এ মাসের ২৭ তারিখে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে চিরবৈরি দুই কোরিয়ার শীর্ষ প্রধানদের সাক্ষাৎ।এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছে। একইদিন হোয়াইট হাউজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আর এদিনই চীনের হুবেই শহরে বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন এশিয়ার দুই পরাশক্তি চীন ও ভারতের নেতা শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদী।
বিশ্বরাজনীতিতে এ দেশগুলোর ভূমিকা প্রভাববিস্তারি। সে প্রেক্ষিতে দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের পারষ্পরিক সাক্ষাৎ ও বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্ববাহী। বিশ্বের শান্তির স্থিতিশীলতায় কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান পরাশক্তি ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি টিকিয়ে রাখা নিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক আলোচনাও গুরুত্ববহ। তবে এশিয়া তথা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে অর্থবহ শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদীর বৈঠক।
শি ও মোদীর বৈঠকে এশিয়ার দুই পরাশক্তিধর দেশ চীন ও ভারত বৈরিতা ভুলে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছেছে। ২৭ এপ্রিল দুই দিনের চীন সফরে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে চার দফা বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠা ছাড়াও, আফগানিস্তানে যৌথ বাণিজ্যিক প্রকল্প শুরুর বিষয়েও সম্মত হন দুই নেতা। মোদীর চীন সফরকে ‘নতুন অধ্যায়ের সূচনা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট ভারতের আস্থা অর্জনে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চীনের সম্মতিও আদায় করে নিয়েছেন।
মোদীর চীন সফরের উল্লেখযোগ্য দিক হলো— দুই দেশের সীমান্তে দশকের পর দশকজুড়ে বহমান সেনা উত্তেজনা দূর করে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় এক হয়ে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। তাছাড়া আফগানিস্তানে ভারত-চীনের যৌথ অর্থনৈতিক প্রকল্প গ্রহণের বিষয়টিও চূড়ান্ত করে নিয়েছেন তারা।
চীন যদি এ প্রকল্পে ভারতের দাবি মেনে নেয়, তাহলে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর থেকে তারা প্রকল্পের কাজ সরিয়ে নিতে পারে। যা পাকিস্তানের জন্য বড় ধরণের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে। কেননা ইতোমধ্যে চীন সেখানে কয়েকশ কোটি ডলারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ভারতের দাবি মেনে নিলে দেশটি (চীন) সেসব থেকে সরেও আসতে পারে।

শনিবার মোদীর সফর শেষে হুবেই প্রদেশের জুহান শহরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যেই দুই নেতা তাদের আলাপ সেরেছেন এবং সীমান্ত সমস্যা সমাধানের বিষয়ে একমত হয়েছেন। এছাড়া বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উন্নয়ন নিয়েও কথা হয়েছে তাদের।’ ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের এ কর্তাব্যক্তিও এখন থেকে দুই দেশের মধ্যে নতুন সম্পর্কের ইতিহাস শুরু হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
চীনা সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চার দফা দীর্ঘ বৈঠকে তথ্য বিনিময়, কৌশলগত যোগাযোগ বৃদ্ধি, জঙ্গিবাদ দমন, ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবসা, ঐতিহ্য ও চলচ্চিত্রের প্রচার নিয়ে আলাপ করেন। নানা ইস্যুতে চিরপ্রতিদ্বন্ধি দেশ দুইটির দুই শীর্ষ নেতার বৈঠককে ভারত ও চীনের গণমাধ্যমে ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে।
এপ্রিলকে ‘ক্রুয়েলেস্ট মান্থ’ বলেছিলেন ইংরেজ কবি টি এস এলিয়ট। কবি তার কবিতায় ‘নির্দয়তা কিংবা নিদারুণ’ অর্থেই এমনটা বলেছিলেন হয়তো। আমরা দেখতে পেলাম ২০১৮ সালের এপ্রিল নির্দয়তা ছাপিয়ে যথার্থই আশাবাদ ও শান্তির ছাপ রেখে গেলো এসময়কার বৈশ্বিক ইতিহাসে। এ ইতিহাস উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের ভাষায় ‘শান্তি ও সমৃদ্ধির ইতিহাস’। আমরাও আশা করতে পারি ২০১৮ সালের এপ্রিল আগামীদিনের সুন্দর পৃথিবীর জন্য অম্লান হয়ে থাকুক।
