স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (সুরক্ষা সেবা বিভাগ) ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী যতক্ষণ পর্যন্ত একটি টেকসই অবস্থানে পৌঁছতে না পারছে, ততদিন ধরে মাদকবিরোধী অভিযান চলতে থাকবে বলে জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, মাদকবিরোধী অভিযানের কোন লিমিটেশন নেই। এটা কন্টিনিউ চলবে। এক্ষেত্রে যৌথ অভিযানেরও নির্দেশনা আছে। যা অতি শীঘ্রই শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।এগুলোর সাথে দেশের ২৬২ কিমি. বর্ডার এলাকায় কাটা তার নির্মাণ ও সীমান্ত এলাকায় ডিভাইস স্থাপন, মাদকের গডফাদারদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নতুন আইন সংশোধনসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলেছেন স্বরাষ্ট সচিব। গতকাল শনিবার সার্কিট হাউজে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে বহিরাগমন পাসপোর্ট অধিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কারা কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের সাথে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

অভিযান প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র সচিব বলেন, এ অভিযান ‘অল আউট’ বলতে যা বোঝায় তাই। সেভাবেই চলবে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এ ব্যাপারে ঘোষণা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং নিয়ে আমরা অনেক চাপের মধ্যে আছি। বিশেষ করে ফরেন মিনিস্ট্রি থেকে আমাদের সবসময় এ বিষয়টি বলে থাকে। বিদেশ থেকেও বিভিন্ন সময় চাপ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এঙট্রা জুডিশিয়াল কিলিং বলতে যেটা বলা হচ্ছে সেটা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তিনি। মাদক নিমূর্লের জন্য কঙবাজার ও বান্দরবানকে আলাদা একটি জোন হিসেবে চিহ্নিত করার কাজ চলছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্র সচিব বলেছেন, এ দুই অঞ্চলকে নিয়ে পৃথক জোন হিসেবে নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছি। এ দুই অঞ্চলকে আলাদাভাবে সীলগালা করে দেয়া হবে। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়িয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

সীমান্ত এলাকায় কাটা তার নির্মাণ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র সচিব বলেছেন, আমাদের ২৬২ কিমি. সীমান্ত এলাকা আছে। এসব সীমান্তের মধ্যে অনেক জায়গায় বিজিবি যেতে পারে না। নদীপথের সবখানে পাহারা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

নাফনদীতে ৬২ কিমি. জায়গায় ও সীমান্ত এলাকায় কাটা তার নির্মাণের চিন্তাভাবনা চলছে। এছাড়া কিছু পথে ডিভাইস বসানো হবে। এ ব্যাপারে বিজিবি কাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী। এদিকে মাদক নির্মূলে মিয়ানমার থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না জানিয়ে ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী বলেন, দেশে ক্রমান্বয়ে মাদকের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা মাদক উৎপাদনকারী দেশ নই, মাদক ভোগকারী। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে এসব মাদক আমাদের দেশে প্রবেশ করছে। আমরা চেষ্টা করছি পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে এসব মাদক প্রবেশ বন্ধ করতে কিন্তু তাদের অসহযোগিতার কারণে পুরোপুরি পেরে উঠছি না।

তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়েছিলো। আমরা বর্ডারের পার্শ্ববর্তী মাদক কারাখানার তালিকা দিয়েছিলাম। তারা বর্ডারের পাশে মাদক উৎপাদন কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন। ভারত থেকে মাদক আসা অনেক কমে গেছে। মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের ১৯৯৪ সালে চুক্তি হয়েছিল। তাদেরকেও তালিকা দিয়েছি কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি। চুক্তির পর থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে মাত্র ৩টি মিটিং করতে পেরেছি। তারা মিটিংয়েও বসতে চান না। এ নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ দেখতে পাই না। ৩টি মিটিংয়ের কোনো সিদ্ধান্তও আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করেনি তারা। মিয়ানমারে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা আছেন তারাই এ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

মাদকের গডফাদারদের মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে করা আইনের খসড়া আগামী সপ্তাহে মন্ত্রিসভার বৈঠকে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন ফরিদউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, গডফাদারদের ধরছেন না কেন– এরকম অনেক প্রশ্ন পত্রপত্রিকা বিভিন্ন জায়গায় উঠছে। আমরাও সেদিকে যেতে চাই। কাউকে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু সরাসরি যুক্ত না হলে তো হবে না।

যে সমস্ত অভিযোগ আসছে, সেসব বিষয়েও আমরা কাজ করছি। রাতারাতিই সবকিছু পরিবর্তন আসবে না, এজন্য কিছুটা সময়ের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা জড়িত থাকছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

দেশে বর্তমানে ৮০ লাখ মাদকাসক্ত আছে জানিয়ে তাদের মাদক থেকে ফিরিয়ে আনতে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ২’শ শয্যা বিশিষ্ট মাদক নিরাময় কেন্দ্র করা হবে বলে জানিয়েছেন সচিব। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালগুলোতে আলাদাভাবে মাদক নিরাময়ের জন্য শয্যা করার পরিকল্পনা রয়েছে । বর্তমানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে একটি বিকলাঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী বলেন, আমরা চেষ্টা করছি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে যাতে কার্যকর করা যায়। ইতিমধ্যে ৫০টি গাড়ি এবং চারজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। দুজন ম্যাজিস্ট্রেট ঢাকায় অলরেডি কাজ শুরু করেছেন। চট্টগ্রামেও দু’জন ম্যাজিস্ট্রেট আসবেন। এ দপ্তরে জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়ার কথাও বলেন তিনি। চট্টগ্রামে আরেকটি কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেছেন, দেশের কারাগারগুলোর ধারণ ক্ষমতা ৩৬ হাজার ৬০০। কিন্তু কারাগারগুলোতে ৯০ হাজার বন্দি আছে। এদের ৪৩ শতাংশ মাদকের সাথে যুক্ত। যার সংখ্যা প্রায় ৩৬ হাজার। অর্থাৎ সক্ষমতার পুরোটাই মাদকের আসামি দিয়ে ভরা।

চট্টগ্রাম কারাগারে ১৮’শ ধারণ ক্ষমতার বিপরীতে আট হাজার বন্দি আছে। তাই এখানে আরেকটি কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

পাসপোর্ট তৈরিতে বিলম্ব ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের হয়রানি নিরসনে ই–পাসপোর্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং দ্রুত ভেরিফিকেশন সম্পাদন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও জানান সচিব। চলতি বছর শেষ নাগাদ নতুন পাসপোর্টে সুফল পাওয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া সভায় মাদক মামলার জন্য আলাদা ট্রাইবুন্যাল গঠনের ব্যাপারেও অনেকেই পরামর্শ দেন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা ও নগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগমসহ বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031