আদৌ কি বেরোতে চায় তালেবান ছিয়ানব্বইয়ের নয়ছয় নীতি থেকে ? মাত্র এক সপ্তাহেই মুখোশ খুলে পড়ার উপক্রম, খোলস ছেড়ে পুরনো চেহারায় ফিরছে যেন। তারা আফগানিস্তানজুড়ে নিপীড়ন ও নিধনযজ্ঞ শুরু করেছে বলে খবর মিলছে সব দিক থেকে। এরকম সময় সামনে তালেবানের দুই শীর্ষ নেতাÑ বারাদার আর হাক্কানি।
একজন আট বছর জেল সাজা খেটেছেন, যাকে গ্রেপ্তার এবং পরে মুক্তি দিতে পাকিস্তানকে চাপ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। আরেকজন এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের ‘দেখিবামাত্র ধরিয়ে দিন’ তালিকায় থাকা ব্যক্তি। অথচ এখন এ দুজনই সদর্পে হাজির মূলমঞ্চে, কাবুলে বিনাবাধায় বিরাজ করছেন প্রকাশ্যে। উদ্দেশ্য, তালেবানের নেতৃত্বে সম্ভাব্য সরকারের রূপরেখা প্রণয়ন। আফগানিস্তানের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাকাঠির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া তালেবানের এ সরকার কি আদৌ স্বীকৃতি পাবে- আফগানদের কাছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। সংশয় আছে, যদিও ‘সবাইকে নিয়ে সরকার’ গঠনের পরিকল্পনার কথা প্রথম সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীটি।
তালেবানের সঙ্গে শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বিরোধীমনা হওয়া সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় এসে ট্রাম্পের সেই নীতিতেই অনড় থাকেন।
মার্কিন সেনাসহ বিদেশি সেনারা আফগানিস্তান ছাড়া শুরু করলে একে একে ডজন দুয়েক মতো প্রদেশ দখল করে ১৫ আগস্ট রাজধানী কাবুল, এমনকি বিনাবাধায়, কব্জায় নিয়ে নেয় তালেবান।
আফগান দখলের পর গত সপ্তাহে কাবুলে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তালেবান যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এসব শুনে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, তারা এবার বদলে গেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র উল্টো। এমনকি বাইডেনও বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন না যে, তালেবান বদলে গেছে।
বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান- বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রতীয়মান যে, তালেবান মুখে যা-ই বলুক, ওদের মনে সম্ভবত সেই ‘আদিচিন্তা’ই গেঁথে আছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, যারা গত বিশ বছরে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি শক্তিকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছে, গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তাদের তালিকা তৈরি করে ঘরে ঘরে তল্লাশি চালাচ্ছে তালেবান। এরই মধ্যে সাংবাদিকসহ ভিন্নমতধারীদের ধরে ধরে পিটুনি ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে।
ওদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, জুলাই মাসেই গজনি প্রদেশে হাজরা সম্প্রদায়ের নয়জন ব্যক্তিকে হত্যা করেছে তালেবান। হাজরা (নিজেদের তারা এখন ‘আজরা’ বলে) সম্প্রদায় আফগানিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম নৃগোষ্ঠী। এ গোষ্ঠীর বেশিরভাগই শিয়া মুসলিম। আর তালেবানরা হলো কট্টরপন্থি সুন্নি মুসলিম।
এমনকি, যুক্তরাষ্ট্র গতকাল এক সতর্কবার্তা প্রকাশ করে জানিয়েছে, কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে গেছে, যেখানে দেশ ছাড়তে মরিয়া আফগানরা এবং বিদেশিরা বিমানযোগে উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
সবাইকে সাধারণ ক্ষমা করে দিয়ে তালেবান আহ্বান করেছিল, সব সরকারি চাকুরে যেন কাজে ফেরেন। কিন্তু গতকাল এও খবর পাওয়া গেছে, অনেক সরকারি চাকুরেকে তাদের অফিসে ঢুকতে দেয়নি তালেবান সদস্যরা।
এ রকম পরিস্থিতিতে গতকাল ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন জানিয়ে দিয়েছে, তারা তালেবানকে স্বীকৃতি দেয়নি, দিতেও চায় না। এখনো তারা তালেবানের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক আলাপ করেনি।
তবে তালেবানের পক্ষে প্রথম থেকেই এবার সোচ্চার সুর শোনা যাচ্ছে চীন থেকে, পাকিস্তান থেকে এবং রাশিয়া থেকে। গতকাল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল আফগানিস্তান চায় পাকিস্তান। এর আগে ইমরান খান বলেছিলেন, তালেবান আফগানদের দাসত্বের দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত করেছে। গতকাল রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান জানিয়েছেন, ওই দুই দেশ আফগানিস্তান সংকটে নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ও বোঝাপড়া জোরদার করছে।
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ারে হামলা করেছিল জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়দা। ওই সময় এদের প্রধান ঘাঁটি ছিল আফগানিস্তান। তখন তালেবান ক্ষমতায় ছিল। হামলার পর ওই বছরই আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র এবং এর মিত্রদের জোট বাহিনী ন্যাটো। অভিযানে পতন হয় তালেবান সরকারের।
১৯৯৬ থেকে পতন পর্যন্ত পাঁচ বছরে তালেবান কট্টরবাদী শরিয়া আইনের ভিত্তিতে দেশ শাসন করেছিল। তারা নারীদের ঘরে আটকে রাখা, নারী শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া, প্রকাশ্যে মৃত্যদ- কার্যকর, অঙ্গহানি ও পাথর ছুড়ে শাস্তি দেওয়ার মতো প্রথাও চালু করেছিল।
এবারও সেই দুঃশাসন ফিরে আসতে পারে, এ শঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ এবং উদারবাদী ও গণতন্ত্রপন্থি আফগানরা দেশ ছাড়তে মরিয়া। কিন্তু বিমানবন্দরে যাওয়ার আগেই মোড়ে মোড়ে তালেবানের তল্লাশি ও নির্যাতনের কারণে এখন অনেক আফগানের জীবন অনিশ্চিত।
