প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে তোলপাড় চলছে  Aভারতীয় চিন্তাবিদদের মধ্যে ভারত সফর থেকে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে। তিস্তা চুক্তি নিয় মোদির আশ্বাসের প্রশ্নে তিনি বলেছেন, কারও ওপর তিনি ভরসা করেন না। আবার ভারত চিরকাল মনে রাখচে-এমন কথাও বলেছেন তিনি।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীদের কাছ থেকে কখনও এই স্বরে এই ধরনের বক্তব্য আসেনি। এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে কী বলতে চেয়েছেন শেখ হাসিনা।

ভারতের গণমাধ্যম ওয়ান ইন্ডিয়া ও বিবিসিকে দেয়া  সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার বক্তব্য বিশ্লেষণ করেছেন দিল্লির থিংক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড এনালাইসিসের গবেষক স্ম্রুতি পাটনায়েক।

এই বিশ্লেষক মনে করেন, তিস্তা চুক্তি এখনও না হওয়ায় হতাশ শেখ হাসিনা। আর তার অসন্তোষ জানিয়ে দিয়েছেন এভাবেই।

বাংলাদেশ যা দিয়েছে ভারতের তা সারা জীবন মনে থাকবে-এই ধরনের বক্তব্যের ব্যাখ্যায় শেখ হাসিনা ভারতের কাছে কৃতজ্ঞতা চেয়েছেন বলে মনে করছেন সে দেশের বিশ্লেষকরা।

গত ২৫ ও ২৬ মে পশ্চিমবঙ্গ সফরের প্রথম দিন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্ত বৈঠক হয়েছে শেখ হাসিনার। দুই পক্ষ এই বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে কিছু প্রকাশ করেনি। কিন্তু কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার দাবি করেছে, মোদির কাছে প্রতিদান চেয়েছেন শেখ হাসিনা।

কী প্রতিদান চেয়েছেন, সংবাদ সম্মেনে এমন প্রশ্ন ছিল শেখ হাসিনার কাছে। জবাব আসে ঝাঁঝাল। বলেন, ‘আমি কোনো প্রতিদান চাই না। প্রতিদানের কী আছে? আর কারও কাছে চাওয়ার অভ্যাস আমার একটু কম। দেয়ার অভ্যাস বেশি।’

‘আমরা ভারতকে যে দিয়েছি, সেটা ভারত সারা জীবন মনে রাখবে’- উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটি গুড়িয়ে দেয়ার কথা তুলে ধরেন।

‘প্রতিদিনের বোমাবাজি, গুলি, আমরা শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছি। এটা তাদের মনে রাখতে হবে। কাজেই আমরা কোনো প্রতিদান চাই না।’

স্ম্রুতি পাটনায়েক মনে করেন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কটাকে দীর্ঘমেয়াদে দেখতে হবে। এখানে কোনো দেশের জেতার কিছু নেই। আর দুই দেশের সরকারকে বিষয়টি নিয়ে সেভাবেই ভাবতে হবে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনার জন্য বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, স্বীকার করেন পাটনায়েক। এর প্রভাব বাংলাদেশের উপরও থাকবে বলে তিনি মনে করেন।

‘আমি এটা বলব না যে ভারত বেশি লাভ পেয়েছে আর বাংলাদেশ কম লাভ পেয়েছে। এভাবে কোন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হয় না।’

“বিষয়টা এ রকম নয় যে, ভারতের লাভ হলে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে কিংবা বাংলাদেশের লাভ হলে ভারতের ক্ষতি হবে। বিষয়টিকে সেভাবে দেখার সুযোগ নেই। বর্তমানে দুদেশের সম্পর্ক যে অবস্থায় আছে সেটি ‘উইন-উইন সিচুয়েশন’ বা উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক।”

আওয়ামী লীগ সরকারের ঘোষিত নীতি হলো নিজ ভূমিকে অন্য কোনো দেশের সন্ত্রাসীদের ব্যবহারের সুযোগ দেবে না। স্পষ্টতই এই নীতি ভারতের জন্য লাভজনক হয়েছে।

পাটনায়েক বলেন, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা, যারা বাংলাদেশের ভেতরে লুকিয়ে ছিলেন তাদের ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে ভারতরে উত্তর-পূর্বাঞ্চল এখন আগের তুলনায় অনেকটাই স্থিতিশীল।

এই ভারতীয় বিশ্লেষক বলেন, ‘শেখ হাসিনা বুঝাতে চেয়েছেন দেশের সম্পর্ক শুধু একটিমাত্র বিষয়ের উপর নির্ভর করে না। প্রতিটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কতগুলো দিক আছে। ভারতে স্থিতিশীলতা থাকলে বাংলাদেশেও স্থিতিশীলতা থাকবে।’

২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, তার সরকার এবং বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের মেয়াদেই হবে তিস্তা চুক্তি। কিন্তু এখনও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা আসেনি।

শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, তিনি মোদির ঘোষণায় এখনও আস্থা রাখেন কি না। জবাবে তিনি বলেছেন, ‘আমি কারও ওপর কোনো ভরসা করে চলি না। আমার দেশের পানির ব্যবস্থা আমার নিজের জন্য করতে হবে, সেটা আমি করে যাচ্ছি।’

এতদিন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, মোদির ঘোষণায় আস্থা আছে। এই প্রথম উল্টো কথা বললেন শেখ হাসিনা।

পাটনায়েক বলেন, ‘তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি বিষয়ে ভারত প্রতিশ্রুতি দিলেও সেটি এখনো বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এনিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে হতাশা আছে। তবে তিস্তা ইস্যু বাদ দিলেও দুদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অনেক অগ্রগতি হয়েছে।’

বর্তমান সরকারের আমলেই ভারতের সঙ্গে স্থল সীমানা চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছে। ছিটমহল বিনিময়ে বাংলাদেশ ১০ হাজার একর জমি বেশি পেয়েছে। জল সীমানাও চূড়ান্ত হয়েছে এই সরকারের মেয়াদেই।

আবার দুই দেশের সম্পর্কে কাঁটা হয়ে থাকা সীমান্ত হত্যাও কমে এসেছে। চলতি বছর প্রথম পাঁচ মাসে সীমান্তে কোনো বাংলাদেশির প্রাণ যায়নি। এটি গত দুই দশকের মধ্যে বড় ধরনের অগ্রগতি।

Share Now
April 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930