একের পর এক দর্শকের অভাবে চট্টগ্রামের সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । ৯০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের ৭৬৭টি সিনেমা হলের মধ্যে চট্টগ্রামে ৫০টি সিনেমা হল ছিল। বর্তমানে সেখানে অবশিষ্ট আছে মাত্র চারটি সিনেমা হল।

সেগুলো হচ্ছে, আলমাস, দিনার, সিনেমা প্যালেস ও পূরবী। এ চারটি সিনেমা হলও চলছে খুুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। হলমুখী দর্শকের অভাবে যে কোন সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে সিনেমা হলগুলো। চারটি সিনেমা হলের মালিক ও ম্যানেজারদের সাথে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।

হল মালিক ও ম্যানেজাররা জানান, মানসম্মত চলচ্চিত্রের অভাবে সিনেমা হলগুলো চলছে ধুঁকে ধুঁকে। নতুন শিল্পী তৈরি না হওয়া, নকল গল্প ও গান, একঘেঁয়েমি কাহিনী, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের অভাব ইত্যাদি কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সিনেমা ব্যবসা। আরেকটি কারণ হচ্ছে পাইরেসি। পাইরেসির কারণে মুক্তিপ্রাপ্ত নতুন সিনেমা মোবাইল ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। এর সাথে সিনেমা হলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, স্যানিটেশন সমস্যা, ভাঙা সিট, অন্ধকার পরিবেশ ইত্যাদির কারণে দর্শক সিনেমা হলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

এক সময় নব্বই দশকের দিকে টিভিতে সপ্তাহে একটি চলচ্চিত্র প্রচার হতো। কিন্তু নব্বই দশকের শেষ দিকে অনেকগুলো টিভি চ্যানেল আতœপ্রকাশ করে। এসব টিভি চ্যানেল চালু হওয়ার পর প্রতিদিনই চলচ্চিত্র প্রচার করতে থাকে। মূলত এসময় থেকে সিনেমা ব্যবসায় ধস নামতে শুরু করে। তাছাড়া এমনও হয়েছে একটি হিন্দী ছবি দুই জন পরিচালক দুবার নির্মাণ করেছেন। যেমন-হিন্দী সুপার হিট ছবি ইন্ডিয়ানকে দুইজন পরিচালক নকল করেছেন। একজন নায়ক করেছে রিয়াজকে এবং অপরজন নায়ক করেছেন মান্নাকে। নির্মাণের দিকে দিয়ে তারা হিন্দী ছবির ধারে কাছেও যেতে পারেনি। এভাবে বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচালকরা দর্শকদের অত্যাচার করেছেন বারবার। ফলে কেন মানুষ সিনেমা হলে চলচ্চিত্র দেখতে যাবে? আর এভাবেই ধ্বংস হচ্ছে সিনেমা ব্যবসা।

সূত্র জানায়, দর্শক ও ভালো চলচ্চিত্রের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে কাজীর দেউরির ঝুমুর, গুলজার মোড়ের গুলজার সিনেমা হল, জেলখানা রোডের রঙ্গম, লালদীঘির খুরশিদ মহল, পাহাড়তলীর আকাশ ও অলঙ্কার, ঝাউতলার নুর জাহান, আতুরার ডিপুর সঙ্গীত, কালুরঘাটের সিনেমা কর্ণফুলী, অক্সিজেনের চাঁদনি, ২ নম্বর গেটের রূপালী, হালিশহরের স্যারিসন, টাইগার পাসের নেভী সিনেমা হল, আগ্রাবাদের সাগরিকা, সানাই, বনানী, উপহার, রিদম, স্টেশন রোডের উজালা, নূপুর, মেলোডি, জলসা, সদরঘাটের লায়ন, নিউ মার্কেটের জলসা, পতেঙ্গার শাহীন ও নেভী সিনেমা হল। শহরের বাইরে বাড়বকুন্ডের পরাগ, নাজির হাটের ঝংকার, ভাটিয়ারীর বিএমএ সিনেমা হল, পটিয়ার ছন্দা ও সবুজ সিনেমা হল।

লালদীঘির খুরশিদ মহল সিনেমা হল ভেঙে তৈরি করা হয়েছে মহল মার্কেট, স্টেশন রোডের উজালা সিনেমা হলে ভেঙে করা হয়েছে এশিয়ান এসআর হোটেল, আগ্রাবাদের বনানী সিনেমা হল ভেঙে করা হয়েছে বনানী কমপ্লেক্স, নিউমার্কেটের জলসা ভেঙে করা হয়েছে জলসা মার্কেট। এছাড়া লায়ন, নূপুর ও রঙ্গম সিনেমা হল ভেঙেও করা হয়েছে বহুতল বিপণী বিতান। চালু থাকা চারটি হলেরও মুমূর্ষু অবস্থা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চারটি হলে দর্শকের দেখা নেই। হলের ভিতর পর্যাপ্ত সিট থাকলেও তা ভাঙাচোরা, ফোম উঠে গেছে। নেই দর্শকদের জন্য স্বাস্থ্যকর টয়লেটের ব্যবস্থা। ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্যতম বিনোদন মাধ্যাম সিনেমা হল শূন্য হচ্ছে চট্টগ্রাম পূরবী হলের ম্যানেজার টিকেট বিক্রি করছেন। দিনারে চলছে পুরানো সিনেমা। দর্শক ১৫-২০ জন।

জানা গেছে, যেকোন সময় ভেঙে ফেলা হতে পারো আলমাস ও দিনার সিনেমা হল। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নির্দেশনা দেওয়া আছে, এখানে মাল্টি স্টরিড বিল্ডিং করা হবে। বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু হবে। তবে গত বছরের শেষ দিকে অমিতাভ রেজা পরিচালিত আয়নাবাজি চলচ্চিত্র দেখতে প্রচুর দর্শকের ভিড় হওয়ায় সিনেমা হলের ব্যাবসায়ের কথা আলোচনায় এসেছে। তবে সিনেমা হলের পরিবেশের উন্নতি না হওয়ায় দর্শকরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টর অধীনে পরিচালিত হয় নগরীর চট্টেশ্বরী রোডের আলমাস ও দিনার সিনেমা হল। এ দুটি হলের তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত আছে আল হেলাল অ্যান্ড কো¤পানী নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির ব্যাবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল কাদের বলেন, সিনেমা হল ব্যবসায় আর আলোর মুখ দেখবে না। যারা চলচ্চিত্র তৈরি করে তাদেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা উচিত। চলচ্চিত্র কেন হচ্ছে না। বছরে ৫২ সপ্তাহের ৫২টি ছবি লাগে। কিন্তু ৫২টি ছবি আমরা পাচ্ছি না।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, একটি এসি বসাতে দেড় কোটি টাকা প্রয়োজন। অত্যাধুনিক চেয়ারের জন্য প্রচুর বাজেটের দরকার। সে রকম আয় তো হচ্ছে না। যে ব্যাবসায়ে আয় বেশি, সিনেমা মালিকরা সে ব্যাবসায়ের দিকে ঝুঁকছে। সিনেমা হলের ব্যবসায় ভালো অবস্থায় নেই। যে হলগুলো আছে অচিরেই সেগুলো থাকবে না।

তিনি বলেন, আগে বিনোদনের তেমন ব্যবস্থা ছিল না। এতো স্যাটেলাইট চ্যানেল ছিল না। এখন নতুন নতুন হিন্দী ছবি স্যাটেলাইটে দেখাচ্ছে। ফলে কেন মানুষ হলে এসে সিনেমা দেখবে?

আয়নাবাজির প্রসঙ্গ তুলতে তিনি বলেন, আয়নাবাজি দেখতে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির দর্শক তথা ছাত্র-ছাত্রীরা আসছে। এ ছবির প্রচার হয়েছে বেশি। ফলে কিছু দর্শক আমরা পেয়েছি।

আলমাস ও দিনার হল প্রসঙ্গে আব্দুল কাদের বলেন, এ দুটি হল ভাঙার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। বরাদ্দ পেলে এ দুটি হল যে কোন সময় ভেঙে বহুতল বিশিষ্ট ভবন করা হবে।

তিনি বলেন, এক সময় সারা বাংলাদেশে ১২০০টির মতো সিনেমা হল ছিল। সেখানে বর্তমানে ২০০টির মতো সিনেমা হল আছে। সিনেমা হলের দুর্দশার কারণে নিম্মবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মানুষ বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কেউ কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না। বেশিরভাগ সিনেমা হল ভেঙে তৈরি করা হয়েছে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন ও মার্কেট। তৈরিকৃত ভবনে সিনেমা প্রদর্শনের কথা বললে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে সিনেমা হল কমে যাওয়ার ফলাফল কি জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের পরিচালক শৈবাল চৌধুরী বলেন, এ ব্যাপারে পত্রপত্রিকায় অনেক কথা বলেছি। আর বলতে ইচ্ছে করছে না। নিম্মবিত্ত ও মধ্যবিত্তের লোকজনের অন্যতম বিনোদন মাধ্যম হলো সিনেমা হল। সিনেমা হল কমে গেলে তারা যাবে কোথায়? এর ফলে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বেড়ে যাবে। নিম্মবিত্ত ও মধ্যবিত্তের লোকজন খারাপ পথে চলে যাবে। গাঁজা খাবে, মারামারি করবে, খারাপ জায়গায় যাবে।

সিনেমা হলের অতীত অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে করণীয় কি? এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ভালো হল না থাকলে ভালো সিনেমা হবে না। আবার ভালো সিনেমা না হলে হল ভালো হবে না। একটি সিনেমা হলে ১৫০০-২০০০ আসনের দরকার নেই। প্রত্যেক জেলা শহরে একটি করে সিনেপ্লেক্স তৈরি করতে হবে। একটি সিনেপ্লেক্সের ভিতর চারটি হল থাকবে। ঢাকা শহরে চারটি সিনেপ্লেক্স ও একুশটি সিনেমা হল আছে। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। মহিলাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকতে হবে। চট্টগ্রাম শহরে অনেক হাই-ফাই মার্কেট আছে। কোন সিনেপ্লেক্স নেই। এটা অত্যন্ত লজ্জার কথা। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে দায়িত্ব নিতে হবে।

সিনেমা হলের বর্তমান অবস্থা কি জানতে চাইলে পূরবী সিনেমা হলের প্রাক্তন ম্যানেজার মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, দর্শক নাই বললেই চলে। টিভি চ্যানেল, মোবাইল, ইন্টারনেটের কারণে সিনেমা ব্যবসায় ধ্বংস হয়ে গেছে। ছবি রিলিজ হওয়ার আগে পাইরেসির মাধ্যমে তা মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। দশ টাকা দিয়ে মোবাইলে ছবি দেখা যাচ্ছে। ফলে কেন বেশি টাকা খরচ করে সিনেমা হলে ছবি দেখতে আসবে। পাইরেসি রোধ করা যাচ্ছে না। ১০০০ আসনের মধ্যে প্রতি শোতে টিকেট বিক্রি হয় ২০-৩০টি। রাতের শো চলেই না। চলচ্চিত্র তৈরিতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে।

সিনেমা হল এবং দর্শক নিয়ে সিনেমা প্যালেস এবং ঝুমুর সিনেমা হলের মালিক, পরিচালক ও চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, ৪০ বছর ধরে আছি। সিনেমা প্যালেসকে এখনও কোনরকমে টিকিয়ে রেখেছি। ঐতিহ্য ধরে রাখতে চেষ্টা করছি। নতুন সিনেমা আসছে না। ভালো শিল্পী নেই। ড্র্ইং রুমে বসে যদি টিভিতে ভালো সিনেমা দেখা যায়, তাহলে সিনেমা হলে আসার দরকার কি? বর্তমানে খুবই খারাপ অবস্থা যাচ্ছে। ৮০০ আসনের বিপরীতে এক শোতে ২০টি টিকেটই বিক্রি হয় না। নাইট শো তো বন্ধই থাকে। প্রতিমাসে ক্ষতি নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। দোকানের ভাড়া দিয়ে কোন রকমে চালিয়ে নিচ্ছি। সিনেমা হলের ব্যবসায় টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। সিনেমা ব্যবসায় ট্যাক্স মওকুফ করলে আমরা কোন রকমে চালিয়ে নিতে পারতাম। নতুন আর্টিস্ট তৈরি করতে হবে। পোষাতে পারছি না বলে ঝুমুর সিনেমা হল বন্ধ করে দিয়েছি। খালি পড়ে আছে। ভারতীয় নতুন ছবি আমদানি করে আপাতত সিনেমা ব্যবসাকে রক্ষা করা যেতে পারে।

একই প্রশ্নের উত্তরে দিনার সিনেমা হলের ম্যানেজার সাবের আহমেদ বললেন একই কথা। দর্শক হয় না বললেই চলে। ৫ শতাংশ টিকেটই বিক্রি হয় না। ২০-৩০ বছর ধরে আছি। প্রতিশোতে ২০-৩০টার বেশি টিকেট বিক্রি হয় না। রাতের শো তো হয়ই না। ভালো ছবির কোন বিকল্প নেই। ভালো চলচ্চিত্র আসলে অটোমেটিক্যালি দর্শক আসবে।

এরকম পরিস্থিতিতে দেশে সিনেমা ব্যবসায়কে বাঁচাতে হলে সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ, আধুনিক সিনেমা হল তথা সিনেপ্লেক্স নির্মাণ, চলচ্চিত্র আন্দোলন বেগবান করা, পুরাতন ও নতুন শিল্পীদের করণীয় নির্ধারণ ও উন্নত পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

Share Now
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031