তামিলদের সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধে বিপর্যন্ত শ্রীলঙ্কা ২০০২ সালে যখন প্রথম এসেছিলাম । যুদ্ধ বিগ্রহ নিয়েও দেশটির মাথা পিছু আয় তখন ‍৪০০ ডলারের ওপরে। আর ভারত, বাংলাদেশের ১৫০ ডলারের মধ্যে হবে হয়তো। তখন শ্রীলঙ্কার শিক্ষার হার ৮০ শতাংশ, বাংলাদেশের ২০ এ ওপরে। কলম্বোতে পা রেখে ঢাকার সঙ্গে তফাৎটা বুঝেছিলাম।

১৬ বছর পর ভালো লাগা কলম্বোতে এসে আরো পার্থক্য লক্ষ্য করলাম। অনেক বছর ধরেই শ্রীলঙ্কা শান্ত, নীরব। এই সময়ে শ্রীলঙ্কার উন্নতিও হয়েছে নীরবে। ঢাকা ও কলম্বোর মধ্যে শত শত মাইলের যেমন দূরত্ব, দূরত্ব উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকেও।কোথায় কলম্বো আর কোথায় পড়ে আছে ঢাকা!

কলম্বো দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে চমৎকার সিটি। ভারতের মুম্বাই থেকে যারা খেলা কভার করতে এসেছেন, তারাও এ কথার সঙ্গে একমত।

সুপ্রশস্ত ঝকঝকে, তকতকে রাস্তা। আকর্ষণীয় ফুটপাত। উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আধুনিক ট্রাফিক সিস্টেম। রাস্তার মাঝ খানে সবুজের সৌন্দর্য বর্ধক। রাস্তার দুই পাশে নানা জাতের গাছ, চকচকে বাড়ি ঘর, আধুনিক বানিজ্যিক ভবন। চকচকে গাড়ি। সব কিছু চলছে অনেকটা নি:শব্দে। প্রায় ইউরোপীয় ধাচে। কলম্বোতে এমন অনেক জায়গায়ই আছে যেখানে গেলে মনে হবে আপনি ইউরোপের কোনো সিটিতে এসে পড়েছেন।

ঢাকার চৌরাস্তাগুলো যেন মহা আশ্চার্য! দশ জন পুলিশও সামলাতে পারেন না। আর কলম্বো সিটি চলছে অনেকটা ট্রাফিক পুলিশ ছাড়াই। কেউ কোনো নিয়ম ভাঙছেন না। আইনের প্রতি শ্রীলঙ্কানদের অগাধ শ্রদ্ধা। অটো ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে যে যার মতো গাড়ি চালাচ্ছেন, রাস্তা পারাপারে কেউ নিয়ম ভাঙছেন না। এখানকার ফুটপাতগুলো এত পরিষ্কার পরিছন্ন যে, মনে হয়- গতকাল ইট, পাথরগুলো সুন্দর করে বিছিয়ে রাখা হযেছে। অথচ এগুলো নিমার্ণ করা হযেছে ৫/১০/১৫/২০ বছর আগে।

ঢাকার রাস্তার বাস, গাড়ি, ট্যাক্সি, বেটি ট্যাক্সি, বাড়ি ঘর, বানিজ্যিক ভবন- সব কিছু রং চটা, বিবর্ণ।  কলম্বোর সার্বিক লুক ইউরোপের মতো না হলেও, কাছাকাছি। ছোট দেশ, অল্প মানুষ- তারপরেও কলম্বোর রাস্তায় নতুন ব্র্যান্ডের দামি দামি গাড়ি। সুন্দর সুন্দর এসিওয়ালা বাস। বিমানবন্দরে যে বাসগুলো যাতায়াত করে তাতে ফ্রি wifi এর ব্যবস্থা। কলম্বোর প্রতিটা হেটেলেও wifi।

শ্রীলঙ্কার আয়ের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ আসে পর্যটন খাত থেকে।  অল্প খরচে আধুনিক সবসকম সুযোগ সুবিধে, সুন্দর পরিবেশ, বিনয়ী মানুষজন, সস্তা খাবার দাবার, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা- সব কিছু মিলে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া, উত্তর আমেরিকান পর্যটকদের কাছে শ্রীলঙ্কা আকর্ষণীয় দেশ।

শ্রীলঙ্কার মাথু পিছু আয় বাংলাদেশের চারগুণ। অথচ খাবার দাবার দাম ঢাকার চেয়ে বেশি নয় অনেক ক্ষেত্রেই। বাংলাদেশি ৫০ টাকায় হলে কলম্বোতে পাঁচ প্রকারের সব্জি দিয়ে লাঞ্চ ডিনার সেরে নেওয়া যায়। রেস্টুরেন্টগুলোর পরিবেশও চমৎকার। বিকাল, সন্ধ্যায় কত রকমনের খাবারের মেন্যু। এবং তা ঢাকার চেয়ে সস্তা। শ্রীলঙ্কার মানুগুলো সহজ সরল, সৎ। এরা নীতি নিয়ে ব্যবসা করেন।

নিদাহাস ট্রফি কাভার করতে এসে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ডের যে আপ্যায়ন পেয়েছি, সেটাও চমৎকার। মনে থাকার মতো। মুগ্ধ হওয়ার মতো।

কলম্বো সিটির আরেকটা মু্গ্ধ করার মতো বিষয় হলো- কোটি কোটি পাখি। সবুজে ঘেরা কলম্বো সিটি। আম গাছ, নারকেল , হরেক রকম গাছ। গাছ ভর্তি পাখি আর পাখি। গাছে গাছে যেন পাখিদের সম্মেলন। কোকিল, কাক, ঘুঘু, নানা জাতের পাখি। এবং তারা মানুষের খুব কাছাকাছি।আপনি হেটে যাচ্ছেন ফুটপাত দিয়ে, এক ফুট দুরেই পাখিগুলো যে যার মতো ব্যস্ত। সরছে না। কারণ এখানকার মানুষগুলোর কাছ থেকে সেই বিশ্বস্ততা পেয়েছে পাখিগুলো।

এই কলম্বো সিটিতে পাখিরা মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে কতো বোঝাপড়া, নিবিঢ় সম্পর্ক! গাঢ় বন্ধন। যেটা ঢাকাতে সম্ভব নয়, বাংলাদেশে সম্ভব নয়।

Share Now
September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930