বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গাদের ৮০৩২ জনের একটি তালিকা দিয়েছিল । ওই তালিকার বেশির ভাগই মিয়ানমারের যাচাই প্রক্রিয়ায় টেকে নি। বলা হয়েছে, নভেম্বরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন ইস্যুতে দু’দেশের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে তার সমর্থনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল না ওইসব রোহিঙ্গার। ওই তালিকা থেকে তারা প্রাথমিকভাবে ৩৭৪ জনের বিষয়ে অনাপত্তি দিয়েছে। ওদিকে প্রত্যাবর্তন নিয়ে করা বাংলাদেশের একজন সিনিয়র মন্ত্রীর মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন মিয়ানমার সরকারের একজন কর্মকর্তা। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন নিয়ে কাউকে রাজনীতি করতে দেয়া হবে না।
বাংলাদেশের দেয়া ৮০৩২ জনের তালিকায় আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরসা) সন্দেহভাজন তিন জনের নাম পেয়েছে বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। এ খবর দিয়েছে অনলাইন মিয়ানমার টাইমস। বুধবার মিয়ানমার সরকার বলেছে, তারা বাংলাদেশ থেকে এই ৩৭৪ জন উদ্বাস্তুকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। এদের বিষয়ে সরকার যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। তাই শিগগিরই তারা দেশে ফিরতে পারবেন। মিয়ানমারের শ্রম, অভিবাসন ও জনসংখ্যা বিষয়ক স্থায়ী সচিব ইউ মিন্ট কাইং এ তথ্য দিয়েছেন। তিনি ন্যাপিডতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বাংলাদেশের দেয়া তালিকার ৩৭৪ জন যাচাইয়ে টিকেছেন এবং তাদেরকে আমরা গ্রহণ করবো। এরই মধ্যে ইয়াঙ্গুনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও ঢাকায় অবস্থিত মিয়ানমার দূতাবাসে এদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। এতে যাদের নাম রয়েছে তারা চাইলে ফিরে যেতে পারেন। যাচাইয়ে রোহিঙ্গাদের না টেকা সম্পর্কে তথ্য বিষয়ক উপমন্ত্রী ইউ অং হ্লা তুন বলেন, বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের আঙ্গুলের ছাপ দেয়া হয় নি। পরিবার প্রধানের দৃশ্যমান পরিচিতিমুলক কোন চিহ্ন নেই। এমন কি তাদের পরিষ্কার ছবিও দেয়া হয় নি। ওদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের একজন সিনিয়র মন্ত্রীর বিবৃতির নিন্দা জানান তিনি। তিনি বলেন, প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া নিয়ে কাউকে রাজনীতি করতে দেয়া হবে না। পাশাপাশি তিনি প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মিডিয়ার সহায়তা আহ্বান করেছেন তিনি। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী আগস্ট থেকে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম পালিয়ে বাংলাদেশের আশ্রয় নিয়েছেন। ইউ মিন্ট কাইং বলেন, যাচাইয়ে টিকে যাওয়া ৩৭৪ জন উদ্বাস্তু হবেন প্রত্যাবর্তনে প্রথম ব্যাচ। তারা ফিরে যেতে পারেন মিয়ানমারে। তবে নিশ্চিতভাবে তারা কবে কোন তারিখে মিয়ানমারে ফিরতে পারবেন সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় নি সরকারের তরফ থেকে। ইউ মিন্ট কাইং বলেন, আমরা এসব মানুষকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তাদের তালিকা পাঠিয়েছি। তাই তারা চাইলে শিগগিরই ফিরে যেতে পারেন মিয়ানমারে।
তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো। তারা বলেছে, রোহিঙ্গারা ফেরত গেলে তাদেরকে আশ্রয় শিবিরের নামে তৈরি আবাসনে রাখা হবে। সেটা হবে আরো শৃংখলিত জীবন। তাদেরকে জেলখানায় আটকে রাখার মতো হবে সেই পরিস্থিতি। ওদিকে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর, গ্রাম মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে সেনা ঘাঁটি নির্মাণ করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের জমিজমা গ্রাস করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এ বিষয়ে কয়েকদিন আগেই মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্ট করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে দাবি তোলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন হতে হবে স্বেচ্ছায়। তাদের ওপর জোর প্রয়োগ করা যাবে না। তাদের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ফেরত যেতে দিতে হবে তাদের আসল বাড়িঘরে। কিন্তু দৃশ্যত অ্যামনেস্টির রিপোর্টের পর এটা বলা যায়, রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরের ওপর যেহেতু সেনা ঘাঁটি, হেলিপ্যাড, গ্রামের ভিতর দিয়ে, বাড়ির ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, ফলে তারা তাদের আদি বাসস্থানে যেতে পারবেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
ওদিকে পুলিশের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উইন তুন বলেছেন, গত বছর ২৫ শে আগস্ট সহিংসতা শুরুর পর এ বছর ১২ই মার্চ পর্যন্ত সন্ত্রাসী সন্দেহে তারা ৩৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন। এর মধ্যে ২৪৮ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী আইনের অধীনে অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে অস্ত্র আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে ৫ জনের বিরুদ্ধে। অন্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম অপরাধ যেমন ধর্ষণ, হুমকি, অভিবাসন বিষয়ক নিয়ম ভঙ্গ, হত্যা ও চুরি সহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্ত শেষে ২৯ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এখনও পুলিশি হেফাজতে আছে ৩৫৫ জন।
