মঙ্গলবার বিকেলে বাড়ি ফেরার তাগিদে কয়েক হাজার লোক জড়ো হয়ে গেলেন। ভারতের মুম্বাইয়ের বান্দ্রা রেলস্টেশন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘন্টা কয়েক আগে লকডাউনের সময়সীমা ৩ মে পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তারপরে হতাশ মানুষরা মরিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন।
তারা সকলেই পরিযায়ী শ্রমিক। কেউ বিহার, কেউ উত্তর প্রদেশ, কেউ মধ্যপ্রদেশ বা অন্য রাজ্য থেকে এসেছিলেন ভারতের আর্থিক রাজধানীতে রুটি-রুজির আশায়। হঠাৎ লকডাউন ঘোষণা করার ফলে তারা আটকে পড়েছিলেন মুম্বাইতে। মার্চ শেষ। এপ্রিল আসতেই বাড়ির মালিক ভাড়া চাইছেন। অনেকে চলে গিয়েছেন সরকারি আশ্রয়ে। অনেকে শেষ সম্বলটুকু নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে লড়ছেন। বাড়ি থেকে সমানে ফোন আসছে, সেখানেও পরিবারের কাছে খাবার নেই। কোথাও পারিবারিক ঝগড়ায় বিপর্যস্ত হচ্ছেন তারা।
এই কারণে সম্প্রতি পাঞ্জাবে একজন শ্রমিক আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুরে কেউ রটিয়ে দেয় বান্দ্রা স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়বে। চরম বিপদের মধ্যে থাকা মানুষেরা করোনা সংক্রমণের ভয়, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ, লকডাউনের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে বান্দ্রা স্টেশনে জড়ো হয়ে যান। খবর ডয়চে ভেলের।
অন্য একটা কারণের কথাও বলা হচ্ছে। সেটা হলো, পরিযায়ী শ্রমিকদের আশা ছিল, প্রধানমন্ত্রী ১৫ এপ্রিল থেকে লকডাউন শিথিল করে দেবেন, তাদের ঘরে ফেরার পথ পরিস্কার হবে। কিন্তু ৩ মে পর্যন্ত লকডাউনের সময় বেড়ে যাওয়ায় তারা হতাশ হয়ে পড়েন। তারা মরিয়া হয়ে ঘরে ফেরার চেষ্টা করেন। সেই সঙ্গে ট্রেন চালুর গুজবও ছিল। সব মিলিয়ে তারা স্টেশনে চলে আসেন।
প্রথমে পুলিশ ও প্রশাসন তাদের চলে যেতে বলে। তাদের বারবার জানানো হয়, কোনো ট্রেন দেওয়া হচ্ছে না। লকডাউন যতদিন চলবে, ততদিন ট্রেন বা বাস চলবে না। তা সত্ত্বেও তারা যেতে রাজি হননি। তখন পুলিশ লাঠি চালিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। এরপরেও কুরলায় বিনয় দুবে নামে একজন হুমকি দিয়েছিলেন, ১৮ এপ্রিলের মধ্যে শ্রমিকদের ঘরে ফেরার ব্যবস্থা না করলে তিনিও বান্দ্রা স্টেশন অভিযান করবেন। তাকেও পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
এই পুরো ঘটনা থেকে পরিযায়ী শ্রমিকের ভয়াবহ সমস্যা আবার সামনে এলো। লকডাউন হওয়ার পর পায়ে হেঁটে নিজেদের বাড়ি ফিরতে গিয়ে পথেই অন্তত ২০ জন শ্রমিক মারা গিয়েছেন। উত্তর প্রদেশ সরকার পাঁচশোটি বাসের ব্যবস্থা করার পর দিল্লিতে শ্রমিকদের ঢল নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এই শ্রমিকরা আটকে পড়েছেন। মুম্বাইয়ে ৬ লাখ লোক সরকারি শিবিরে আছেন। পশ্চিমবঙ্গে তিন লাখ পরিযায়ী শ্রমিকের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা রাজ্য সরকার করেছে। সরকারি আশ্রয়ের বাইরেও প্রচুর শ্রমিক আছেন। মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে অবশ্য অভয় দিয়ে বলেছেন, সকলের জন্য আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা হবে।
লকডাউনেরসময় বৃদ্ধির পরেই সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী এই শ্রমিকদের দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করলেন না। তিনি শুধু সহজ কাজটা করলেন, লকডাউনের সময় বাড়ানো এবং পুলিশ দিয়ে নজরদারি করা।’
দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা ও রাজনীতিক কমল হাসান তো একটা নতুন শব্দবন্ধ তৈরি করে ফেলেছেন, ‘ব্যালকনি পলিটিক্স’। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষকে শুধু ব্যালকনি থেকে হাত নেড়ে, ভাষণ দিয়ে রাজনীতি করা।
মুম্বাইয়ের এই ঘটনার পরই তা নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ শুরু হয়ে যায়। দেশের কোথাও বিরোধীরা এখন মুখ খুললেই বিজেপি নেতারা বলতে থাকেন, সংকট সময়ে রাজনীতি করা হচ্ছে। সেই বিজেপি নেতারাই মহারাষ্ট্র সরকারের সমালোচনায় মুখর হন। তার জবাবে মুখ্যমন্ত্রী-পুত্র আদিত্য ঠাকরে সব দোষ কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপিয়ে দেন। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের মধ্যে মহারাষ্ট্রেই সবচেয়ে বেশি করোনা হচ্ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও সর্বাধিক।
তবে গুজরাটের অবস্থাও চিন্তাজনক। সেখানে কংগ্রেসের এক বিধায়ক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তার রিপোর্ট আসার কিছুক্ষণ আগেও তিনি মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপানি ও অন্য মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
