চীন আগ্রাসী গতিতে বৃদ্ধি করছে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও নেপালে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি  । আন্তর্জাতিক বেশির ভাগ দৃষ্টিভঙ্গি যখন দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে নিবদ্ধ, ঠিক তখনই তারা এই কাজটি করছে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে ভারত ও পশ্চিমারা। দক্ষিণ এশিয়ায় অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে শত বর্ষের মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠেছে চীন। দক্ষিণ এশিয়ায় তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে। গত এক দশকে তারা সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে পাকিস্তানে।

সেখানে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে কয়েক শত কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সারা বিশ্বের বাণিজ্যের জন্য নতুন একটি সিল্ক রোড গড়ে তোলার উচ্চাভিলাষ রয়েছে বেইজিংয়ের। এটা যেন এ অঞ্চলের বড়ভাই ভারতকে তীর ছুড়ে মারা। আর পরিস্থিতিটা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে পশ্চিমারা। লন্ডনের অনলাইন দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলজুড়ে তাদের প্রভাব বা আধিপত্য বিস্তার করছে। এটি ভারত ও পশ্চিমাদের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের। এ বিষয়ে থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান কারনেইজ ইন্ডিয়ার একজন ফেলো কন্সটান্টিনো জাভিয়ের বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় এভাবে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে শত বর্ষের মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠেছে চীন। এর আগে রাশিয়ানরা চেষ্টা করেছে। আমেরিকানরা চেষ্টা করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এবারই প্রথম ভারতীয় অঞ্চলে এমন বড় আকারে শক্তির লড়াই প্রথম। থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান গেটওয়ে হাউসের নতুন এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মালদ্বীপের কমপক্ষে ২০টি প্রকল্পে ঋণ দিয়েছে বা বিনিয়োগ করেছে চীনা সরকার বা রাষ্ট্র মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে চীনা বিনিয়োগকে কমপক্ষে দুই ডজন প্রকল্পে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে নেপাল। বাংলাদেশেও আগ্রহ রয়েছে বেইজিংয়ের। এখানে ৩৫০০ কোটি ডলার মূল্যের স্বার্থ রয়েছে চীনের। কিন্তু শ্রীলঙ্কার হামবান্তোতায় যে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে প্রতিবেশী খুব কম এলাকায়ই এমনটা হয়েছে। উন্নয়নের কারণে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে হামবান্তোতায় যেতে সময় লাগে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। এখন হামবান্তোতার চারদিকে আধুনিক সব অবকাঠামো। রাস্তার পাশে চমৎকার সব খাবার দোকান। রাস্তার পাশে মাছধরা জেলেপল্লী। আর চারদিকে আছে ধান ক্ষেত। কলা গাছ। চীনা ঋণে এতসব উন্নয়ন করা হলেও এ এলাকাটি যেন ভৌতিক। গাড়ির চেয়ে রাস্তায় চড়ে বেড়ায় বেশি গরু।
২০১৩ সালে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সরকার প্রধানরা যে কনভেনশন সেন্টারে মিলিত হয়েছিলেন, তা এখন ব্যবহার করা হয় বিয়ের কমিউনিটি হল হিসেবে। সস্তায় ভাড়া দেয়া হয়। নবনির্মিত একটি হাসপাতাল আছে। কিন্তু সেখানে কোনো রোগী কখনোই ভর্তি করা হয় নি। পরিবর্তে তা ব্যবহৃত হচ্ছে চীনা অভিবাসী শ্রমিকদের আবাসন হিসেবে। একই অবস্থা তাত্তালা রাজাপাকসে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের। এখানে বিমান উঠে-নামে কম। অবসরে থাকে স্টাফরা। কাউন্টারগুলো বেশির ভাগ সময়ই ফাঁকা। কার রেন্টাল ডেস্কগুলোতে লোক নেই। তথ্য বিষয়ক ডেস্কে দেখা যায় খুব কম সংখ্যক স্টাফ হাসি-তামাশা করছেন। অথচ বছরে ১০ লাখ যাত্রী আসা- যাওয়ার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল এই বিমানবন্দর। কিন্তু ২০১৭ সালে ওই বিমানবন্দর দিয়ে ৫০ হাজারের কিছু বেশি যাত্রী আসা-যাওয়া করেছেন। চার বছর আগে এই বিমানবন্দরটি উদ্বোধন করা হয়েছে। তারপর এটি বিশ্বের সবচেয়ে কম ‘এম্পটি’ বা ফাঁকা বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধের পর যে উন্নয়ন শুরু হয়েছিল তার আওতায় এসব নির্মিত হয়েছিল। এ জন্য চীনের কাছ থেকে ৮০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসে। তিনি তার জন্মস্থানকে পর্যটন ও ব্যবসার একটি ‘পাওয়ার হাউজ’ বানাতে চেয়েছিলেন। শ্রীলঙ্কা সরকারের একজন অর্থনীতিবিদ বলেছেন, এমন একটা ভাবধারা ছিল যে, চীন চাহিবামাত্র চীনের তরফ থেকে ফাঁকা চেক দিয়ে দেবে। তিনি বলেন, চীনারা যে অর্থ ঋণ দিচ্ছে তা আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে কোনোদিক থেকেই উন্নততর নয়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে চীনের কাছ থেকে ঋণ কেন? এর উত্তর হলো, ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে চীনারা খুব কমই প্রশ্ন উত্থাপন করেন। অর্থাৎ তারা সহজেই ঋণ দেয়। তিনি বলেন, তারা জানতে চায় না কীভাবে আমরা কাজ করছি, আমাদের ব্যবসায়ী মডেল কি।
হামবান্তোতার মতো প্রতিটি প্রকল্পই পরিত্যক্ত হয়ে রয়েছে এমন নয়। ২০১০ সালে একটি নতুন বন্দর নির্মাণের জন্য চীনের রাষ্ট্র মালিকানাধীন একটি করপোরেশনকে ১৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত দেয় শ্রীলঙ্কা। গত ডিসেম্বরে সরকার ওই বন্দরটি লিজ দিতে সম্মত হয়। সঙ্গে ১৫০০০ একর জমিসহ। এই লিজ দেয়া হয় চীনের ওই একই কোম্পানিকে ৯৯ বছরের জন্য। এই লিজ দেয়ার ঘটনায় ভারতীয় ও পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তারা মনে করেন, এর মধ্য দিয়ে ভারত মহাসাগরে কৌশলগত অবস্থান শক্ত করতে সম্মত হয়েছে চীন। তাছাড়া এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা মনে করছেন, এর মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কা বড় ধরনের ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ে যাচ্ছে। পরিণামে তাদেরকে আরো অনেক সম্পদ হারাতে হতে পারে বাধ্য হয়ে।
ঘটনা আরো ঘটে গেছে। হামবান্তোতা বন্দরে এতদিন শ্রীলঙ্কার পতাকা ছিল। সেখানে গত ৯ই ডিসেম্বর শ্রীলঙ্কার পরিবর্তে উড়ানো হয়েছে চীনা পতাকা। এ অবস্থা সাতদিন ছিল। ওই বন্দরের কাছের এক বৌদ্ধ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বারগামা গনানা থিলাকা বলেন, এ অবস্থা দেখে আমি বন্দরের প্রশাসনিক অফিসে যাই। তাদেরকে বলি, আমি চীনের ওই পতাকা নামিয়ে ফেলতে চাই। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন কয়েক শত বৌদ্ধ ভিক্ষু। তারা হামবান্তোতা বন্দর লিজ দেয়ার বিরোধিতা করতে থাকেন। তাদের মতে, এর মাধ্যমে সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে চীনা ঔপনিবেশ। বারগামা গনানা থিলাকা বলেন, যখন শ্রীলঙ্কায় ঔপনিবেশ ছিল বৃটিশদের তখন তাদের বিরুদ্ধে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। হামবান্তোতায় চীনা শ্রমিকদের উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এসব চীনা শ্রমিকদের সঙ্গে শ্রীলঙ্কান স্থানীয় নারীদের বিয়ের ঘটনাও ঘটছে। থিলাকা অভিযোগ করেন, তিনি এমন কমপক্ষে পাঁচটি বিয়ের কথা জানেন। তিনি আরো বলেন, চীনারা যদি এখানে এভাবে আসা ও তাদের অবস্থান পাকা করতে থাকে তাহলে আমরা একই অবস্থায় ফিরে যাবো, যেমনটি ছিল ভূমিহীন তামিলদের নিয়ে। এসব মানুষকে তাদের দেশে ফেরানো যাবে না। বিশ্লেষক ও পশ্চিমা কূটনীতিকরা সতর্ক করছেন। তারা বলছেন, চীনা অর্থ শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অঙ্গনেও পৌঁছে যাচ্ছে ক্রমবর্ধমান হারে। ওয়াশিংটনে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের ইন্ডিয়া প্রজেক্ট বিষয়ক পরিচালক তানভি মদন এমনটাই মনে করেন। ওদিকে মালদ্বীপের নির্বাসিত সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ তার দেশে চীনা বিনিয়োগকে একটি তীব্র সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি এ জন্য দায়ী করেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনকে। মোহাম্মদ নাশিদ বলেন, তারা সরাসরি বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদেশিদের অস্ত্রায়িত করছে।
উল্লেখ্য, এখনকার জন্য হামবান্তোতা বন্দর চীনের নৌবাহিনীর জন্য নিষিদ্ধ করেছে শ্রীলঙ্কা। কিন্তু যে ঋণ তারা নিয়েছে তা শোধ করতে হবে ভবিষ্যতে। সেই ঋণ বাড়তেই থাকবে সামনের দশকগুলোতে। কলম্বোর ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ডুশনি বিরাকুন বলেন, যখন কোনো দেশ হোক সেটা চীন, ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র, তাদের ঋণ দেয়ার কৌশলগত কিছু স্বার্থ থাকে। কারনেইজ ইন্ডিয়ার ফেলো জাভিয়ার মনে করেন, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত গণতন্ত্রের দেশে চীনা আগ্রাসী বিনিয়োগ মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আপনি ভাবুন, এখন থেকে ১০ বছরের মধ্যে ২৪০০ কোটি ডলার দিয়ে বাংলাদেশে কী কী করতে পারে চীন। উল্লেখ্য, ভারত ও চীনের মধ্যে এমনিতেই বিরোধ আছে। তারা সীমান্ত নিয়ে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু প্রথমবারের মতো ২০১৭ সালে তারা প্রথমবার তৃতীয় কোনো দেশের মাটিতে পা রেখেছে। সেটা হলো ভুটান। তাদেরকে প্রতিরোধ করতে ভারতীয় সেনাদের আহ্বান করেছিল ভুটান। প্রতিবেশীদের বিষয়ে ভারত এখন দ্বিগুণ উদ্যোগ নিয়েছে বলে মনে করেন জাভিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত এখন অনেকটা ঘনিষ্ঠ। জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে উচ্চ পর্যায়ের একটি ফোরাম। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘কুয়াড’। এর উদ্দেশ্য হলো ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে অবাধ ও মুক্ত রাখা। ভারত বা চীন কেউই এখন পর্যন্ত পুরো অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ আধিপত্য বিস্তার করতে পারে নি বলে মনে করেন মদন।
Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031