইছেন না বলেই আমি মনে করি। তবে এ ব্যাপারে আমরা শ্রমিক সংগঠন অবগত নই। তিনি বলেন, শৃঙ্খলা আনতে হলে সবাইকে নিয়ে বসে কর্মপন্থা নির্ধারণ করে তার সুষ্ঠু প্রয়োগ ঘটাতে হবে। সেটা ছাড়া এভাবে হুটহাট অভিযান চালিয়ে কিছুই হবে না। অতীতেওতো এমন অভিযান হয়েছে। কী লাভ হয়েছে? আপনি রাস্তার মোড়ে গাড়ি দাঁড়ানোর অপরাধে মামলা দিচ্ছেন, জরিমানা করছেন। কিন্তু আপনি কি নির্দিষ্ট পার্কিং স্পট করে দিয়েছেন? এসব কারণে সাধারণ মানুষই দুর্ভোগে পড়ছে।

 

Share Now
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031