ইসরাইল ও মরক্কো প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে । তবে এতদিন আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক না থাকলেও দেশ দুটির মধ্যে গোপন সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার সম্পর্ক ছিল প্রায় ছয় দশক ধরে। অবশ্য কোনো দেশের কর্মকর্তাই তা স্বীকার করেন না। গোপন নথিপত্র ও বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকারের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এমনটি জানিয়েছে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।
ইসরাইলের খ্যাতনামা সাংবাদিক রনেন বার্গম্যানের করা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, মরক্কোকে অস্ত্র ও গোয়েন্দা সরঞ্জাম জোগাড় করতে সহায়তা করেছে ইসরাইল। সেসব সরঞ্জাম ব্যবহার করতে শিখিয়েছে তাদের। এমনকি একজন বিরোধীদলীয় নেতাকে খুন করতেও মরক্কো সরকারকে সহায়তা করেছে ইসরাইল। অন্যদিকে, মরক্কো থেকে ইহুদি নাগরিকদের ইসরাইলে সরিয়ে নিতে সহায়তা করেছে দেশটির সরকার। এছাড়াও ওসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধে একটি অভিযানেও পরস্পরকে সসহায়তা করেছে তারা।
এমনকি খোদ আরব রাষ্ট্রগুলোর উপর ইসরাইলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তিও চালিয়েছিল মরক্কো।
দুই দেশের মধ্যকার এই সহযোগিতা আরব সরকারগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের গোপন সম্পর্ক গড়ে তোলার পুরনো নীতিমালাকে ফুটিয়ে তোলে। অভিন্ন লক্ষ্য, শত্রুর উপর ভিত্তি করে এসব সম্পর্ক গড়ে উঠে। ইসরাইলি-আরব ভূখণ্ড সম্পর্কিত বিরোধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, এমন দূরবর্তী রাষ্ট্র; কিংবা অভিন্ন শত্রু রাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে যেসব দেশের, তাদের সঙ্গে ইসরাইল এই ধরণের গোপন সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
ইসরাইল-মরোক্কো সম্পর্ক তৈরির পেছনে আংশিক ভূমিকা রেখেছিল মরোক্কো বড় ইহুদি জনসংখ্যা। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পরপর দেশটিতে অভিবাসন করে তাদের অনেকে। ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ এই মরোক্কান ইহুদী। ইসরাইলের বর্তমান জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১০ লাখই হয়তো মরোক্কো থেকে অভিবাসনকারী বা তাদের উত্তরসূরী। এই জনসংখ্যা দেশ দুটির মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।
১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ইহুদিদের অভিবাসন নিষিদ্ধ করে দেয় মরোক্কো। এরপর কয়েক বছর দেশটি থেকে অবৈধভাবে ইহুদীদের বের করে নেয় ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। কিন্তু ১৯৬১ সালে এমন এক অভিযানের সময় মরোক্কান ইহুদিভর্তি একটি জাহাজ ডুবে তাতে থাকা বেশিরভাগ আরোহী মারা গেলে মোসাদের পাচার অভিযান ফাঁস হয়ে যায়।
ওই ঘটনার পরের মাসে মরোক্কোতে ক্ষমতায় আসেন নতুন বাদশাহ হাসান দ্বিতীয়। তাকে বেশ সফলভাবে বশ করে ইসরাইল। দেশটির বিরোধী নেতা মেহেদি বেন বারকার সঙ্গে মিলে হাসানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পরিকল্পনা করে ইসরাইলি গোয়েন্দারা। পরবর্তীতে তা না করে, হাসানের কাছে পুরো পরিকল্পনা ফাঁস করে দেয় ইসরাইলিরা।
এ ঘটনার পর ইহুদিদের ফের গণহারে অভিবাসনের অনুমোদন দেন হাসান। এছাড়া মোসাদকে মরোক্কোতে একটি ঘাঁটি স্থাপনেরও অনুমোদন দেন তিনি। এর পরিবর্তে মরোক্কানদের অস্ত্র সরবরাহ ও সেগুলো ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেয় ইসরাইল। তারা মরোক্কানদের নজরদারি সরঞ্জাম সরবরাহ করে, দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা গঠনে সহায়তা করে ও দুই দেশ এরপর থেকে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় শুরু করে। শুরু হয় তাদের মধ্যে সহযোগিতার যুগ। এ সহযোগিতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল ১৯৬৫ সালে। তখন আরব নেতা ও সামরিক কমান্ডাররা মরোক্কোর বন্দর শহর কাসাব্ল্যাঙ্কায় বৈঠক করে। ওই বৈঠকের কক্ষে ও বৈঠকে অংশগ্রহণকারী আরব নেতাদের ব্যক্তিগত হোটেল কক্ষে আড়িপাততে মোসাদকে সহায়তা করে মরোক্কো। এতে আরবদের চিন্তা, সক্ষমতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে নজিরবিহীন জ্ঞান লাভ করে ইসরাইল।
পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে আরব দেশগুলোর সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য সেসব তথ্য মোসাদ ও ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোর পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
ইসরাইলের সাবেক সামরিক গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল শ্লোমো গাজিত ২০১৬ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ওই রেকর্ডিংগুলো সত্যিকার অর্থেই অসাধারণ গোয়েন্দা সফলতা ছিল। সেগুলো মিসরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় নিশ্চিতের ব্যাপারে আমাদের ও প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোর আস্থা নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
ক্যাসাব্ল্যাঙ্কার ওই গোয়েন্দা অভ্যুত্থানের পরপরই মরোক্কান গোয়েন্দা সংস্থার অনুরোধে দেশটির বিরোধী নেতা বেন বারকাকে খুঁজে বের করে মোসাদ। তাকে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যায় প্যারিসে। সেখানে মরোক্কান ও তাদের ফরাসি মিত্ররা বারকাকে অপহরণ করে ও নির্যাতন করে হত্যা করে। তার মৃতদেহ সরিয়ে ফেলে মোসাদের এজেন্টরা। আজ অবধি তার লাশের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এসব ঘটনার প্রায় এক দশক পর বাদশাহ হাসান ও তার সরকার ইসরাইল ও মিসরের গোপন যোগাযোগ স্থাপনকারী হয়ে উঠে। ১৯৭৮ সালে ইসরাইল ও মিসরের মধ্যে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি ও সম্পর্ক স্বাভাবিকরণের আগে মরোক্কোতে গোপন বৈঠক করে দুই দেশের কর্মকর্তারা। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে মরোক্কোকে সামরিক সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয় ইসরাইল।
১৯৯৫ সালে মরোক্কান গোয়েন্দারা মোসাদের সঙ্গে মিলে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের সচিবকে বশ করার চেষ্টা করে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এক মোসাদ কর্মকর্তা জানান, তাদের পরিকল্পনা ছিল লাদেনকে হত্যা করা। তবে সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
হাসান অবসরে যাওয়ার পর তার উত্তরসূরী বাদশাহ মোহাম্মদ ষষ্ঠ বহু বছর পশ্চিম সাহারা অধিগ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মৌনসম্মতি নিশ্চিত করতে ইসরাইলের সহায়তা চেয়েছেন। বৃহস্পতিবারের ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই চেষ্টা সফল হতে যাচ্ছে। ২০০৬ সাল থেকে এ অনুমতি নিশ্চিতের জন্য বাদশাহ মোহাম্মদের দূত হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন মরোক্কোর এক ছোট ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতা সের্গে বারদুগো। এ বিষয়ে ইসরাইলি কর্মকর্তা ও মার্কিন ইহুদি নেতাদের সঙ্গে বহু বৈঠক করেছেন তিনি। মাঝে মাঝে এসব বৈঠকে যোগ দিতেন বাদশাহর দীর্ঘদীনের বন্ধু ইয়াসিন মানসুরি। তিনি মরোক্কোর বিদেশে সক্রিয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান।
এক পর্যায়ে মোসাদ প্রধান ইয়োসি কোহেনের সঙ্গে সরাসরি দেখা করেন মানসুরি। সাহারা অধিগ্রহণ নিয়ে আলোচনা হয় তাদের মধ্যে। সেসব আলোচনাই পরবর্তীতে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন বিষয়ক চুক্তি হওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখে।
বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোর ওই সাহারা অধিগ্রহণকে স্বীকৃতি দেবে। বিনিময়ে মরক্কো ইসরাইলকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেবে।
