ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে নির্মাণাধীন ফিলিং স্টেশনের ছাদ ধসে নিহত ৪ শ্রমিকের পরিবারকে শোক না কাটতেই আপসের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে । এ ঘটনায় সায়েরা নামের ওই ফিলিং স্টেশনটির মালিক জালাল মিয়া (৫০) ও তার ছেলে অপু মিয়া (২৪)কে আসামি করে ৩০শে আগস্ট আশুগঞ্জ থানায় মামলা হয়। তবে এ দু’-জনের কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। মামলা দায়ের করার দু’-দিন পরই আপসের প্রস্তাব নিয়ে যাত্রাপুর গ্রামে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হন চর-চারতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান যুবলীগ নেতা জিয়া উদ্দিন খন্দকার ও ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি বাবুল সরকার ও জহির নামের একজনসহ ৪ জন। তারা বেশি দেরি না করে তাড়াতাড়ি ঘটনার মীমাংসায় আসতে বলেন ৪ হত্যা মামলার বাদী নিহত নাজমুলের ভাই জিয়াউদ্দিনকে। এদিকে এ ঘটনার পর ফিলিং স্টেশনটির মালিক ও জেলা সার সমিতির সভাপতি জালাল মিয়ার অপকর্ম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে আশুগঞ্জে। মামলার বাদী জিয়া উদ্দিনসহ যাত্রাপুর গ্রামের অনেকে জানান, আশুগঞ্জ বাজারে জালালের ৫ তলা ভবন নির্মাণের সময়ও যাত্রাপুর গ্রামের এক নির্মাণ শ্রমিক ইসহাক মিয়া (২৫) মারা যান। আহত হয় জীবন ও হিরণ নামের আরো দু’-জন। ৮/১০ বছর আগের ঘটনা এটি। তখন ২০/৪০ হাজার টাকা দিয়ে ইসহাকের মৃত্যুর ঘটনা মিটিয়ে ফেলেন জালাল। ২৮শে আগস্ট দুপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সংলগ্ন বাহাদুরপুর এলাকায় সায়েরা ফিলিং স্টেশনের সামনের ছাউনির ছাদ ঢালাইয়ের পরপরই তা ধসে পড়ে। এর নিচে চাপা পড়ে মারা যায় ৪ নির্মাণ শ্রমিক। তারা হলেন সরাইলের তেরাকান্দার মো. মিজান মিয়া (৩৫), আশুগঞ্জের যাত্রাপুরের মো. নাজমুল (২০) ও দুলাল মিয়া (৫০), সদর উপজেলার সাদেকপুরের আবু সায়েদ (৪০)। আবু সায়েদ যাত্রাপুরেই ভাড়া থাকতো। আহতরাও এই গ্রামেরই। সেজন্যে এই যাত্রাপুরে রয়েছে শোকের আবহ। আহতদের একজন রিপন মিয়া জানান, ৪ বা সাড়ে ৪ ইঞ্চির স্থলে ছাদ ঢালাই করা হয় ৮ ইঞ্চি। আর সে কারণে ঢালাই শেষ হতে না হতেই ছাদ ধসে পড়ে। রিপন জানান, নিহত দুলাল ও আমরা ৮ ইঞ্চি ঢালাই দেয়ার প্রতিবাদ করে বলেছিলাম এভাবে ঢালাই দিলে ছাদ ভাইঙ্গা পড়বো। তখন ফিলিং স্টেশনটির মালিক জালাল মিয়া আমাদের ধমক দেন। দুলালকে গালাগাল করে বলেন তুমি এত বেশি বুইঝ না। আমিই ইঞ্জিনিয়ার, আমিই সবকিছু। আমার দায়িত্বেই করো। দুলাল প্রতিবাদ করায় পরদিন থেকে আর কাজে না আসতেও বলে দেন জালাল। রিপন জানান, তারা ভোর সাড়ে ৪টায় কাজে গিয়েছিলেন। সকাল ৭টা থেকে শুরু হয় ঢালাই। একটানা ১টা পর্যন্ত ঢালাই করার পর তারা নাস্তার বিরতিতে যান। ওই সময় পর্যন্ত ছাদের তিনভাগ ঢালাই সম্পন্ন হয়। নাস্তার টাকাও দেয়নি জালাল নির্মাণ শ্রমিকদের। টাকা চাইলে বলে কাজ শেষ হলে পাইবা। পরে তারা নিজেরাই টাকা দিয়ে নাস্তা করেন। পৌনে ২টার দিকে আবার ঢালাই শুরু হওয়ার পর একজন শ্রমিক এক কড়াই মাল নিয়ে ওপরে উঠার পরই ছাদ ধসে পড়ে। অন্য শ্রমিকরা ছিল তখন নিচে। রিপন আরো জানান, যে ৬টি পিলারের ওপর ছাদ দেয়া হচ্ছিল সেগুলো ছিল দুর্বল। এসব পিলারের ওপর টিনের সেড দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে করা হয়েছে ৮ ইঞ্চি ঢালাইয়ে ছাদ। রিপন বুকে আঘাত পেয়েছেন। তার ভাই শিপনও গুরুতর আহত। আরেকজন হানিফ মিয়ার মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। এদিকে ঘটনার পর জেলা প্রশাসন ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করে। এই তদন্ত কমিটিও নিশ্চিত হয়েছে কোনো রকম আর্কিট্যাকচারাল ডিজাইন বা প্ল্যান ছাড়াই ফিলিং স্টেশনের মালিক তার ইচ্ছামতো ফিলিং স্টেশন স্থাপনাটি তৈরি করছিলেন। ফিলিং স্টেশন করার জন্য সরকারের কোনো অনুমোদনও নেয়া হয়নি। তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. শাহনূর আলম জানান, কোনো ধরনের আর্কিট্যাকচারাল ডিজাইন বা প্লান ছাড়া ফিলিং স্টেশনের কাজটি করা হচ্ছিল। মালিক নিজেই শ্রমিক নিয়োগ করে এ কাজ করাচ্ছিলেন। কোনো ঠিকাদারও নিয়োগ দেয়া হয়নি। ছাউনি নির্মাণের জন্য যে পিলার করা হয় সেগুলোরও ফাউন্ডেশন ছিল না। ফলে ঘটনার পর আমরা দেখেছি এগুলো গোড়া থেকে ভেঙেছে। মাঝখান দিয়ে ভাঙেনি। সেন্টারিংয়ে যে বাঁশ ব্যবহার করা হয় সেগুলোও পোকা ও ঘুণে ধরা। আরেকটি বিষয় হচ্ছে ফিলিং স্টেশন করার জন্য সরকারের কোন অনুমোদনও নেয়া হয়নি। অনুমতির জন্য জেলা প্রশাসনে তার কোনো আবেদন আমরা খুঁজে পাইনি। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং ফায়ার সার্ভিসেও খোঁজ করে এ ধরনের কোনো আবেদন পাওয়া যায়নি। সোমবার আশুগঞ্জে চর-চারতলার কুঁড়েরপাড় গ্রামে জালালের বাড়িতে গিয়ে তালাবদ্ধ দেখা গেছে। ফেরিঘাটে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটিও ছিল বন্ধ। তবে গ্রামের অনেকেই জানিয়েছেন জালাল ঢাকার উত্তরায় বসবাস করেন। সেখানে তার নিজের ফ্ল্যাট রয়েছে। জালালের উত্থান নিয়েও আছে আলোচনা।

Share Now
June 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930