মাইকেল এটকিন্সের জীবনও এভাবে বদলে দিয়েছেন তার প্রাথমিক স্কুলের একজন শিক্ষক। কখনও কখনও একজন শিক্ষক আপনার জীবন বদলে দিতে পারেন। স্কুল ছাড়ার কয়েক বছর পর তার জীবনে এই পরিবর্তন আসে।

তার যাত্রা সবসময় এতোটা সোজাসাপ্টা ছিল না, তবে কিছু বন্ধুত্বপূর্ণ নির্দেশনার জন্য তিনি এখনও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। যেই দরজা তিনি এক সময় পরিষ্কার করতেন, আজ সেই দরজাই তার জন্য খুলে দেয়া হয়েছে শিক্ষা বিস্তারের জন্য।

ডেনভারের লোয়ারি এলমেন্টারি স্কুলে চাকরির আগে, মাইকেল স্থানীয় কয়েকটি স্কুলের রক্ষী বা কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করতেন। তিনি যে এলাকায় বড় হয়েছেন এখন তিনি সেখানকারই একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হয়েছেন।

তিনি যখন স্কুলে পড়তেন তখন পড়ালেখা করাটা তিনি উপভোগ করলেও কিছু বিষয় মানিয়ে চলা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তিনি বুঝতে পারতেন যে কিছু শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ভেদাভেদ করতেন। তারা কোথা থেকে এসেছে, তারা দেখতে কেমন, এমন কিছু বিষয়ের ভিত্তিতে তারা শিক্ষার্থীদের মধ্যেই পার্থক্য করতেন।

মাইকেল জানান, ‘স্কুলিং আমার জন্য অনেকটা মাথা নিচু করে সব সহ্য করার মতো বিষয় ছিল’। হাইস্কুল ছাড়ার পর যথাযথ নির্দেশনার অভাবে দিশাহারা হয়ে পড়েন মাইকেল। তিনি বলেন, ‘উচ্চশিক্ষা কিভাবে গ্রহণ করতে হয় সেটা দেখানোর জন্য কেউ ছিল না। আমার পরিবারেরও আমাকে গাইড করার মতো অবস্থা ছিল না।’

কাজেই তিনি চাকরির পাশাপাশি স্টেট কলেজে ভর্তি হন। তার দ্রুত অর্থ উপার্জন করা জরুরি হয়ে পড়ে। কেননা তিনি ১৯ বছর বয়সেই বাবা হয়েছিলেন। তিনি একটা কাজ খুব ভাল পারতেন। সেটা হল শিশুদের সঙ্গে তিনি সহজেই মিশে যেতে পারতেন।

এই দক্ষতা তিনি শিখেছেন তার মায়ের কাছ থেকে। কারণ তার মা, ডে-কেয়ার সেন্টারে কাজ করতেন। এজন্য তিনি কাছের একটি স্কুলে পার্ট টাইম ব্যবসা শিক্ষার ক্লাস করতে যান। সেইসঙ্গে সেখানকার সহকারী শিক্ষক পদে চাকরির আবেদনও করেন।

তিনি শিক্ষকের পদে চাকরিটা না পেলেও কোনভাবে বিভিন্ন স্কুলের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এমন একটি স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন তার দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষিকা। মাইকেলের কথায়, ‘তিনি আমাকে দেখেই আলিঙ্গন করেন, আমার পরিবারের সম্পর্কে জিজ্ঞেসা করেন। আমি তাকে বললাম আমি বাচ্চাদের সঙ্গে কাজ করতে চাই।’

সেখানে থেকে, ক্যারোলিন রেইডলিন- যাকে স্কুলে থাকাকালীন মিসেস ব্রাউন বলে ডাকা হত- তিনি, মাইকেলের জন্য স্কুলের রিডিং ও রাইটিং প্যারা প্রফেশনালের পদ তৈরি করেন।

মাইকেল বলেন, ‘তিনি আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে এমন একজন ছিলেন, যিনি আমার মধ্যে কয়েকটি ভাল জিনিস বপন করতে পেরেছেন। তার মধ্যে দুটি হল- আত্মসম্মানবোধ এবং ভালবাসা। তিনি খুব যত্নশীল ছিলেন। তিনি স্কুলের তথাকথিত পড়ালেখার বাইরেও অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতেন। যেগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’

তিনি বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মতো সামাজিক ও মানসিক বিকাশ এবং কল্যাণের শিক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমাদের সন্তানদের, তাদের পরিচয়, সংস্কৃতি, আত্মসম্মানের সঙ্গে লড়াই করে চলতে হয় তবে তাদের পক্ষে পড়ালেখা করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। যে শিশুটিকে খারাপ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে বা যার বড় ধরণের ট্রমা কাজ করে তাকে বসিয়ে একাডেমিক বিষয়ে আর দশটা বাচ্চার মতো শেখানো এতোটা সহজ হয়না।’

মাইকেল চলতি মাস থেকেই স্টেডম্যান এলমেন্টারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করছেন। তারপর থেকে অসংখ্য মানুষ তাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিনন্দন জানাতে শুরু করে।

মাইকেল মনে করেন, তার প্রথম সন্তান সেই সঙ্গে তার অতীতের অভিজ্ঞতা কাজ তাকে সফলতার পথে হাঁটতে ও আরও সংগ্রাম করার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে। তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে ভাগ্য আমাদের সহায় হয় না। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম ও মনোযোগের মাধ্যমে সবই সম্ভব। সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র নিজের মনের কথাই শুনতে হয়।’

এখন যুক্তরাষ্ট্রের নানা প্রান্তের শিক্ষকরা মাইকেলের স্কুল ঘুরে দেখতে চান। তারা মাইকেলের কাছে পরামর্শ চান যে, কোন ছাত্রকে সংগ্রাম করতে দেখলে তারা কি করবেন। জবাবে মাইকেল বলেন, যারা কঠিন সময় পার করছে তারা আশপাশেই আছে, তাদের টার্গেট করা উচিত। তাদের আচরণ লক্ষ্য করতে হবে। আমি শিক্ষার্থীদের বাবা-মা এবং শিক্ষকদেরকে বলব তারা যেন শিশুদের নিজেদের মূল্যায়ন করার শিক্ষা দেন, যেন তারা শিক্ষা জীবন ও সংস্কৃতি উপভোগ করতে পারে।’

Share Now
September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930