ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ক্যাসিনো কিং । তার হাতে গড়া সাম্রাজ্য ধরে রাখা ও বিস্তারের জন্য বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলেন। তার সব অস্ত্র ছিলো অবৈধ। সেসব অস্ত্র ভাণ্ডারের তথ্য এখন র‌্যাবের মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দাদের হাতে। জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট তার কব্জায় থাকা অস্ত্রের তথ্য দিয়েছেন। একই সঙ্গে কারা এই অস্ত্র পরিচালনা করে তারও তথ্য দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট অস্ত্র সংগ্রহ, অস্ত্র সংগ্রহের করিডোর, সহযোগীদের মধ্যে বিতরণ, মাসিক চুক্তিতে ভাড়া দেয়াসহ নানা কাজে ব্যবহারের বর্ণনা দিয়েছেন। তার ওইসব অস্ত্রের দেখভাল করতেন আরেক ক্যাসিনো কিং খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া।

সম্রাট ছিলেন প্রধান সমন্বয়ক। সম্রাট তার আস্থাভাজন ও প্রধান সহযোগীদের কাছে ওই অস্ত্রগুলো বিতরণ করেছেন।

এসব অবৈধ অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তিনি এবং তার সহযোগিরা ক্যাসিনো পরিচালনা, সরকারি জমিতে অবৈধ মার্কেট নির্মাণ, নতুন নির্মাণাধীন ভবনে চাঁদা আদায়, ফুটপাতে চাঁদাবাজী, সস্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও টেন্ডারবাজি করতেন। অনেক ভুক্তভোগী অস্ত্রের ভয় পেয়ে তাদের চাঁদা দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট স্বীকার করেছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার ভান্ডারে অবৈধ অস্ত্রের কথা স্বীকার করেছেন। ১৪ টি একে-২২, কাটা রাইফেল ৫ টি, ছোট ও বড় রিভলবার ৩০ টি এবং ১টি অত্যাধুনিক একে-৪৭ রয়েছে সম্রাটের শিষ্যদের হাতে। সম্রাট ঢাকার বাইরে গেলে তিনি একে-৪৭ গাড়িতে করে নিয়ে যেতেন। যুবলীগের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ একটি জোনের নেতা হওয়ার কারণে তার গাড়ি তল্লাশির সাহস পেতেন না আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। ওইসব অস্ত্র তিনি যশোরের বেনাপোল ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর সীমান্ত এলাকা থেকে সংগ্রহ করেছেন। সম্রাটের সঙ্গে একাধিক অস্ত্র চোরাকারবারীর সখ্য গড়ে উঠেছিল। তাদেরও নাম সম্রাট র‌্যাবকে জানিয়েছেন। সম্রাট ওই অবৈধ অস্ত্রগুলো তার সহযোগিদের কাছে বিতরণ করেছেন। তাদেরও নামের তালিকা এখন মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দাদের হাতে। তাদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাবের গোয়েন্দারা। র‌্যাবের ধারণা, ওইসব অবৈধ অস্ত্রগুলো দ্রুত উদ্ধার করা না গেলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্য সদস্যদের কাছে চলে যেতে পারে।

গত ১৫ই অক্টোবর অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ মামলায় ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে ১০ দিন ও তার অন্যতম সহযোগী এনামুল হক আরমানকে ৫ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত। পরে পুলিশ মামলার তদন্তভার র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করেন। তাদের দুইজনকে র‌্যাবের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গতকাল তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পঞ্চম দিন পার হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লে.কর্নেল সারোয়ার বিন কাসেম জানান, সম্রাটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার তথ্যের সূত্র ধরে তদন্ত চলছে।
র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা গতকাল মানবজমিনকে জানান, সম্রাট ঢাকায় যুবলীগের রাজনীতিতে প্রবেশ করার পরই আন্ডারওয়ার্ল্ডের একাধিক শীর্ষ সস্ত্রাসীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠে। তার মধ্যে জিসান ছিল অন্যতম। জিসান মালিবাগ ও রমনা এলাকায় তার সাম্রাজ্য ধরে রাখার জন্য অবৈধ বিশাল অস্ত্রের ভান্ডার গড়ে তুলেছিলেন। জিসানের কাছ থেকে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহের পরামর্শ পান সম্রাট তা তিনি র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেছেন।

সূত্র জানায়, সম্রাট ২০১২ সালের জুলাই মাসে যশোরের শমসের আলী নামে এক অস্ত্র চোরাচালানির কাছ থেকে ২টি রিভলবার সংগ্রহ করেন। ওই সময় থেকেই তার অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ শুরু হয়েছে। ২ টি রিভলবার সংগ্রহের সমন্বয়কারী ছিলেন সম্রাটের পরিচিত পল্টনের বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটের এক বৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী। সম্রাট গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে গেছেন। র‌্যাব তাকে খুঁজছে। আরও জানা যায়, যশোরের বেনাপোলের অস্ত্র চোরাচালানী শমসের ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে উঠতি সস্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি কারণে ওই রুট দিয়ে অস্ত্র চোরাচালান অনেকটা কমে গেছে।
সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ২৪শে নভেম্বর সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকা থেকে সম্রাট অত্যাধুনিক একে-৪৭ অস্ত্রটি সংগ্রহ করেন বলে র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেছেন। সেই অস্ত্রটি সংগ্রহে তাকে সহযোগিতা করেছে তার অন্যতম সহযোগী খালেদ হোসেন ভুঁইয়া। ওই অস্ত্রটি নিয়ে তিনি সহযোগীদের কাছে গর্ব করতেন। ঢাকার বাইরে গেলে তিনি তার গাড়িতে করে একে-৪৭টি নিয়ে যেতেন।

র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সম্রাট ও তার সহযোগীরা ওইসব অস্ত্র গণপূর্ত ভবন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, রেল ভবন, ক্রীড়া পরিষদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, যুব ভবন, কৃষি ভবন, ওয়াসাসহ বিভিন্নস্থানে যেখানে টেন্ডার হতো সেখানে বহন করে নিয়ে যেতেন। চাঁদা দিতে রাজি না হলে অস্ত্র প্রদর্শন করে প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখাতেন।
সূত্র জানায়, সম্রাট ওইসব অস্ত্র তার সহযোগীদের কাছে বিতরণ করেছেন যারা মাঠ পর্যায়ে তার হুকুম অনুযায়ী চাঁদা আদায় করে। তাদের নামও তিনি র‌্যাবকে জানিয়েছেন। তারা হলেন, পল্টনের যুবলীগের নেতা আজাদ, মতিঝিলের সেচ্ছাসেবক লীগের নেতা সুমন ওরফে গলাকাটা সুমন, গোপীবাগের হাতকাটা মোতালেব, খিঁলগাওয়ের ছাত্রলীগের নেতা রাসেল, গুলিস্থানের এলাম উদ্দিন, লালবাগের হান্নান, ও সূত্রাপুরের ছোট লালচাঁন। সম্রাট গ্রেপ্তার হওয়ার পরই তারা গাঢাকা দিয়েছেন।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031