একের পর এক প্রাণ যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অভিযানেও যানবাহন ব্যবস্থাপনায় তেমন প্রভাব পড়েনি। অভিযানকালে অনেক মালিক ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন সড়কে নামান না। তবে অভিযান শেষে সড়কে চলে এসব যানবাহন। এছাড়া বরাবরের মতো সড়কে বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানোর কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনা।
এর মধ্যে গত দুদিনে সড়ক দুর্ঘটনার বলী হয়েছে কোমলমতি দুই শিক্ষার্থী। গতকাল দুপুরে সাতকানিয়ার ছদাহা কেফায়েত উল্লাহ আহমদ কবীর উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. তাহসিন (১২) ট্রাক চাপায় নিহত হয়। আগের দিন সোমবার বন্দর থানাধীন পুরাতন পোর্ট মার্কেট সংলগ্ন সড়কে বেসরকারি সংস্থা ঘাসফুল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার্থী (পিইসি) সুমনা আকতার (১১) মারা যায়। শিক্ষার্থীদের মৃত্যুতে বাবা-মা হারাচ্ছেন তাদের সন্তান, একই সাথে মৃত্যু হচ্ছে পরিবারের লালিত স্বপ্নের।
গত ১৯ জুন দুপুরে নগরীর জাকির হোসেন সড়কের হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালের সামনে বাসের ধাক্কায় নিহত হন চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তিথি বড়ুয়া (২১)। ২৩ সেপ্টেম্বর সিআরবির পলোগ্রাউন্ড এলাকায় বাসের ধাক্কায় আলমগীর হোসেন রিয়াদ (২৫) নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হন। রিয়াদ ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। এছাড়া ৫ অক্টোবর বোয়ালখালীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন কলেজছাত্র আবির ইসলাম ফাহিম (১৮)। তিনি বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের ব্যবসা শাখার একাদশ শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে মাঝে মাঝে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ভালো উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সেগুলো অনেক সময় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান পরিচালনার সময় ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে উধাও হয়ে যায়। অভিযান শেষে আবার সড়কে নামে এসব যানবাহন। এছাড়া অধিকাংশ যানবাহনের চালক প্রশিক্ষিত না। অনেকের আবার লাইসেন্সও নেই। পুলিশকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে সড়কে এসব ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলে-এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জরিপেও এসেছে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হলো যানবাহনের বেপরোয়া গতি। বেপরোয়া গতির পাশাপাশি চালকের অদক্ষতা, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা, ওভারটেকিং করা, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জেব্রা ক্রসিং না থাকা ও না মানা, গাড়ি চালানো অবস্থায় চালকের মোবাইল ফোনে কথা বলা, রাস্তার নির্মাণ ত্রুটি, ফুটপাত দখল এবং যাত্রীদের অসতর্কতাও অনেকাংশে দায়ী।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানোর সাথে সাথে সরকারের নীতিনির্ধারকদের এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। প্রায় সময় দেখা যায়, চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে ধর্মঘটের ডাক দেয় পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাই জাতীয় স্বার্থে সড়ক দুর্ঘটনা কীভাবে কমিয়ে আনা যায় এই লক্ষ্যে সরকারকে কাজ করতে হবে। এছাড়া কোনোভাবেই যেন হেলপার কিংবা অদক্ষ কাউকে লাইসেন্স না দেওয়া হয়, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে বর্তমানে যানবাহন আছে ৩৫ লাখ ৪২ হাজার। মোটরযান আইন অনুযায়ী চাকা, ইঞ্জিন ক্ষমতা ও ধরন বিবেচনায় নিয়ে ৪০ ধরনের যানের নিবন্ধন দেয় বিআরটিএ। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের ফিটনেস সনদ দরকার হয় না। সারা দেশে মোটরসাইকেল আছে ২২ লাখ ৪০ হাজার। কারসহ অবাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে তৈরির সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরের ফিটনেস সনদ একসঙ্গে দেওয়া হয়। বাস, ট্রাকসহ যানবাহনের ফিটনেস সনদ নিতে হয় প্রতি বছর।
বিআরটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, ১০ শতাংশ গাড়ি নতুন। ফলে কম-বেশি পৌনে ১২ লাখ যানবাহনের প্রতি বছরই ফিটনেস সনদের প্রয়োজন হয়। এছাড়া বর্তমানে দেশে যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ। আর লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা প্রায় ১৯ লাখ। অর্থাৎ প্রায় ১৬ লাখ যানবাহন চলছে ভুয়া চালক দিয়ে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের (আঞ্চলিক কমিটি) সভাপতি মো. মুছা দৈনিক আজাদীকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার দায় কখনো চালকরা এড়াতে পারবে না। গত সোমবার টমটমের ধাক্কায় একজন শিক্ষার্থী নিহত হয়। আমার প্রশ্ন, ওই সড়কে তো টমটম চলার কথা নয়। যেখানে সিএনজি অটোরিকশা বেশি হয়ে গেছে এই অজুহাতে নতুন রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হচ্ছে না, সেখানে টমটম কীভাবে চলে?
তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মালিকদেরকেও সচেতন হতে হবে। তারা চালকদের দৈনিক চুক্তিতে গাড়ি চালাতে দেন। এতে চালকরা অনেক বেশি যাত্রীর আশায় যে রুটে চলাচলের কথা সে রুটে চালায় না। নগরীতে ১৭টি রুট আছে। এসব রুটে যাত্রী থাকুক আর না থাকুক চালকদের নির্দিষ্ট গন্তব্য পর্যন্ত গাড়ি চালাতে হবে। অনেক সময় চালকরা অর্ধেক পথে বলে গাড়ি আর যায় না। এই বিষয়গুলো ট্রাফিক পুলিশকেও খেয়াল করতে হবে। মূলত রাস্তায় যানবাহনের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া গাড়ি কোথায় দাঁড়াবে তা সিটি কর্পোরেশনকে মার্কিং করে দিতে হবে। যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী উঠালে চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। দেখা যায়, ট্রাফিক পুলিশ সেই দায়িত্বটি পালন করে না। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি আমাদেরও কাম্য নয়। ড্রাইভারের ওপর দোষ চাপিয়ে, তাকে শাস্তি দিয়ে যদি সমাধান হয়ে যায়, তাহলে আমাদের আপত্তি নেই। আমার মতে, ট্রাফিক ও চালক উভয় পক্ষকে সংশোধন হতে হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলার এয়ারপোর্ট রোডে বাস চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। এই ঘটনার পর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে নামে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পেক্ষিতে বেপরোয়া গাড়ি চালনায় কেউ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারাত্মক আহত বা নিহত হলে চালকের সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রেখে গত ৬ আগস্ট ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সরকার। এর পর বিআরটিএ দেশব্যাপী যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031