আজ ২১তম জাতীয় সম্মেলন টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের। ২০-২১ ডিসেম্বরের এ সম্মেলনে দলটির নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার আভাস মিললেও কেউ নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছেন না। এমনকি আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় শীর্ষ পদ সাধারণ সম্পাদক কে হচ্ছেন, তা নিয়ে নীতিনির্ধারক নেতারা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
শুক্রবার বিকেল তিনটায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধনের পর ২৫ মিনিটের একটি উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করা হবে। সেখানে তুলে ধরা হবে আওয়ামী লীগের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সরকারের উন্নয়ন ও সাফল্য।
সম্মেলন ঘিরে সারা দেশেই দলটির মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীরা এরই মধ্যে ঢাকায় চলে এসেছেন সম্মেলনে যোগ দিতে। তাদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে কাউন্সিলর ও ডেলিগেট কার্ড।
এবারের জাতীয় কাউন্সিলে আওয়ামী লীগের স্লোগান হলো, ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে গড়তে সোনার দেশ, এগিয়ে চলেছি দুর্বার, আমরাই তো বাংলাদেশ’।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনে প্রায় ৭ হাজার কাউন্সিলর অংশ নেবেন। সমসংখ্যক ডেলিগেটও থাকবেন। সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশন ২১ ডিসেম্বর শনিবার সকাল ১০টায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে দলীয় সূত্রে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগ এবারের সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব পেতে যাচ্ছে। দলটির রাজনীতি আগামী দিনে কীভাবে এবং কাদের দ্বারা পরিচালিত হবে, তা নির্ধারিত হবে এই সম্মেলনে। কিন্তু সম্মেলনের আগের দিন রাত পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যায়নি সাধারণ সম্পাদক পদে ওবায়দুল কাদের বহাল থাকছেন নাকি নতুন কেউ দায়িত্ব নিচ্ছেন। এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে নানা গুঞ্জন থাকলেও খোলাসা হচ্ছে না। তাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, জনসাধারণ ও অন্যান্য মহলেও কৌতূহলের শেষ নেই।
আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, দলের সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য জোর তদবির করছেন এ পদে আসীন ওবায়দুল কাদের ছাড়াও তিনজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। দলের গুরুত্বপূর্ণ এ পদে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ আলোচনা হচ্ছে। কে আসছেন, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এক পক্ষ চায়, ওবায়দুল কাদেরই থাকুক, আর অন্যপক্ষ চায় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বা সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে নতুন কেউ দায়িত্ব পাক। এ নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন পাঁচতারকা হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও নেতাদের বাসায় ঝটিকা বৈঠকে বসছেন দুই পক্ষের নেতারা।
শোনা যাচ্ছে, সহযোগী সংগঠনগুলোর মতো আলোচনার বাইরে থেকেও কাউকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিতে পারেন শেখ হাসিনা। ফলে সবাই তাকিয়ে আছে দলীয় সভাপতির দিকে।
আওয়ামী লীগের নেতরা বলেন, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক দায়িত্বে বহাল না থাকলে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও কার্যনিবার্হী সদস্য আজমত উল্লাহ খান আলোচনায় থাকবেন।
এবারের সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন আসবে কি না এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমাদের নেত্রী আসলে কী চান, কাকে চান, নতুন কাউন্সিল থেকে যে নেতৃত্ব আসবে এই নেতৃত্ব তিনি কোন মডেলে রিকাস্ট করবেন এবং কীভাবে সাজাবেন, তিনি নিজেই সেটি ঠিক করবেন। এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এ জন্য ২১ তারিখ বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
দ্বিতীয় মেয়াদে আবারও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আপনার নাম শোনা যাচ্ছে- সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে কাদের বলেন, ‘এটা আল্লাহপাক জানেন, আর নেত্রী জানেন।’
এদিকে আওয়ামী লীগের ২১তম সম্মেলনের সভামঞ্চে নজরকাড়া সাজসজ্জা করা হয়েছে। থাকবে আলোর ঝলকানি। এরই মধ্যে সভামঞ্চটির একটি ছবি পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা গেছে, বহমান পদ্মার বুকে ৪০টি থামের ওপর দাঁড়িয়ে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। তার ওপরে বিশালাকৃতির দলীয় প্রতীক নৌকা। জাতীয় স্মৃতিসৌধের প্রতিকৃতি ধারণ করেছে নৌকাটি। স্মৃতিসৌধের প্রতিকৃতির পেছনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার বিশাল ছবি। সবার ওপরে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।

২০২১ সালের ১৭ মার্চ থেকে পালিত হবে মুজিববর্ষ। এর আগে ১০ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে মুজিববর্ষের কাউন্টডাউন। আর মুজিববর্ষ সামনে রেখে নজরকাড়া ২১তম সম্মেলন করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনে ৫০ হাজার মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা থাকছে বলে জানিয়েছেন দলটির সম্মেলন প্রস্তুতির খাদ্য উপ-কমিটির আহ্বায়ক ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া।
অন্যদিকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি মাথায় রেখে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনকে নির্বিঘ্নে করতে ঢেলে সাজানো হয়েছে পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবকরা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সম্মেলনস্থল, প্রবেশপথসহ চারপাশে দলীয় স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন সম্মেলনের শৃঙ্খলা ও স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য সচিব আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।
সম্মেলনস্থলে নেতাকর্মীদের প্রবেশের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাঁচটি গেট থাকবে। একটি গেট ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
৮১ সদস্যের মধ্যে চারটি পদ শূন্য থাকায় মূল মঞ্চে চেয়ার থাকবে ৭৭টি। মঞ্চের সামনে নেতাকর্মীদের জন্য চেয়ার থাকবে ৩০ হাজার। ২৮টি এলইডি পর্দায় দেখানো হবে সম্মেলনের পুরো অনুষ্ঠান।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং মঞ্চ ও সাজসজ্জা কমিটির আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, সম্মেলনে সব মিলিয়ে ৫০ হাজার কাউন্সিলর, ডেলিগেটস ও নেতাকর্মী অংশ নেবেন।
অভ্যর্থনা
বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, শিক্ষক, চিকিত্সক, আইনজীবীসহ অন্যসব পেশার বিশিষ্টজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে অতিথিদের তালিকা তৈরি করে সম্মেলনের কার্ড পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানান দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং অভ্যর্থনা কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ নাসিম।
প্রচার ও প্রকাশনা
সম্মেলনে প্রচার উপকমিটির পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যে উন্নয়ন হয়েছে, তার একটি কার্ড থাকবে। একই সঙ্গে থাকবে দুটি সিডি। একটিতে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন এবং অন্যটিতে বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এরই মধ্যে ২১তম জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে ওয়েবপেজ উদ্বোধন করেছে প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটি। ওয়েবপেজের ভিডিও অংশে সম্মেলন লাইভ করা হবে।
সম্মেলন উপলক্ষে ১০০ চিকিত্সক নিয়ে ১২টির মতো প্রাথমিক চিকিত্সা কেন্দ্র প্রস্তুত করছে স্বাস্থ্য উপকমিটি। দুপুরে ৫০ হাজার নেতাকর্মীকে খাবার দেয়া হবে। খাবারে মোরগ-পোলাওয়ের সঙ্গে ডিম, ফিরনি ও পানির বোতল থাকবে।
গত ২০তম জাতীয় সম্মেলন ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে শেখ হাসিনা সভাপতি ও ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
২১তম জাতীয় সম্মেলন প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন ও পুরনোদের নিয়ে দলের আগামী কমিটি হবে আধুনিক ও সুসংগঠিত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন রোজ গার্ডেনে জন্ম আওয়ামী লীগের। এখন ঐতিহ্যবাহী এই দলটির বয়স ৬৭ বছর। এ পর্যন্ত দলটির ২০টি জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
