প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনের উদ্বোধন করেছেন । রবিবার সকাল ১০টায় গণভবনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তিনি। সাবমেরিন ক্যাবলটির ল্যান্ডিস্টেশন পটুয়াখালী উপজেলার কলাপাড়া উপজেলায়। এটি চালু হওয়ায় বাংলাদেশ নতুন করে ১ হাজার ৫০০ গিগাবাইটের (জিবি) বেশি ব্যান্ডউইডথ পাচ্ছে। নতুন এ সাবমেরিন ক্যাবলের মেয়াদকাল ২০ থেকে ২৫ বছর।

পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় মাইটভাঙ্গা গ্রামে ২০১৩ সালের শেষের দিকে ১০ একর জমির ওপর ৬৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনটি। প্রকল্পটির কাজ শেষ করার পর ২০১৭ সালের মার্চ মাস থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার পরীক্ষামূলক শুরু হয়। সাগরের নিচ দিয়ে ইউরোপ থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে ২৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ক্যাবল লাইন বঙ্গোপসাগরের উপকূলে কুয়াকাটার স্টেশন থেকে মাত্র সাড়ে ৯ কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ল্যান্ডিং স্টেশনের সঙ্গে তা সংযোগ স্থাপন করা হয়।

সাবমেরিন ক্যাবল উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দুঃখের সঙ্গে বলতে চাই এই সাবমেরিন কেবলের সংযোগটা যখন দক্ষিণ এশিয়ায় আসে তখন ক্ষমতাসীন বিএনপি জোট সরকার বিনা পয়সার এই ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। এজন্য প্রস্তাবও বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া বলে দিয়েছিল এটা নাকি সংযু্ক্ত করা যাবে না। কারণ এটা সংযুক্ত করলে বাংলাদেশের সকল তথ্য বিদেশে পাচার হয়ে যাবে। তখন বিএনপির সকল মন্ত্রী ও এমপিরাও এই সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। ফলে সেই প্রস্তাব নাকোচ হয়ে গেল। আমরা বিনাপয়সায় সংযোগটা পেলাম না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৯১ ও ৯৪ সালে সংযোগের প্রস্তাব আসে। কিন্তু দুইবারই তারা নাকোচ করে দেয়। বাংলাদেশের জন্য যা ছিল দুর্ভাগ্যজনক। দেশ যারা চালাবে তারা যদি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার চিন্তাভাবনা না থাকে, স্বপ্ন না থাকে এবং টেকনোলজি সম্পর্কে জ্ঞান না থাকে তবে দেশ যে কত পিছিয়ে যায় তা নিশ্চয়ই দেশের মানুষ বুঝতে পেরেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় এসে সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হবার উদ্যোগ নিলাম, কিছু পদক্ষেপ নিলাম, কিছু কার্যক্রম করেও গেলাম। পরবর্তীতে যখন বিএনপি ক্ষমতায় যখন আসলো তখন তখন সীতাকুন্ড থেকে এটা নিয়ে যাওয়া হলো কক্সবাজার। সেখানে বাংলাদেশের প্রথম সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করা হলো। একটা ক্যাবল দিয়ে যেহেতু এটা কক্সবাজারে তাই এটা দিয়ে বাংলাদেশকে কভার করা কিংবা গতিটা ধরে রাখা বেশ কঠিন কাজ ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। আজ আমাদের সৌভাগ্য যে সেটা উদ্বোধন করতে পেরেছি।

জাপানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনইসি বাংলাদেশের সমুদ্র সীমায় গত দুই বছর ধরে কাজ করে। ইউরোপ থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে সমুদ্র তটে আসা সঞ্চালন লাইন বিচ ম্যানহোল, হ্যানহোল, জয়েন্ট ম্যানহোল হয়ে কুয়াকাটার গোড়াআমখোলা পাড়ায় দ্বিতীয় ল্যাংন্ডিং স্টেশনে সংযুক্ত হয়েছে।

দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্টেশনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ চালু করতে ছয়শ ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ একর জমির ওপর ল্যান্ডিং স্টেশনের মূল ভবনসহ ফাংশনাল বিল্ডিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বৈদ্যুতিক উপ-কেন্দ্র, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার, অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থাসহ সাবমেরিন ক্যাবলের যন্ত্রপাতি স্থাপন ও ডেটা সেন্টারের কাজ শেষ হয়েছে।

১৯টি দেশের টেলিযোগাযোগ সংস্থার সম্মেলনে গঠিত সাউথইস্ট এশিয়া-মিডলইস্ট-ওয়েস্টার্ণ ইউরোপ (এসইএ-এমই-ডব্লিউই-৫) আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের অধীনে এই সাবমেরিন ক্যাবলটিতে ২০ হাজার কিলোমিটারব্যাপী অত্যাধুনিক ১০০ জি আলোক তরঙ্গের ডিডব্লিউএম প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। জাপানের এনইসি এবং ফ্রান্সের অ্যালকাটেল লুসেন্ট যৌথভাবে সাবমেরিন ক্যাবল প্রতিস্থাপনের কাজ করেছে।

কুয়াকাটা সৈকত থেকে একটি ব্রাঞ্চের মাধ্যমে ল্যান্ডিং স্টেশন হয়ে মূল ক্যাবলে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে ব্রাঞ্চ শেয়ারিংও হবে। এর বাইরে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, জিবুতি, মিশর, তুরস্ক, ইতালি, ফ্রান্সসহ বেশ কিছু দেশ এ ক্যাবলে যুক্ত হয়েছে। এর জন্য সাগরের নিচ দিয়ে ফ্রান্স থেকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা ও মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত ২৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ক্যাবল স্থাপন করা হয়েছে।

কুয়াকাটা সৈকত থেকে সাড়ে ৯ কিলোমিটর দূরের সমুদ্র সৈকতে বাংলাদেশ অংশের সাবমেরিন ক্যাবল চলে এসেছে। প্রায় ৬৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটিতে বাংলাদেশ সরকার ১৬৬ কোটি টাকা ও বিএসসিসিএল ১৪২ কোটি টাকা ব্যয় করবে।

ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) প্রকল্পের বাকি প্রায় ৩৫২ কোটি টাকার ঋণ সহায়তা দিয়েছে। ন্যাশন ওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) অপারেটর হিসেবে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) কুয়াকাটা থেকে ঢাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে ব্যান্ডউডথ পৌঁছানোর জন্য অপটিক্যাল ফাইবার ব্যাকহোল তৈরির কাজও শেষ হয়েছে।

Share Now
February 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
232425262728