যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতালগুলোয় জানুয়ারির শুরু থেকে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমছিল। তিন সপ্তাহ আগ পর্যন্ত মিশিগানের হাসপাতালগুলোতে করোনা আক্রান্ত রোগী ভর্তির প্যাটার্ন ছিল একইরকম। অর্থাৎ, ভর্তি হওয়া রোগীর চেয়ে বাড়ি ফেরা রোগীর সংখ্যা ছিল বেশি। কিন্তু দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এবং স্বাস্থ্য ও মানব পরিষেবা মন্ত্রণালয়ের উপাত্ত অনুযায়ী, ২৫শে ফেব্রুয়ারির তুলনায় গত কয়েক সপ্তাহে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৪৫ শতাংশ বেড়েছে।

সরকারি উপাত্ত অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের নগর এলাকাগুলোর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় চতুর্থ স্থানে আছে ডেট্রয়েট। একইসঙ্গে সংক্রমণ ও আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় শহরটি রয়েছে প্রথম স্থানে। আটলান্টিক ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে এসব লেখা হয়েছে।

বিগত শরৎ ও শীতে করোনা সংক্রমণের একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন দেখা গেছে- প্রথমে বাড়তো আক্রান্তের সংখ্যা, এর এক সপ্তাহ পর থেকে হাসপাতালে রোগী ভর্তি বাড়তো এবং অবশেষে, দুই সপ্তাহ পর থেকে বাড়তো প্রাণহানীর সংখ্যা।

নার্সিং হোম ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী সেবাদানকারী স্থাপনাগুলোয় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে। মিশিগানে যদি আবার তেমনতা ঘটে তাহলে এখন হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়তেই থাকবে এবং এরপর শুরু হবে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি।

কিন্তু বসন্তে এই সংক্রমণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নতুন দুটি নিয়ামক যোগ হয়েছে- করোনা ভাইরাসের উদ্বেগ সৃষ্টিকারী নতুন কয়েকটি ভ্যারিয়ান্ট ও টিকাদান কর্মসূচীর বিস্তার। অর্থাৎ, হাসপাতালে রোগী ভর্তি ও আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিস্থিতি কী রূপ নেবে তা এখনো নিশ্চিত নয়।

৬৫ বছরের বেশি বয়সী ও নার্সিং হোমের বাসিন্দাদের টিকাদানে অগ্রাধিকার দেওয়ায় মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা অনেকটাই কমে যাওয়া উচিৎ। কিন্তু রাজ্য সরকারের উপাত্ত অনুসারে, মিশিগানে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে রাজ্যের ৬৫-৭৪ বছর বয়সী ৬১ শতাংশ মানুষকে। ৭৫ বছর ও এর চেয়ে বেশি বয়সীদের মধ্যে ৬২ শতাংশ পেয়েছেন প্রথম ডোজ। ডেট্রয়েটে অবশ্য টিকাদানের হার আরও কম। শহরটিতে ৬৫-৭৪ বছর বয়সীদের মধ্যে মাত্র ৪৩ শতাংশকে প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে। ৭৫ ও এর বেশি বয়সীদের মধ্যে টিকা পেয়েছেন ৩৯ শতাংশ মানুষ।

সিডিসি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫ বছর ও এর বেশি বয়সী জনসংখ্যার মধ্যে ৬৬ শতাংশ টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছেন। মিশিগানের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে টিকাদানের হার আরও কম। পুরো রাজ্যজুড়ে ৬৫ ও এর বেশি বয়সী কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে মাত্র ২৮ শতাংশ বাসিন্দা টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছেন। সবমিলিয়, মিশিগানের মোট জনসংখ্যার মাত্র এক-চতুর্থাংশ করোনার প্রথম ডোজ পেয়েছে। এর মধ্যে  ডেট্রয়েটে টিকা দেওয়া হয়েছে মোট জনসংখ্যার  মাত্র ১৫ শতাংশকে।

নার্সিং হোমে টিকাদান কর্মসূচীর বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে ওঠা এখনো কঠিন। সিডিসি জানায়, এখন অবধি মিশিগানের নার্সিং হোম ও দীর্ঘমেয়াদী সেবাদানকারী স্থাপনাগুলোর ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে এর মধ্যে কতজন কর্মী ও কতজন বাসিন্দা তা আলাদা করে জানানো হয়নি। মিশিগানের স্বাস্থ্য ও মানব পরিষেবা মন্ত্রণালয় অনুসারে, ফেব্রুয়ারি ও মার্চজুড়ে রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদী সেবাদানকারী স্থাপনাগুলোয় করোনায় মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এ থেকে আশা করা যায় যে, সংক্রমণ বাড়লেও এই হ্রাস পাওয়া অব্যাহত থাকবে।
মিশিগানে সংক্রমণ বাড়তে থাকার এ পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় বড় প্রশ্নটি হচ্ছে, করোনার কী কী ভ্যারিয়ান্ট কতটুকু উদ্বেগের এবং সংক্রমণ বৃদ্ধিতে সেগুলোর ভূমিকা কিরকম হতে পারে? যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাসটির জিনোমিক নজরদারি অনেকটাই সীমিত।  তবে বিদ্যমান উপাত্ত থেকে জানা যায় যে, বি.১.১.৭ নামের একটি ভ্যারিয়ান্ট বিস্তৃত পরিসরে মিশিগানজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে উল্লেখ্য, ভ্যারিয়ান্টটি সর্বপ্রথম ধরা পড়েছিল যুক্তরাজ্যে। সিডিসি’র ট্র্যাকিং অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে ভ্যারিয়ান্টটির সবচেয়ে বেশি উপস্থিতি পাওয়া গেছে ফ্লোরিডায় ও এরপর মিশিগানে।
এদিকে, মিশিগানে করোনা সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অংশেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, জনপ্রতি হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি নিউ ইয়র্কে। দেশের অন্যান্য অংশে যখন হাসপাতালে করোনা রোগীর সংখ্যা কমছিল, তখনো নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সির হাসপাতালগুলোয় বেড়ে চলেছিল রোগীর সংখ্যা। রাজ্যগুলোর হাসপাতালগুলোতে এখন অবদি ব্যাপক হারে রোগীর সংখ্যা না বাড়লেও, যতজন ভর্তি হচ্ছেন তার চেয়ে বেশি কম মানুষ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়ছেন।

ডেট্রয়েটের অবনমন ঘটতে থাকা করোনা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, বিগত মাসগুলোয় সে বিষয়ে  তথ্যবহুল অনুমান করা হয়তো সম্ভব ছিল। বিগত মাসগুলোর পরিস্থিতি বিবেচনায়, রাজ্যজুড়ে সংক্রমণ ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ার কথা। একইসঙ্গে রাজ্যজুড়ে, বিশেষ করে নার্সিং হোমগুলোয় মৃত্যু বাড়ার আশঙ্কা থাকতো। কিন্তু মিশিগানে বর্তমানে সংক্রমণ বাড়ছে এমন এক পরিস্থিতিতে যখন দেশটিতে করোনার নতুন ভাইরাল ভ্যারিয়ান্ট ছড়িয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে ১০ কোটির বেশি মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
এমতাবস্থায় ধারণা করা যায় যে, ডেট্রয়েটসহ যুক্তরাজ্যজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হবে। তবে সংক্রমণের সংখ্যা বিবেচনায় এটি স্পষ্ট যে, কোভিড-১৯ আচমকাই উধাও হয়ে যাবে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গত কয়েক মাস ধরে বলে আসছেন- বসন্তে টানা সংক্রমণ বাড়বে। এর পেছনে বি.১.১.৭. বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এতে পরিস্থিতি কতটা খারাপ দিকে মোড় নেবে। আর ভাইরাসটিই বা কী পরিমাণে ছড়িয়ে পড়বে।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031