ইরানের সামরিক অঙ্গনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তি জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ইরাকে মার্কিন বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন । এটিকে বলা হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের জন্য সবথেকে বড় ধাক্কা। ইতিমধ্যে দেশটি এই হত্যাকাণ্ডের যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠিনতম প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দিয়েছে। হামলা চালিয়েছে ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সেনাবাহিনীর দুই ঘাটিতে। ফলে অনেকেই মনে করছেন এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য ধাবিত হচ্ছে নতুন এক যুদ্ধের দিকে। কিন্তু এর ফলে একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসছে যে, ইরান কী আসলেই প্রতিশোধ নিতে সক্ষম? ইরানের সামরিক বাহিনীর সার্বিক সক্ষমতা নিয়ে একটি ধারণা প্রকাশ করেছে বৃটেনভিত্তিক গণমাধ্যম বিবিসি। এতে উঠে এসেছে দেশটির সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে কাজ করার সক্ষমতা ও আধুনিক অস্ত্রের বাহার।

বৃটেনের ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মতে, প্রায় ৫ লাখ ২৩ হাজার সক্রিয় সদস্য আছে ইরানের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৫০ হাজার নিয়মিত আর্মি। অন্যদিকে কমপক্ষে এক লাখ পঞ্চাশ হাজার ইসলামিক রিভলিউশানারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি। এছাড়া আরও বিশ হাজার আছে আইআরজিসির নৌ বাহিনীতে। এরা হরমুজ প্রণালিতে আর্মড পেট্রল বোট পরিচালনা করে। আইআরজিসি বাসিজ ইউনিটও নিয়ন্ত্রণ করে যারা মূলত স্বেচ্ছাসেবী ফোর্স। অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ মোকাবেলায় তারা কাজ করে। এরা দ্রুত হাজার হাজার মানুষকে জমায়েত করতে পারে।

আইআরজিসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ৪০ বছর আগে যা পরে বড় মিলিটারি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। একে ইরানর সবচেয়ে প্রভাবশালী ফোর্স বলে মনে করা হয়। আইআরজিসির নিজস্ব নৌ ও বিমান বাহিনী আছে। আইআরজিসির কুদস ফোর্সের নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল সোলেইমানি। এটি বিদেশে অনেক গোপন অভিযান পরিচালনা করে থাকে। তারা সরাসরি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কাছে জবাবদিহি করে। এই ইউনিটকেই সিরিয়াতে মোতায়েন করা হয়েছিলো বাশার আল আসাদকে টিকিয়ে রাখতে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ও সশস্ত্র শিয়া মিলিশিয়াদের সাথে একসাথে যুদ্ধ করেছে তারা। ইরাকে তারা শিয়া নিয়ন্ত্রিত একটি প্যারা মিলিটারি ফোর্সকে সমর্থন করতো যারা ইসলামিক স্টেটকে পরাজিত করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বলছে কুদস ফোর্স অর্থ, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও উপকরণ দিয়েছে যেসব সংগঠন পরিচালনা করে তাদের সন্ত্রাসী গ্রুপ মনে করে তারা। এর মধ্যে রয়েছে লেবাননের হেজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনি হামাস ও ইসলামিক জিহাদও রয়েছে।

অর্থনৈতিক সমস্যা ও অবরোধ ইরানের অস্ত্র আমদানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে যে পরিমাণ আমদানি হয়েছে তা সৌদির আরবের মোট সামরিক আমদানির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মাত্র। ইরানিরা সামরিক খাতে বেশী আমদানি করেছে রাশিয়া থেকে। এর পরেই আছে চীনের অবস্থান।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের মতে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড়। বিশেষ করে স্বল্প পাল্লা আর মাঝারি পাল্লার। তারা আরও বলছে, ইরান স্পেস টেকনোলজি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে যাতে করে আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা যায়। তবে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ইরান স্থগিত করেছিলো ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির পর। বলছে রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইন্সটিটিউট। এটি আবার শুরু হয়ে যেতে পারে যে কোনো সময়ে।

সৌদি আরব ও উপসাগরীয় এলাকার অনেক টার্গেট ইরানের স্বল্প বা মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় আছে। বিশেষ করে ইসরায়েলে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলো। এছাড়া আরও প্রমাণ আছে যে তেহরানের আঞ্চলিক মিত্ররাও ইরানের সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও গাইডেন্স সিস্টেম ব্যবহার করে বিশেষ করে সৌদি আরব, ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের টার্গেটগুলোর ক্ষেত্রে। গত বছর মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র প্যাট্রিয়ট অ্যান্টি মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন করে মধ্যপ্রাচ্যে যা ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়।

কয়েক বছরের নিষেধাজ্ঞা সত্বেও ইরান তার ড্রোন সক্ষমতা বাড়িয়ে নিয়েছে। ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ২০১৬ সাল থেকেই ইরাকে ড্রোন ব্যবহার করে ইরান। ২০১৯ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ড্রোনকে ভূপাতিত করে তারা এই অভিযোগে যে ড্রোনটি ইরানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। এর বাইরে তারা ড্রোন প্রযুক্তি তাদের মিত্রদের কাছেও স্থানান্তর বা বিক্রিও করেছে, বলছেন বিবিসির প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সংবাদদাতা জোনাথন মার্কাস। ২০১৯ সালেই ড্রোন ও ক্ষেপনাস্ত্র আঘাত হেনেছিলো সৌদি তেল ক্ষেত্রে। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র এজন্য ইরানকেই দায়ী করেছিলো। যদিও তেহরান এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বরং তারা ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের দায় স্বীকারের দিকে ইঙ্গিত করেছে।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031