রওশন আক্তার বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলায় যুগান্তকারী রায় আদায় করেও ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না । আপিল বিভাগের আদেশ তিন বছরেও বাস্তবায়ন করেনি বাংলাদেশ বেভারেজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের সম্পদ দুইবার নিলামে তোলা হলেও কেউ সে নিলামে অংশ নেয়নি।
স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করে ২৮ বছর ধরে আদালতে দৌড়ে এখন ক্লান্ত ৭০ বছর বয়সী এই নারী। এখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইছেন।
রওশন আক্তারের স্বামী মোজাম্মেল হোসেন মণ্টু দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর পেপসি কোলার সে সময়ে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বেভাজের ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের একটি ট্রাক উল্টোদিকে চলার সময় মণ্টুকে চাপা দেয়। আর ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মারা যান এই সাংবাদিক।
আদালতে মীমাংসাতেই ২৪ বছর
দৈনিক সংবাদের পরামর্শে ১৯৯১ সালের ১ জানুয়ারি মাসে জজ আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা করেন মণ্টুর স্ত্রী রওশন আক্তার। প্রায় ১৬ বছর পর ২০০৫ সালের মার্চ মাসে এই মামলায় রায় দেয় আদালত। বিচারক তিন কোটি ৫২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বাংলাদেশ বেভারেজকে নির্দেশ দেন।
সেই রায়েরও ১৩ বছর হয়ে গেল, এখনও ক্ষতিপূরণের একটি টাকাও পাননি রওশনা। অবশ্য এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিলের মীমাংসা হতেও বিলম্ব হয়েছে। আর উচ্চ আদালত ক্ষতিপূরণের টাকাও কমিয়েছে কিছুটা।
বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদার ও নূরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১০ সালের ১১ মে চালকের ভুলে কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দেয়া যায় বলে মত দেয়। পাশাপাশি টাকার পরিমাণ কমিয়ে দুই কোটি এক লাখ ৪৭ হাজার আট টাকা নির্ধারণ করা হয়।
এরপর হাইকোর্টে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করা হয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। আর ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল সে সময়ের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ আপিল বিভাগ মণ্টুর পরিবারকে এক কোটি ৬৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে গাড়ির মালিক বা কোম্পানিকে নির্দেশ দেয়।
আপিল বিভাগের রায়েও পরোয়া নেই
আপিল বিভাগের এই রায়টি দেশে আইনের শাসনের জন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। কিন্তু আদালত থেকে সাতদিনের মধ্যে টাকা পরিশোধের নির্দেশ দিলেও সেই টাকা তিন বছরেও পরিশোধ করা হয়নি।
রওশন আক্তারের ক্ষতিপূরণের মামলার বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে গত এপ্রিল ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত রাজীব হাসানের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশের ঘটনায়। গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর দুটি বাসের চাপায় হাত হারিয়ে পরে ১৬ এপ্রিল মারা যান রাজীব।
বাবা-মা হারা রাজীব তার দুই ভাইয়ের অভিভাবক ছিলেন। নিজে তিতুমীর কলেজে পড়াশোনা করলেও দুই ভাইয়ের জন্যই চাকরি করতেন। রাজীবের মৃত্যুর পর পর দুই ভাইয়ের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
গত ৮ মে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রাজীবের পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়। এই টাকার অর্ধেক দিতে হতো রাষ্ট্রীয় পরিবহন কোম্পানি বিআরটিসি এবং স্বজন পরিবহনকে। এই দুটি কোম্পানির বাস চাপাতেই আহত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন রাজীব। অবশ্য ২২ মে এই আদেশ স্থগিত করেছে আপিল বিভাগ।
এর আগেও দেখা গেছে, আদালত থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার একাধিক আদেশের পরও ভুক্তভোগীরা একটি টাকাও পাননি।
২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর শাহজাহানপুর রেল কলোনিতে কয়েকশ ফুট গভীর গভীর কূপের পাইপে পড়ে মারা যাওয়া চার বছরের শিশু জিহাদের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের আদেশ এসেছে ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু হাইকোর্টের সে আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি ২৭ মাসেও।
চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং সাংবাদিক মিশুক মুনিরের পরিবারকেও ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ এলেও সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি।
ওই দুটি মামলায় আইনি প্রক্রিয়া তাও কিছু বাকি আছে। কিন্তু সাংবাদিক মণ্টুর মৃত্যুও পর ক্ষতিপূরণ দিতে আদালতের আদেশের পর আর কোনো আইনি প্রক্রিয়াই বাকি নেই। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশও বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

মামলা করতে গিয়ে খরচ হয়েছে দেদারসে, সইতে হয়েছে কটূক্তি
স্বামী মণ্টু দৈনিক পত্রিকায় কাজ করতেন আর রওশন আক্তার সরকারি কবি নজরুল কলেজের প্রভাষক ছিলেন। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হয়ে অবসরে যান।
তখন সরকারি চাকুরেদের বেতন খুব বেশি ছিল না। তার যাও পেতেন তার একটি অংশ খরচ হয়ে যেত মামলার পেছনে। ফলে জীবনে শখ আহ্লাদ কিছুই পূরণ হয়নি। সন্তানের চাওয়া পাওয়াও পূরণ করতে পারেননি তিনি।
অবসর জীবনে পল্টনের দুই সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন। রওশন বলেন তার জীবন সংগ্রামের কথা। জানান, স্বামীর মৃত্যুও পর বাবার বাড়িতে থাকতেন বলে ভাড়া লাগত না। তখন বেতন ছিল দেড় হাজার টাকা। প্রতিমাসেই উকিল, মহরি, সেরেস্তেদার, পিয়ন থেকে শুরু করে সবাইকে টাকা দিতে হত।
‘মাত্র ১০ টাকা ২০ টাকা রিকশা ভাড়া বাঁচাতে মাইলের পর মাইল পথ হেঁটেছি’- কঠিন জীবনের অবস্থা বলতে গিয়ে বলেন রওশনা।
জীবনের শেষ বেলায় ক্ষতিপূরণের টাকা পেলে সন্তানদের জন্য অন্তত কিছু করে যেতে পারবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশেও যখন টাকা পরিশোধ হচ্ছে না, তখন তিনি ২০১৬ সালে আবার মামলা করেন।
সেই মামলায় আদালত থেকে বাংলাদেশ বেভারেজ কোম্পানির জমি ক্রোক করে বিক্রির জন্য আদেশ এসেছে। সেই নিলাম বিজ্ঞপ্তি দুইবার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কেউ নিলামে অংশ নেননি। এর পেছনে কোম্পানির হাত দেখেন তিনি।
‘এই মামলার বিবাদিরা ও আইনজীবীরা খুবই শক্তিশালী। তাদের কারণে নিলাম ডাকলে সেখানে কেউই যেতে পারেন না।’
ক্ষতিপূরণের টাকার কথা বলতে একবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনেও গিয়েছিলেন রওশন আক্তার। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ততার জন্য তার দেখা পাননি। পরে ব্যক্তিগত সহকারী সাজ্জাদুল হাসানকে বলে এসেছিলেন বিষয়টি। পরে কী হয়েছে আর জানেন না।
মণ্টু পত্নী বলেন, ‘বিবাদিরা যদি ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ করতে না পারে তাহলে তাদের জমির কিছু অংশ আদালতের মাধ্যমে আমাদের নামে লিখে দিক, আর আদালত থেকে আমাদের দখল বুঝিয়ে দিক। আর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে মাত্র ১০ মিনিটের সময় চাই।’
সন্তানদের বড় করার বিষয়ে রওশন বলেন, ‘যখন আমার স্বামী মারা যান, তখন বড় ছেলে ইমতিয়াজ হোসেন নয়নের বয়স নয় বছর। ছোট ছেলে ইশতিয়াক হোসেন আননের সাত। ওরা উইলস লিলিট ফ্লাওয়ার স্কুলে পড়ত। ওদের মাসের বেতন ছিল দেড়শ টাকা যা ফ্রি করে দিয়েছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ।’
‘আমার বাবা কাঁচা বাজারটা করে দিতেন, আমার ভাই আমেরিকায় থাকেন। তিনি আমার ছেলেদের জামা, জুতা কাপড়, চোপড় কিনে দিতেন।’
‘তখন সংবাদ থেকে ৮০ হাজার টাকা পেয়েছিলাম যার ৭০ হাজার টাকাই পরিশোধ করেছি ঋণ দিতে। এছাড়াও হাসান ইমাম সাহেব সংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিমাসে এক হাজার টাকার একটি ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন যা প্রতি বছরে ১২ হাজার টাকা তুলতাম যা আমার খুব উপকারে আসত।’
বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ মামলা করতে গিয়ে মাসে পাওয়া দেড় হাজার টাকা বেতনের ছয়শ টাকাই খরচ হয়ে যেত।’ খরচের এখানেই শেষ নয়। ‘আমার চাকরির পেনশন গ্রাচুইটি সব টাকাই এই মামলার পেছনে খরচ করেছি। নিলামের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে আমার এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আদালতের একটি ক্রোক পরোয়ানা সদরঘাট থেকে তেজগাঁওয়ে পৌছানোর জন্য আমাকে ৪০ হাজার টাকা ঘুষ পর্যন্ত দিতে হয়েছে।’
আদালতের আদেশ পক্ষে যাওয়ার পর মানুষের টিপ্পনিও শুনতে হয়েছে রওশন আক্তারকে। বলেন, ‘যখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফিস শেষ করে বের হতাম তখন কেউ কেউ আমাকে উদ্দেশ্যে করে বলত ওই যে সাড়ে তিন কোটি টাকা যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ বলত স্বামী মারা গেছে দেখেন না, আবার টাকা আদায়ের জন্য মামলা করছে। এভাবে মানুষে নানা ধরনের কথা বলত।’
দুই ছেলে এখন কী করেন? জানতে চাইলে মণ্টু পত্নী বলেন, ‘বড় ছেলে ল্যাব এইড হাসপাতালের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মিরর গ্রুপের নির্বাহী আর ছোট ছেলে ইশতিয়াক হোসেন আনন নর্থ সাউথ বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক।’
