তরুণ এই চিকিৎসক পাকিস্তানি পাসপোর্ট ছিড়ে ফেলে নিজেকে প্রথম রাষ্ট্রহীন নাগরিকে পরিণত করেন । বিলেতে যখন এফআরসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ঠিক তখনই শুরু হয় দেশে মুক্তিযুদ্ধ। এরপর দেশে এসে যোগ দেন মুক্তি সংগ্রামে। ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজেকে যুক্ত করে স্বাধীন দেশের পূর্ণগঠনের কাজে। তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। নামমাত্র অর্থে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ও শিক্ষা সেবা দিয়ে তিনি তৈরি করেছেন অন্যন্য নজির। বিশ্বব্যাপি করোনা ভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করায় দেশবাসীর সেবার ব্রত নিয়ে আবার সামনে এসেছেন এই চিকিৎসক।

তিনি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি। প্রথমে করোনা শনাক্তের কিট তৈরির প্রস্তাবনা নিয়ে সামনে আসেন তিনি। নিজ প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীকে নিয়ে এই কিট তৈরির প্রস্তাবনা দেন। কিট প্রস্তুতের প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই চলমান অঘোষিত লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র মানুষের খাদ্য সহায়তার বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন তিনি। করোনা পরিস্থিতিতে নিজের উদ্যোগের বিষয়ে একান্তে কথা বলেছেন মানবজমিন এর সঙ্গে।

তিনি জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখতে পেরে তিনি গর্বিত। এখন দ্বিতীয় সুযোগ এসেছে দেশবাসীর জন্য কিছু করার। করোনা শনাক্তে কিট তৈরির অগ্রগতি কতটুকু জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামী ৬ই এপ্রিল একটি ফ্লাইটে কিট তৈরির উপাদান আসার কথা। এই দিন যদি আমাদের কিটের উপাদান আসে তাহলে ১৫ই এপ্রিলের আগেই আমরা নমুনা তৈরি করতে পারব। কিট তৈরির উপাদান অরিজিনালি আসার কথা ছিল ইংল্যান্ড থেকে। ইংল্যান্ডের কোন ফ্লাইট না থাকায় আমরা বাধ্য হয়ে চীন থেকে কিট তৈরির উপাদান আনছি। চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাহাবুবুজ্জামান এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব উপাদান আনার ক্ষেত্রে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমরা আশা করছি এ সপ্তাহের মধ্যেই আমাদের হাতেই উপাদানগুলো এসে পৌঁছাবে। এর পরের সপ্তাহে আমরা সবার সামনে একটা নমুনা দিতে পারব। তিনি বলেন, করোনার ভয়াবহতা এখন বিশ্ব দেখছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা পরীক্ষায় জোর দিয়েছে। যতো বেশি পরীক্ষা হবে ততো মানুষকে নিরাপদ রাখা যাবে। শুরুতে আমাদের পরীক্ষা কিটের সংকট ছিল। এ কারণে কিট তৈরির চিন্তা মাথায় আসে। কিট প্রস্তুত করে বাজারে দিতে পারলে এই কিট দিয়ে ৫ থেকে পনের মিনিটের মধ্যে করোনা পরীক্ষা করা যাবে।

অসহায় মানুষের খাদ্য সহায়তার বিষয়ে তিনি বলেন, দুইটা বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটা সামাজিক দূরত্ব, আরেকটি সামাজিক বৈষম্য। এই মুহুর্তে সামাজিক দূরত্বটা বজায় রাখতে বলা হচ্ছে। এটা করতেই হবে। তবে সামাজিক বৈষম্যটা কাঙ্খিত না। সামাজিক বৈষম্যটা মেনে নেয়া যায়না। তাই সরকারের উচিত হবে এক কোটি দারিদ্র পরিবারকে খাবার দেয়া। এতে মাত্র সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। আমরা তার একটা উদাহরণ হিসেবে কালকে দেখালাম যে, আমরা এক হাজার অসহায় পরিবারকে খাবার দিয়ে শুরু করেছি। ভবিষ্যতে আমরা এক লাখ মানুষের খাবার দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা গণমাধ্যম এবং সবার মাধ্যমে আবেদন জানাচ্ছি আপনারা আমাদের সহযোগিতা করুন। এতে করে কোন অসহায় পরিবারকে আর বাইরে আসতে হবে না। তারা বাড়ি থেকে খাবার সংগ্রহ করতে পারবে। আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার পৌঁছে দেব।

তিনি বলেন, দেশের জন্য কোন কিছু করতে পারা সত্যিই আনন্দের ব্যাপার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমি অবদান রাখতে পেরেছি এটা মনে হলে প্রায় সময় গর্বে বুকটা ভরে ওঠে। আর এখন দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে যদি দেশ ও জাতির জন্য কিছুটা অবদান রাখতে পারি তাহলে বিষয়টা সত্যিই অনেক আনন্দ দেবে। তিনি বলেন, সরকারের উচিৎ সর্বদলীয় কমিটি গঠন করা। জাতির এ সংকটময় মুহূর্তে আমরা কেউ আলাদা না, আমরা সবাই এক। আর সরকার এ পর্যন্ত যা যা পদক্ষেপ নিয়েছে, তা অপর্যাপ্ত। তারা এখন পর্যন্ত যথাযথ গুরুত্বটা বুঝতে পারছে কিনা জানি না। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে চিকিৎসকদেও বড় ভূমিকা পালনের আহবান জানিয়ে ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, ডাক্তারদের সাহসী হতে হবে। আমি এখান থেকে খবর পাচ্ছি বা কয়েকটা ঘটনা ঘটলো যে ডাক্তার রোগী ফেলে পালিয়ে যাচ্ছেন। ভয় না করে তাদেরকে ঘনঘন হাত ধুতে হবে। সুরক্ষা সামগ্রি ব্যবহার করতে হবে।

Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031