অবৈধভাবে বিদেশে টাকা পাচার করেছেন যুবলীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া । ওই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে তিনি বিদেশে নিয়ে যান। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের ‘কাসিকর্ন’ ব্যাংকের একটি শাখায় তার অন্তত ৪ কোটি টাকা রয়েছে। ২০১৭ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর তিনি ওই ব্যাংকে  অ্যাকাউন্ট খুলেন। ব্ল্যাক মেইলিং, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, তদবির, চাঁদাবাজির ভাগ নেয়াসহ অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ড করে ওই টাকা তিনি অর্জন করেন বলে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে স্বীকার করেছেন। তবে এ পর্যন্ত দেশের কোন ব্যাংকে রাখা তার বড় অংকের অর্থের কোন তথ্য মিলেনি জিজ্ঞাসাবাদে। টাকা পাচারে মতিঝিলের এক হুন্ডি ব্যবসায়ীর সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। দেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া ওই টাকা উদ্ধারের জন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইনান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটকে বিষয়টি অবহিত করেছেন।

তার বিরুদ্ধে যে মানি লন্ডারিং মামলা রয়েছে সেই মামলার আওতায় ওই টাকা পাচারের বিষয়টি তদন্ত চলছে। প্রত্যেক মাসে পাপিয়া তার দলবল নিয়ে প্রমোদ ভ্রমণে যেতেন ব্যাংককে। ব্যাংককের ‘পাকরেট’এলাকায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকতেন। গত ২২শে ফেব্রুয়ারি রাতে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে পাপিয়া ও তার স্বামীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১। রাজধানীর দুই থানায় তার নামে ৩ টি মামলা হয়েছে। ওই তিন মামলায় আদালত তাদের ১৫ দিনের রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন। মামলাটি বর্তমান তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (উত্তর)।  
র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল শাফী উল্লাহ বুলবুল মানবজমিনকে জানান, ‘পাপিয়া র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের ব্যাংকে টাকা পাচার করেছেন বলে স্বীকার করেছেন। এটা তদন্ত সাপেক্ষ ব্যাপার। আমরা বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করছি।’   
তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, পাপিয়া থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইউক্রেন, রাশিয়া, চায়না, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়াসহ অন্তত ১২ টি দেশে ঘুরতে গেছেন। তবে বেশি যাতায়াত করতেন ব্যাংককে। ব্যাংককে গেলে দুই সপ্তাহ ধরে থাকতেন। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কাছাকাছি থাকা ‘পাকরেট’ এলাকায় চুক্তিভিত্তিক ভাড়া করা বাসায় তিনি থাকতেন। চুক্তিতে ১৫ দিন ওই ফ্ল্যাটে থাকতে হলে তাকে দেয়া লাগতো বাংলাদেশী টাকাই প্রায় আড়াই লাখ টাকা।
সূত্র জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার বাংলাদেশের ব্যাংকে কোন টাকা নেই বলে জানিয়েছেন। বিদেশের ব্যাংকে কোন টাকা নেই বলে তিনি দাবি করলেও এক পর্যায়ে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন,‘ তার থাইল্যান্ডের একটি ব্যাংকে টাকা রয়েছে। ওই টাকা তিনি দেশ থেকে পাচার করেছেন।
সূত্র জানায়, পাপিয়া তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জানান যে, তাকে প্রায় সময় থাইল্যান্ডে যেতে হতো। সেখানে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি সহজ করা ও তার অবৈধ অর্থের নিরাপত্তার বিষয়টির চিন্তা থেকেই তিনি ওই দেশের ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন।
হুন্ডির মাধ্যমে পাপিয়ার দেশ থেকে টাকা পাচারের বিষয়টি দেখভাল করতেন তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া সাব্বির খন্দকার। তিনি বিষয়টি তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে স্বীকার করেছেন। পাপিয়া যতোবার থাইল্যান্ডে গেছেন তার সঙ্গি হয়েছিলেন সাব্বির খন্দকার।    
রাশিয়ান মডেলদের মাধ্যমে অর্থপাচার: এদিকে পাপিয়ার অর্থ পাচারের বিস্তর তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অবৈধভাবে কামানো টাকা থেকে পাপিয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছে এমন তথ্য এখন সিআইডির বিশেষ তদন্ত ও গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তাদের হাতে। রাশিয়া ও থাই মডেলদের মাধ্যমে পাপিয়া বিদেশে বিপুল পরিমান অর্থ পাচার করেছেন। এর বাইরে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার করেছেন পাপিয়া। প্রাথমিকভাবে তার সত্যতা পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে আরো ব্যাপক তথ্য প্রমান সংগ্রহের কাজ চলছে। আরো কিছু তথ্য প্রমান পেলেই শিগগির মানিলন্ডারিং আইনে সিআইডি বাদী হয়ে পাপিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করবে। সিআইডি ছাড়া পাপিয়ার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং  বাংলাদেশ ফিনানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। দুদক পাপিয়ার অবৈধ সম্পদের সন্ধান পেয়ে তদন্তে মাঠে নেমেছে। দুদকের পক্ষ থেকে তথ্য চেয়ে বিভিন্ন ব্যাংক ও হোটেল ওয়েস্টিনে চিঠি দেয়া হয়েছে। বিএফআইইউ পাপিয়ার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা, লেনদেন টাকা হস্তান্তর নিয়ে কাজ করছে।
সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, পাপিয়া গ্রেপ্তারের পরপরই অর্থ পাচারের বিষয়টি সামনে এসেছে। সতত্য যাচাই করতে সিআইডি খোঁজ-খবর নিতে শুরু করে। তারপর অর্থ পাচারের নানা তথ্য পাওয়া যায়। শুধু পাপিয়া নয় তার সঙ্গে আরো কয়েকজন জড়িত রয়েছেন। তাদের বিষয়েও খোঁজ নিচ্ছে সিআইডি। অনুসন্ধানে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন পাপিয়া ও তার স্বামী সুমনের দেশের বাইরে ব্যবসা বাণিজ্য রয়েছে। অনৈতিক কাজের জন্য বিভিন্ন সময় দেশের বাইরে থেকে মডেলদের নিয়ে আসতেন। পরে পাপিয়া বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের কাছে বিদেশী মডেল সরবরাহ করে বড় অংকের টাকা নিতো। আবার ওই মডেলদের মাধ্যমে অর্থ পাচার করেছে। বিদেশী মডেলদের মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টি যাচাই করার জন্য সিআইডি কর্মকর্তারা হোটেল ওয়েস্টিন কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চেয়েছেন। এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য পাপিয়ার ঘনিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে সিআইডি।
সিআইডির বিশেষ তদন্ত ও গোয়েন্দা শাখার ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, গত সপ্তাহ থেকে আমরা পাপিয়ার অর্থপাচারের বিষয়টি তদন্ত করছি। ইতিমধ্যে আমরা বেশ কিছু তথ্য প্রমাণ পেয়েছি। তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব নিকাষ সংগ্রহ করেছি। আরো কিছু তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। আশা করছি আগামী সপ্তাহের মধ্যে তার যাবতীয় তথ্য পেয়ে যাবো। তার পরেই সিআইডি বাদী হয়ে পাপিয়ার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলা করবে। কোন কোন দেশে অর্থ পাচার করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু কিছু দেশের তথ্য আমরা পেয়েছি। এখন তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখছি সঠিক কিনা। যদি সঠিক হয় তবে আমরা অ্যাকশনে যাবো। বিদেশী মডেলদের দিয়ে পাপিয়া অর্থ পাচার করেন এমন তথ্যের সত্যতা জানতে চাইলে সিআইডির অগ্রানাইজড ক্রাইমের এই ডিআইজি বলেন, বিষয়টি আমরাও শুনেছি। এখন নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমরা হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবো। এছাড়া পাপিয়ার কাছের মানুষ ও অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য চেয়েছি।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম মানবজমিনকে বলেন, পাপিয়ার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে আসা বিভিন্ন অভিযোগ আমরা যাচাই করে দেখছি।

Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031