বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, ভীষণ ছোঁয়াচে এই রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো “টেস্ট, টেস্ট ও টেস্ট। করোনাভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক নেই। ” সংস্থার মহাপরিচালকের পরামর্শ, প্রত্যেক সন্দেহভাজনকে পরীক্ষা করতে হবে। যদি কেউ পজিটিভ হন, তাহলে তার লক্ষণ দেখা দেওয়ার দুই দিন আগ পর্যন্ত তিনি কার কার সঙ্গে ছিলেন খুঁজে বের করতে হবে। তাদেরকে আইসোলেশনে নিতে হবে। তাদেরও পরীক্ষা করতে হবে। এভাবেই ভাইরাসকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে।
ডব্লিউএইচও প্রধান এমনি এমনি কথাগুলো বলেননি। এই তরিকায় সাফল্য পেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর ও জার্মানি।

রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে পেতে তারা প্রযুক্তির আশ্রয়ও নিয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশ কী হচ্ছে? সরকারের রোগতত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বলছে, বাংলাদেশে করোনা রোগী আছেন মাত্র ৪৮ জন। এই কথা বিশ্বাস করেন বাংলাদেশে এমন মানুষ খুব কম আছেন। শুধু বাংলাদেশের মানুষ কেন? যেই বিদেশীরা নিজ দেশে করোনার ব্যপক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও হুড়মুড় করে বিমান ভাড়া করে রীতিমতো পালিয়ে গেলেন, তারাও নিশ্চয়ই এই সংখ্যায় আস্থা রাখতে পারেননি। পারলে থেকে যেতেন।
অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম প্রধান সংবাদপত্র দ্য অস্ট্রেলিয়ানে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ ও ডব্লিউএইচও মনে করছে, এই করোনাভাইরাসে বাংলাদেশে বহু মানুষ মারা যেতে পারে, যদি সরকার কোনো পদক্ষেপ না নেয়। জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ ওই স্মারকেও বলা হয়েছে, ‘কভিড-১৯ রোগীদের প্রকৃত সংখ্যা অজ্ঞাত। তবে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন, মৌখিক প্রমাণ ও মডেলিং পূর্ভাবাস অনুযায়ী, এই সংখ্যা অনেক বেশি হবে বলেই অনুমান।’
আরেকটি পরিসংখ্যান থেকেও বিষয়টি বোঝা যায়। বাংলাদেশে এই রোগের মৃত্যু হার ১১ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ, বাংলাদেশেই এই রোগ সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী। বিশ্বব্যাপী করোনা থেকে মৃত্যুর গড় হার হচ্ছে ৪.৪ শতাংশ। সেই হিসাবে, ৫ মৃত্যুর বিপরীতে বাংলাদেশে ২৬ মার্চ নাগাদ আক্রান্তের সংখ্যা হওয়ার কথা ছিল ১১৩ জন। অর্থাৎ, এমনটা হওয়া খুবই সম্ভব যে আক্রান্ত অনেকেরই পরীক্ষা করা হয়নি।
কেন এমনটি হচ্ছে?
একটি কারণ হলো যে, মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ আইইডিসিআর’কেই পরীক্ষা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ২৯ মার্চ নাগাদ, তারা ৭০ হাজারেরও বেশি কল পেয়েছেন। কয়টি ধরতে পেরেছেন, তা জানা যায়নি। তবে পরীক্ষা করা হয়েছে মাত্র ১১০০ জনের। অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মৃত্যুহারের দেশে পরীক্ষা করার হার বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন!
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি কৌতুক খুব জনপ্রিয় হয়েছে। আফ্রিকার এক দেশে নাকি এখনও করোনা পৌঁছায়ইনি। তো ওই দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাদের এই সাফল্যের রহস্য কী? আলাভোলা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অকপট উত্তর: “খুব সহজ! আমাদের হাতে কোনো কিটই নেই!” অর্থাৎ, পরীক্ষাই যদি না করা হয়, তাহলে রোগী পাওয়া যাবে কীভাবে! অপর্যাপ্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।
আইসিসিডিআর,বি সহ বহু সরকারী বেসরকারী হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও অনুজীব গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এই পরীক্ষা করার ব্যবস্থা ছিল বা ব্যবস্থা করা যেত। কিন্তু সরকার এতদিন অনুমতি দেয়নি। কেন? কিসের ভয়? যেই আইইসিডিআর,বি থেকে শ’ শ’ কিট ধার নিয়ে আইইডিসিআর পরীক্ষা করেছে প্রথম দিকে, সেই আইসিসিডিআর,বি’কেই পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়নি! খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানটি কয়েক সপ্তাহ আগে প্রস্তাব দিয়ে অনুমোদন পেয়েছে ২৮ তারিখ। কিন্তু কিট দেওয়া হয়েছে মাত্র ১০০টি! অথচ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন তাদের হাতে ৯২ হাজার কিট রয়েছে! অন্য আরও যেসব মেডিকেল কলেজ ও প্রতিষ্ঠানকে সম্প্রতি পরীক্ষা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তাদের সকলকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ২০ হাজার কিট।
এখনও দিনে মাত্র মাত্র ৯০-১০০ টির মতো টেস্ট করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কম্যুনিটি সংক্রমণ না থাকার দোহাই দিয়ে, শুধুমাত্র বিদেশ ফেরতদের সঙ্গে সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের টেস্ট করানো হয়েছে। শুধু হটলাইনেই বলে দেওয়া হচ্ছে কার করোনা আছে, কার নেই। বিদেশ ফেরত বা করোনা আক্রান্ত কারও সংস্পর্শে না এসে থাকলে, এখনও টেস্ট করানো হচ্ছে না। অথচ, করোনা সংক্রমণের সবচেয়ে বড় কারণ হলো লক্ষণহীন জীবাণুবাহী লোকজন। ফলে একজন ব্যক্তির পক্ষে জানা সম্ভব নয় তিনি করোনা আক্রান্ত কারও সংস্পর্শে এসেছেন কিনা।
আবার এত কিটের কথা যে বলা হচ্ছে, সেগুলোর অনেকগুলোই সম্ভবত চীন থেকে আসা কিট। কিন্তু সরকার কি খবর রাখছে যে, স্পেন, চেক রিপাবলিক, নেদারল্যান্ড ও তুরস্ক চীনে উৎপাদিত অনেক কিট অকার্যকর হওয়ায় ফেরত দিচ্ছে? এসব কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষা কি করা হয়েছে?
একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, রোববার রাত থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত সর্দি-কাশি অর্থাৎ করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৩ জন। তাদের অনেককেই করোনা সন্দেহে আগে থেকেই আইসোলেশনে রাখা হয়েছিল।
আরও পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। গত ৪ বছরের তুলনায় এ বছর ফেব্রুয়ারি ও মার্চে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বেশি দেখা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যেখানে সাড়ে ৪ হাজার মানুষ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভর্তি হয়েছেন প্রায় ২৫ হাজার রোগী! গত বছরের ১৫ মার্চ নাগাদ ভর্তি হয়েছিলেন মাত্র ৮২০ জন। এ বছরের ১৫ মার্চ নাগাদ ভর্তি হয়েছেন ১২ হাজার রোগী! এসব কিসের আলামত?
টেস্টের পাশাপাশি এই ভাইরাসের গতি রুখতে প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ (suppression) ও প্রশমন (mitigation) কৌশল। স্কুল-কলেজ ও পাবলিক প্লেস বন্ধ, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা, ইত্যাদি এই কৌশলের অন্তর্ভুক্ত। সরকার সেই লক্ষ্যেই সারা দেশে সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট বন্ধ রেখেছে ১০ দিন। ভালো উদ্যোগ নিঃসন্দেহে। কিন্তু জনপরিবহণ খোলা ছিল ২ দিন। ফলে ‘ছুটির আমেজে’ ঢাকা থেকে মানুষের স্রোত বের হয়ে গেছে। একটি জাতীয় দৈনিকের হিসাব মতে, ছুটি ঘোষণার পর ১ কোটি ১০ লাখ মোবাইল ব্যবহারকারী ঢাকা থেকে হাওয়া হয়ে গেছেন। জাতিসংঘের ওই স্মারকে বলা হয়েছে, এর ফলে ঢাকা থেকে চাপ কমেছে বটে, কিন্তু সারাদেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও সৃষ্টি হয়েছে। ওই ২ দিনে বাস, ট্রেন আর লঞ্চে মানুষ ঈদের মতো গাদাগাদি করে বাড়ি গেছেন। এদের মধ্যে যদি ডজন খানেকও থাকেন যিনি করোনা আক্রান্ত, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
বাতাসে গুঞ্জন যে, কয়েকদিনের বিরতি দিয়ে লকডাউন আবার দেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত হবে আগের সিদ্ধান্তের চেয়েও প্রচণ্ড আত্মঘাতী। এই বিরতিতে যদি অফিস-আদালত কয়েকদিনের জন্য হলেও চালু হয়, ফের ঢাকায় ফিরবে প্রচুর মানুষ। আবার লকডাউন দেওয়া হলে, বাড়িতে যাবে তারা। এর মধ্যেই মানুষজন রোগ বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে, অফিসে কিংবা গ্রামের বাড়িতে জীবাণু আনা-নেওয়া করবেন! অতএব, সাধু সাবধান!

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031