আজ ঝরাপাতা আর ধুলো উড়িয়ে চৈত্র দিনের বিদায়। আজ ‘চৈত্রসংক্রান্তি’ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। সাদর আমন্ত্রণে মাঙ্গলিক চিন্তা ও শুভবোধের উদ্বোধনে হৃদয়সিক্ত প্রাপ্তির ডালিতে নতুনের অভিষেকের দিন পহেলা বৈশাখ কাল । শুভ হালখাতা, মেলা, গান-বাজনা, প্রদর্শনীর আয়োজনে বাঙালি উদযাপন করবে এ দিনটি। চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে লোকমেলার আয়োজন গ্রামগঞ্জেই হয় বেশি। তবে প্রধানত হিন্দু সমপ্রদায়ের মানুষ এটি নানা আড়ম্বরে পালন করে থাকে। আগে গ্রাম বাংলায় এ চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে আচার-অনুষ্ঠানের অন্ত ছিল না। চৈত্র সংক্রান্তিও মেলা উপলক্ষে গ্রামাঞ্চলের গৃহস্থরা নাতি-নাতনিসহ মেয়ে-জামাইকে সমাদর করে বাড়ি নিয়ে আসতো।
গৃহস্থরা সকলকে নতুন জামা-কাপড় দিত এবং খাবার-দাবারের আয়োজন করতো। চৈত্র সংক্রান্তির দিনে মেলা, গান-বাজনা, যাত্রাপালাসহ নানা আয়োজনে উঠে আসে লোকজ সংস্কৃতির নানা সম্ভার।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মেতে ওঠে পূজা-অর্চনায়। বাংলা মাসের শেষ দিনটিকে ঘিরে লোকাচার অনুসারে নানা ক্রিয়াকর্ম করে থাকে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা চৈত্র সংক্রান্তির দিনটিকে অত্যন্ত পুণ্যের দিন বলে মনে করে। আচার অনুযায়ী এ দিনে বিদায় উৎসব পালন করে ব্যবসায়ী সমপ্রদায়। দোকানপাট ধুয়ে-মুছে বছরের যত সব জঞ্জাল, অশুচিতাকে দূর করা হয়। পরদিনই খোলা হয় ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের নতুন খাতা। যার লোকায়ত নাম ‘হালখাতা’। এদিন ধূপ ধুনোর সুগন্ধিতে ভারি করে রাখা হয় ঘরের পরিবেশ। খরিদ্দারদের কাছে বকেয়া টাকা তুলতে বছরের প্রথম দিনটিকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার রেওয়াজ হাজারও বছরের পুরনো। মূলত আজকের দিন থেকেই হালখাতা নিয়ে নতুন বছরের অপেক্ষায় থাকেন ব্যবসায়ীরা।
পুরনো বছরের হিসাব-নিকাশ ঘুচিয়ে ক্রেতার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরিতে চলে মিষ্টিমুখ। রাজধানীর বুকে তাঁতিবাজার, শাঁখারীপট্টি, লক্ষ্মীবাজার, বাংলাবাজার, চকবাজার এলাকায় চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ নিয়ে চলে বিশেষ আয়োজন। পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে হালখাতার মাধ্যমে নতুন বছরের অপেক্ষায় থাকেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে চৈত্র সংক্রান্তির কয়েকদিন আগে থেকেই উৎসবের আমেজে মেতে আছে বাংলার পাহাড়ি অঞ্চল পার্বত্য জেলাগুলো। চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে বাংলার পথে প্রান্তরে নানা জায়গায় বসেছে মেলা। গান, বাজনা ও যাত্রাপালাসহ নানা আয়োজনে উঠে আসে লোকজসংস্কৃতির নানা সম্ভার। বর্তমানে শহুরে সভ্যতার কারণে আবহমান গ্রামবাংলার আনন্দমুখর পরিবেশে কিছুটা ভাটা পড়েছে। তবে এখন শহর ও তার আশপাশের এলাকায় নগর সংস্কৃতির আমেজে চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব হয় ও মেলা বসে, যা এক সর্বজনীন মিলনমেলার রূপ নিয়েছে। বাঙালির অন্যান্য উৎসবের মতোই চৈত্র সংক্রান্তির সঙ্গেও রয়েছে খাওয়া দাওয়ার একটা সম্পর্ক। তবে চৈত্র সংক্রান্তির প্রধান উৎসব চড়ক। এ ছাড়া দেশজুড়ে চলে নানা ধরনের মেলা, উৎসব। বসন্ত বিদায় দেয়ার আয়োজন বেশ বড় হয় পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদেরও। তাদের আয়োজনের মধ্যে থাকে ‘ফুল বিজু’, ‘হারি বৈসুক’।
হিন্দু পঞ্জিকা মতে দিনটিকে গণ্য করা হয় মহাবিষুব সংক্রান্তি নামে। হিন্দুু ধর্মাবলম্বীরা এইদিনে নদীতে বা দিঘিতে পুণ্যস্নানের মাধ্যমে পিতৃপুরুষের তর্পণ করে থাকে। আজ সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে কালের অতল গর্ভে হারিয়ে যাবে আরো একটি বছর। আগামীকাল নানা আয়োজনের মাধ্যমে নববর্ষ ১৪২৬কে বরণ করে নেবে বাঙালিরা। চৈত্র সংক্রান্তি বাংলার লোকসংস্কৃতির এমন এক অনুষঙ্গ যা সর্বজনীন উৎসবের আমেজে বর্ণিল। বছরের শেষদিনে বর্ষবিদায়ের পাশাপাশি বৈশাখ বন্দনায় মেতে ওঠে বাঙালি। চৈত্র সংক্রান্তির প্রধান উৎসব চড়ক। চড়ক গাজন উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। এ উপলক্ষে এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্যগ্রামের শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে নৃত্য করে এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গী, ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানব সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলে। চড়ক মেলায় শূলফোঁড়া, বানফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়ক গাছে ঘোরা, আগুনে হাঁটার মতো ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য দৈহিক কলাকৌশলগুলো বর্তমানে কমে গেছে সময়ের পরিবর্তনে। তবে এখনো পালিত হয় শাস্ত্র ও লোকাচার অনুসারে স্নান, দান, ব্রত, উপবাস প্রভৃতি ক্রিয়াকর্ম।
