৮৪ লাখ বাসিন্দার এই নগরীতে এক লাখেরও বেশি মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। এখানেও সূর্য ওঠে। আগের মতোই সোনালী রোদে ঝলমলিয়ে ওঠে এখনকার প্রকৃতি। তবুও দুনিয়ার রাজধানীখ্যাত নিউ ইয়র্কের জনজীবনের অন্ধকারটা যেন কাটছেই না। এরমধ্যে বেশির ভাগ মানুষ নিজেদের ঘরেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন দুধর্ষ এ ভাইরাসের সঙ্গে। অনেকেই আছেন হাসপাতালে। মৃত্যুবরণ করেছেন কয়েক হাজার। দিন যত যাচ্ছে ততোই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।

হঠাৎ আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে প্রতিমুহুর্তে আতংকে এই নগরীর প্রতিটি মানুষ। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার সরকারি নির্দেশনায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে নগরীর বেশির ভাগ মানুষ ঘরবন্দী। আর তাতেই পুরোপুরি অচেনা হয়ে পড়েছে জগতের ব্যস্ততম এই নগর।
৫টি বোরো বা অঞ্চল নিয়ে গঠিত নিউ ইয়র্ক সিটির মূল অংশ ম্যানহাটন। চারদিকে নদী বেষ্টিত ৩৪ বর্গমাইল আয়তনের এই দ্বীপকে ঘিরেই মূলত নিউ ইয়র্কের বেশির ভাগ কর্মকান্ড। বাকি চারটি বোরো বা অঞ্চল হলো ম্যানহাটনের পূর্ব ও পূর্ব-দক্ষিণ দিকে কুইন্স, দক্ষিন ও দক্ষিন-পূর্ব দিকে ব্রুকলিন, উত্তরে ব্্েরাঙ্কস এবং দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে স্ট্যাটেন আইল্যান্ড। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষের বসবাস ব্রুকলিন বোরোতে। দ্বিতীয় সর্বাধিক মানুষের বসবাস কুইন্সে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যানহাটন বোরো জনসংখ্যার দিক দিয়ে তৃতীয় স্থানে। জনসংখ্যা যা-ই হোকনা কেন গুরুত্বের দিক দিয়ে কেবল নিউ ইয়র্ক বা যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, সমগ্র দুনিয়াতেই ম্যানহটনের উচ্চতা অতুলনীয়। জাতিসংঘ সদর দফতর, বিশ্বখ্যাত টাইমস স্কোয়ার, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, অ্যাম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং থেকে শুরু করে দুনিয়ার তাবত বড় বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় এখানে। স্বাভাবিক কারণেই দিনরাত ২৪ ঘন্টা জেগে থাকা ম্যানহাটন লাখো মানুষের পদভারে মুখরিত থাকে বছরের ৩৬৫ দিন।
কিন্তু সেই ম্যানহাটনের এ কি চেহারা! স্বাভাবিক সময়ে সপ্তাহের পাঁচ-কর্মদিবসেই ম্যানহটনের প্রতিটি রাস্তা ছিল যানবাহনে ঠাসা। আর ফুটপাতগুলো সাতদিনই পূর্ণ থাকতো পথচারিদের বিরামহীন চলাচলে। কিন্তু আজ সেই ম্যানহাটনের সুপ্রশস্ত এভিনিউ এবং স্ট্রিটগুলো প্রায় ফাঁকা।  ফুটপাতগুলোও যেন অবসর নিয়েছে কিংবা ছুটিতে আছে। আর দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর ভিড় থাকে যে টাইম স্কোয়ারে সেখানকার দৃশ্যপট এখন সত্যিই খুব মন খারাপ করার মতো। একই অবস্থা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষন ওয়র্ল্ড ট্রেড সেন্টার, ব্যাটারি পার্ক, ডাউনটাউন, ওয়েস্টসাইড, সাউথ স্ট্রিট, চায়না টাউন, ওয়েস্ট ভিলেজ, ওয়াল স্ট্রিট, চেলসি প্রভৃতি এলাকারও। বিখ্যাত ব্রডওয়ে থিয়েটার শো’র প্রতিটি হল, বিনোদনের সকল ক্লাব বন্ধ। খুলছে না বৃহৎ শপিং মল ও ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোও। ফিফথ এভেনিউর বড় বড় ফ্ল্যাগশিপ স্টোরগুলোরও দরজা আটকানো। খাঁ খাঁ করছেন এখানকার বড় বড় হোটেলগুলো। টানা একমাসেরও বেশি সময় ধরে মানুষের দেখা না পেয়ে বিখ্যাত সেন্ট্রাল পার্কের গাছগুলোও যেন বড় ক্লান্ত।
বাংলাদেশের চাঁদপুরের মানুষ মেসবাউল তালুকদার বাবলু ম্যানহাটনে টাইমস স্কোয়ারের খুব কাছেই বসবাস করেন বিগত প্রায় ৪০ বছর। এক সময় যুক্ত ছিলেন সাংবাদিকতার সঙ্গে। মূলধারার একটি নামকরা টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে সাংবাদিকতা ছেড়ে শুরু করেন রেস্তোঁরা ব্যবসা। টাইমস স্কোয়ারের আশপাশেই তাঁর একাধিক রেস্তোঁরা। নবম এভিনিউ ও ৫১ স্ট্রিটের সংযোগ স্থলে বিখ্যাত  আফগান কাবাব হাউসের মালিকও তিনিই। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে মেসবাউল তালুকদার বললেন, ম্যানহাটনের এমন করুন চেহারা গত ৪০ বছরে কখনও দেখা দূরের কথা, কল্পনাও করতে পারিনি। যানবাহনশূন্য এভিনিউ আর পথচারিশূন্য ফুটপাতগুলোর দিকে তাকালে কান্না চলে আসে। তিনি বলেন, আফগান কাবাব হাউস থেকে মাত্র তিন ব্লক দূরে আমার এপার্টমেন্ট। সাধারণত একটু বেশি রাতেই বাসায় ফিরি। স্বাভাবিক সময়ে এই পথটুকু দিনেরাতে যেকোনো সময় অগণিত মানুষের ভিড় ঠেলেই যেতে হতো। কিন্তু এই করোনাকালে রাতের বেলায় এইটুকু পথ পাড়ি দিতে ভয়ে গা ছমছম করে উঠে। হঠাৎ কোনো অ্যাম্বুলেন্স কিংবা সেনাবাহিনীর গাড়ি ছাড়া আর কিছুরই দেখা মেলে না। এ যেন পুরোপুরিই অচেনা এক শহর।
ঘরবন্দী থাকতে থাকতে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন কুইন্সের বাসিন্দা সাংবাদিক ও ইউটিউবার সাহেদ আলম। আর তাই মনের অবসাদ কাটাতে গাড়ি চালিয়ে সোজা চলে গেলেন ম্যানহাটনে। সেখান থেকে টেলিফোনে জানালেন খুবই মন খারাপ করা দৃশ্যের কথা। বললেন, স্বাভাবিক সময়ে এই শহরকে যারা নিয়মিত দেখেছেন বর্তমানের দশা দেখলে তাদের চোখে পানি চলে আসতে পারে। ম্যানহাটনের সুউচ্চ অট্ট্রালিকাগুলোর বাসিন্দারাও অতিজরুরী প্রয়োজন ছাড়া নিচে নামছেন না। সন্ধ্যা নামতেই এখানকার এভেনিউ এবং স্ট্রিটগুলোর ভূতুড়ে চেহারা হয়ে যায়। সবমিলিয়ে এ যেন সত্যিই এক অচেনা শহর। ঠিক কবে নাগাদ নিজের পুরোনো চেহারা ফিরে পাবে ম্যানহাটন, কিংবা আদৌ আর কোনোদিন সেই জৌলুস ফিরে পাবে কিনা কিংবদন্তীতূল্য এই নগরী সেই প্রশ্নের জবাব যেন এই মুহুর্তে কারোরই জানা নেই।

Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031