সেনাবাহিনী মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের চিরতরে বের করে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে । ইতিমধ্যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তাদের বাড়িঘর, ফসলাদি ও গ্রাম। রোহিঙ্গারা যেন সেখানে আর না ফিরতে পারে সে উদ্দেশ্য নিয়েই এসব নৃশংসতা চালানো হচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় বুধবার এসব কথা বলেছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও ডয়েচে ভেলে। খবরে বলা হয়, ১৪ থেকে ২৪শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ৬৫ জন রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকার নিয়েছে জাতিসংঘ। সেসব সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে সংস্থাটি বলেছে, রাখাইনে সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা নির্মূল অভিযান (ক্লিয়ারেন্স অপারেশন) ২৫শে আগস্ট পুলিশ ক্যামেপ বিদ্রোহী হামলা হওয়ার আগে থেকেই চলছে। ২৫শে আগস্টের আগেও রাখাইনে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও শিশু হত্যার মতো নৃশংসতা চালিয়েছে সেনাবাহিনী। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ রা’দ আল-হুসাইন সেনাবাহিনীর এসব কর্মকাণ্ডকে ‘জাতি নিধনের একটি পরিষ্কার উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বুধবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর এসব কর্মকাণ্ড হচ্ছে একটি মানব-বিদ্বেষী পরিকল্পনার অংশ। সে পরিকল্পনা হচ্ছে, সেদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষকে এমনভাবে অপসারিত করা যেন তারা আর কখনো সেখানে ফিরে যেতে না পারে। এ বিষয়ে হাইকমিশনার জাইদ রা’দ আল হুসাইনের জেনেভা অফিস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘প্রাপ্ত বিশ্বাসযোগ্য তথ্য এমন ইঙ্গিত দেয় যে, ‘মিয়ানমার সেনাবাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে রোহিঙ্গাদের সমপদ ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদের বাসস্থান ও রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত সকল গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য শুধুমাত্র তাদের সেখান থেকে অপসারিত করা নয়। পাশাপাশি তারা যেন আর কখনো সেখানে ফিরে যেতে না পারে তা-ও নিশ্চিত করা।’ অন্যভাবে রোহিঙ্গাদের চিরতরে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত করা। রাখাইন রাজ্যে এসব ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে প্রায়ই সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়েছে সশস্ত্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দুর্বৃত্তরা। রাখাইনে রোহিঙ্গারা যাতে আর কখনও স্বাভাবিক জীবনযাপন না করতে পারে সেজন্য তারা যৌথভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে বাড়িঘর, মাঠ, খাদ্যের গুদাম, শস্য ও হত্যা করেছে গৃহপালিত পশুগুলোকেও। রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নিয়ে যেতেই এসব ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গারা যেন আর কখনো মিয়ানমারে ফেরত না যায় তা নিশ্চিত করতে তাদের ওপর সুপরিকল্পিত, সমন্বিত ও পদ্ধতিগত হামলা চালিয়েছে সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জ্ঞান মুছে ফেলতে টার্গেট করা হয়েছে শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নেতাদের। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, অঞ্চলটি থেকে রোহিঙ্গাদের স্মরণ করার মতো সকল বৈশিষ্ট্য ও স্মৃতি কার্যকরভাবে মুছে ফেলার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ এমনভাবে নেয়া হয়েছে যাতে করে, রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরলেও শুধুমাত্র একটি জনশূন্য, অপরিচেয় ভূখণ্ড ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না। অল্পবয়স্ক মেয়েদের তাদের পরিবারের সামনে ধর্ষণ করেছে সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত মানুষরা। এসব মেয়েদের মধ্যে ৫ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুরাও রয়েছে। বেসামরিক নাগরিকদের কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। যারা পালানোর চেষ্টা করেছে তাদের পেছন থেকে গুলি করা হয়েছে। জীবিত অবস্থায় মানুষের গায়ে আগুন ধরিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকারে প্রাপ্ত তথ্য এমন ইঙ্গিত দেয় যে, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করতে একপ্রকার লঞ্চার (উৎক্ষেপক), সম্ভবত রকেটচালিত গ্রেনেড লঞ্চার ব্যবহার করা হয়েছে। ২৫শে আগস্টের একমাসেরও বেশি সময় আগে থেকেই ৪০ বছরের কম বয়স্ক রোহিঙ্গা পুরুষদের কোনো অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা শুরু করে সেনাবাহিনী। রাজ্যে তখন থেকেই রোহিঙ্গাদের মধ্যে একধরনের ভীতির সৃষ্টি হয়। প্রতিবেদন অনুসারে জাতিসংঘের ধারণা, রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরা রোধ করতে সমপদ ধ্বংস করার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী অঞ্চলে স্থল বোমাও স্থাপন করেছে সেনাবাহিনী। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, রাজ্যটিতে এখনো নির্যাতন চলার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
দেশটির সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন সমপর্কিত মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আইনানুযায়ী মিয়ানমারে পুড়ে যাওয়া জমি সরকারি ব্যবস্থাপনার আওতায় চলে যায়।’ পূর্বে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া রোধ করতে এই বিশেষ আইনের আশ্রয় নিয়েছিলো সরকার। এবারও একই পদক্ষেপ নিয়েছে তারা। মঙ্গলবার, রাখাইনে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো মুসলিম ও বৌদ্ধদের মধ্যে সমপর্কের উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করেছে মিয়ানমার সরকার। ইয়াঙ্গুন রাজ্যের একটি স্টেডিয়ামে উভয় পক্ষের সকল শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণে একটি আন্তঃবিশ্বাস প্রার্থনার আয়োজন করেছে।
| M | T | W | T | F | S | S |
|---|---|---|---|---|---|---|
| 1 | 2 | 3 | ||||
| 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10 |
| 11 | 12 | 13 | 14 | 15 | 16 | 17 |
| 18 | 19 | 20 | 21 | 22 | 23 | 24 |
| 25 | 26 | 27 | 28 | 29 | 30 | 31 |
