প্রখ্যাত বৃটিশ গোয়েন্দা ঔপন্যাসিক ডেভিড কর্নওয়েল ৮৯ বছর বয়সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন । জন লা কারে ছদ্মনামের আড়ালে ‘টিঙ্কার টেইলর সোলজার স্পাই’, ‘দ্য স্পাই হু কেইম ইন ফ্রম দ্য কোল্ড’ ও ‘দ্যা নাইট ম্যানেজার’-এর মতো শীতল যুদ্ধ ঘিরে লেখা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত কয়েক ডজন গোয়েন্দা উপন্যাস রচনা করেছেন তিনি।
শীতল যুদ্ধের সময় এমআই-৬ সহ বিভিন্ন বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করেছিলেন কর্নওয়েল। সেসব অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নিজের গোয়েন্দা উপন্যাসগুলো লিখেন তিনি। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তার লেখাগুলোর সঙ্গে বাস্তব দুনিয়ার গোয়েন্দাগিরির মিল টানা নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন।
কর্নওয়েলের সৃষ্ট সবচেয়ে পরিচিত গোয়েন্দা চরিত্র হচ্ছে ‘টিঙ্কার টেইলর সোলজার স্পাই’-এর গোয়েন্দা জর্জ স্মাইলি। পরবর্তীতে বইটি অবলম্বনে টিভি সিরিজ নির্মিত হলে স্মাইলি চরিত্রটি আরও বিখ্যাত হয়ে ওঠে।
কর্নওয়েলের জন্ম ১৯৩১ সালে, ইংল্যান্ডের পুল শহরে। পড়াশোনা করেন সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব বার্নে। সেখানে জার্মান স্টাডিজ  নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি।

পরবর্তীতে অক্সফোর্ডে পড়াশোনা শেষ করে ইটন ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন। এরপর শুরু হয় তার গোয়েন্দা জীবন। জার্মানির বন শহরে বৃটিশ দূতাবাসের একজন জুনিয়র কূটনীতিকের আড়ালে গোয়েন্দাগিরি করেন তিনি।
১৯৬১ সালে ছদ্মনামে লেখা ‘কল ফর দ্য ডেড’ নামে তার প্রথম থ্রিলার প্রকাশ হয়। দুই বছর পর প্রকাশ হয় ‘দ্য স্পাই হু কেম ইন ফ্রম দ্য কোল্ড’। এই বই দিয়েই আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন কর্নওয়েল। এরপর গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দিয়ে পুরোদমে লেখায় মনোনিবেশ করেন তিনি।
কর্নওয়েল পরবর্তীতে জানান, তার লেখাগুলো বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থার অনুমোদন নিয়েই প্রকাশ করা হয়। তাদের মতে, উপন্যাসগুলোর সম্পূর্ণই কাল্পনিক ও সেগুলো প্রকাশে কোনো নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ ছিল না। কিন্তু গণমাধ্যম উপন্যাসগুলোকে উপস্থাপন করে ভিন্নভাবে। তারা উপন্যাসগুলোকে কেবল সত্য ঘটনা হিসেবেই তুলে ধরেনি, এর পাশাপাশি গোয়েন্দা জগত থেকে এক ধরনের বার্তা হিসেবেও ফুটিয়ে তোলে। ২০১৩ সালে দ্য গার্ডিয়ানে লেখা এক নিবন্ধে কর্নওয়েল লিখেন, নিজের উপন্যাসগুলোকে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইয়ের তালিকায় দেখে তার মধ্যে ক্ষোভ জন্মেছিল।
তিনি লিখেন, আমি ক্ষুব্ধ, কারণ আমার উপন্যাস প্রকাশ হওয়ার দিন থেকেই আমি টের পাচ্ছিলাম যে, এখন থেকে অনন্তকাল অবধি আমাকে দেখা হবে গোয়েন্দা থেকে লেখক হওয়া মানুষ হিসেবে; একজন লেখক হিসেবে নয়, যিনি এমন আরও হাজারো লেখকের মতো গোয়েন্দাগিরি নিয়ে লিখেছেন।
জীবদ্দশায় সাহিত্যিক সম্মাননা ও নাইট হওয়ার সুযোগ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন কর্নওয়েল। ২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে এই লেখক জানান, সাহিত্যিক দুনিয়া নিয়ে এতটাই সন্দিহান তিনি যে, এ দুনিয়ার কোনো সম্মাননা তিনি চান না। তিনি আরও বলেন, আর আমি যেটা একেবারেই চাই না, সেটা হচ্ছে আমাকে কেউ বৃটিশ সাম্রাজ্যের কমান্ডার বা এমনকিছু ডাকুক। এতে আমার বমিভাব হয়।
সিক্সটি মিনিটসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি এমন কেউ হতে চাই না, যাকে রাষ্ট্র থেকে সম্মাননা দেয়া হয়েছে ও এজন্য তাকে রাষ্ট্রের সাথে কোনোভাবে মানিয়ে চলতে হবে। আমি সেই বর্ম চাই না। নিজেকে একজন ‘ইংলিশম্যান’ মনে করেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে কর্নওয়েল বলেন, অবশ্যই। আমি জন্মেছি ও বড় হয়ে উঠেছি একজন ইংলিশ হিসেবে। আমি মজ্জাগতভাবে একজন ইংলিশ।
কর্নওয়েল ব্রেক্সিট-বিরোধী ছিলেন। তার ভাষায়, আমার ইংল্যান্ড ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে (ইইউ) নিজের জায়গাকে স্বীকৃতি দেবে। যেই ইংল্যান্ড ইইউ থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে, আমি সেই ইংল্যান্ডকে চিনি না। কর্নওয়েলের কিছু উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্য টেইলর অব পানামা, দ্য কনস্ট্যান্ট গার্ডেনার ও টিঙ্কার টেইলর সোলজার স্পাই। ১৯৭২ সালে জেন ইউস্টাসকে বিয়ে করেন কর্নওয়েল। এই দম্পতি মোট চার পুত্রের জনক-জননী হয়েছেন।

Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031